মাহমুদুল হাসান
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৪, ০২:২৭ এএম
আপডেট : ১৭ মে ২০২৪, ০৯:৪৬ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

শনাক্তের বাইরে ৪৬ ভাগ রোগী

বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস আজ
শনাক্তের বাইরে ৪৬ ভাগ রোগী

উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় নীরব ঘাতক। দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের প্রধান তিনটি কারণের অন্যতম এই রোগ। নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ বা উপসর্গ না থাকায় শনাক্তের বাইরে থাকছেন প্রায় ৪৬ শতাংশ রোগী। হৃদরোগ-ডায়াবেটিস কিংবা অন্য কোনো জটিল রোগের চিকিৎসা নিতে গিয়ে শনাক্ত হয় উচ্চ রক্তচাপ। হৃদরোগ, ব্রেইন স্ট্রোক, ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগের জন্য দায়ী এই উচ্চ রক্তচাপ। একসময় উচ্চ রক্তচাপের রোগী শহরকেন্দ্রিক হলেও নগরায়ণের প্রভাবে এখন গ্রামেও বাড়ছে এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা। অনিয়মিত ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং অপর্যাপ্ত শারীরিক শ্রমকে এর জন্য দায়ী করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, শুধু উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই অসংক্রামক রোগজনিত অকালমৃত্যু অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব। শর্করা জাতীয় খাবার বেশি খাওয়া, জাঙ্ক ফুড, প্রচুর পরিমাণে লবণ ও চিনি খাওয়া, মদ ও ধূমপান এবং পর্যাপ্ত কায়িক পরিশ্রম না করা এবং পরিমিত না ঘুমানোর কারণে বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপ। শুধু বিস্তার নয়, স্থানীয় পর্যায়ে সুযোগ-সুবিধার অভাবে রোগটি দেরিতে শনাক্ত হচ্ছে এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে ঝুঁকিতে ফেলছে। আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ প্রদানের পরামর্শ দেন তারা।

চিকিৎসকরা বলছেন, শহরাঞ্চলে চলাচলের পথ সীমিত হওয়ায় অধিকাংশ সময়ে যানবাহন ব্যবহার করে মানুষ। আবার যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় গ্রামাঞ্চলেও কম দূরত্বের পথে না হেঁটে বাহন ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। সেখানেও অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনের প্রভাব পড়ছে। ফলে উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে প্রাপ্তবয়স্ক প্রতি চারজনের একজন। মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ অর্থাৎ ৪ কোটির বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত।

তবে সিংহভাগ আক্রান্তই জানেন না তারা এ নীরব ঘাতকের শিকার। গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে ১৪ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও রয়েছে সচেতনতার অভাব। আবার সব ক্লিনিকে রোগটি স্ক্রিনিংয়ের সুযোগও নেই। যদি স্ক্রিনিং জোরদার করে সেবার আওতা বাড়ানো যায়, তাহলে ২০৫০ সালের মধ্যে ৭ দশমিক ৬ কোটি মৃত্যু এড়ানো সম্ভব। এমন পরিস্থিতিতে আজ (শুক্রবার) দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস। ওয়ার্ল্ড হাইপারটেনশন লিগের সদস্য হিসেবে হাইপারটেনশন কমিটি অব ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ ২০০৬ সাল থেকে প্রতি বছর ১৭ মে দিবসটি পালন করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরও জনসচেতনতায় এ দিবসকে ঘিরে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘সঠিকভাবে রক্তচাপ মাপুন, নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং দীর্ঘজীবী হোন’।

গত বছর সেপ্টেম্বরে উচ্চ রক্তচাপবিষয়ক বৈশ্বিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। এতে বলা হয়, বিশ্বের ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর ৩৩ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। গত ৩০ বছরে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়ে হয়েছে ১৩০ কোটি। এর মধ্যে ৭৮ শতাংশই বাংলাদেশসহ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর অধিবাসী। বাংলাদেশের চিত্র খুবই উদ্বেগজনক বলেও মন্তব্য করেছে ডব্লিউএইচও।

সংস্থাটির গ্লোবাল রিপোর্ট অন হাইপারটেনশন-২০২৩ বলছে, বাংলাদেশে আক্রান্তদের ৪৬ শতাংশই তাদের রোগ সম্পর্কে অবগত নন। তাদের চিকিৎসাসেবা গ্রহণের হার খুবই কম। মাত্র ৩৮ শতাংশ চিকিৎসা নেন। যার মধ্যে নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছেন মাত্র ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ ওষুধ সেবনের পরও রোগটি নিয়ন্ত্রণে নেই ৮৫ শতাংশেরই। ২০১৯ সালে দেশে ২ লাখ ৭৩ হাজার মানুষ হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় মারা যান, যার ৫৪ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে সাম্প্রতিক কোনো গবেষণা নেই সরকারের কাছে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০১৭ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ২৭ শতাংশ মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে। সংখ্যায় ৪ কোটির বেশি। এর মধ্যে অতিরিক্ত ওজনের নারী-পুরুষের রোগটিতে আক্রান্তের হার যথাক্রমে ৪৯ ও ৪২ শতাংশ। আর স্বাভাবিক ওজনের নারী-পুরুষের হার যথাক্রমে ২৫ ও ২৪ শতাংশ। প্রতি ১০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সাতটিতে উচ্চ রক্তচাপজনিত চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনা গাইডলাইন রয়েছে মাত্র ১৭ ভাগে। প্রশিক্ষিত কর্মী রয়েছেন মাত্র ২৯ শতাংশে। গ্লোবাল বারডেন অব ডিজিজ স্টাডি (জিবিডি) ২০১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে মৃত্যু এবং পঙ্গুত্বের প্রধান তিনটি কারণের একটি উচ্চ রক্তচাপ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, নগরায়ণের ফলে বর্তমানে উচ্চ রক্তচাপের রোগী সবখানেই। বার্গার, হাই এনার্জি ড্রিংকস থেকে শুরু করে অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রামের দোকানেও পাওয়া যাচ্ছে। উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ মোকাবিলায় সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে মডেল এনসিডি কর্নার করা হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিকে ডায়াবেটিস ও প্রেশারের ওষুধের সঙ্গে ব্লাড প্রেশার ও সুগারও মাপা যাচ্ছে। তবে এখনো ডায়াগনোসিস শুরু হয়নি। সে পর্যায়ে যেতে আলাদা লোকবল লাগবে।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের এপিডেমিওলোজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, অর্থনৈতিক পরিবর্তনে গ্রাম ও শহর মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পরিবর্তন এসেছে। সবাই হাঁটাচলা কমিয়েছে। অল্প দূরত্বেও যানবাহন ব্যবহার করছে আবার ক্যালোরি বেশি খাচ্ছে, ফলে ওজন বাড়ছে। গ্রামেও প্রসেসড ফুড (প্রক্রিয়াজাত খাবার) খাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সঙ্গে আছে মাত্রাতিরিক্ত লবণ খাওয়া। এ ছাড়া তামাক ও মদপানও দায়ী। এসব করেই শরীরে বাসা বাঁধছে উচ্চ রক্তচাপ।

দিবসটি উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিএমএ ভবনে গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) সহযোগিতায় গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) আয়োজিত বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ পরিস্থিতি ও করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ অনেকটাই কমানো সম্ভব। সরকার ইতোমধ্যে কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তবে ওষুধ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে এখাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।

স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. মো. এনামুল হক বলেন, উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা ও ওষুধে ১ টাকা বিনিয়োগ করলে সামগ্রিকভাবে ১৮ টাকার সুফল পাওয়া যায়। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষভাবে তা ব্যবহার করা সম্ভব হলে উচ্চ রক্তচাপজনিত অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ার (সিবিএইচসি) এর লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. কাইয়ুম তালুকদার বলেন, পর্যায়ক্রমে দেশের সব উপজেলায় হেলথ কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে কাজ করছি। এই কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ ও অসংক্রামক রোগের প্রকোপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) উপ-মহাব্যবস্থাপক (বিক্রয় ও বিপণন) মো. জাকির হোসেন জানান, আশা করছি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সব কমিউনিটি ক্লিনিকে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চাঁদা চাওয়ায় কাস্টমসের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীর মামলা

এবার সিরাজগঞ্জে মিলল রাসেল ভাইপারের বাচ্চা, এলাকায় আতঙ্ক

এআইইউবি ও ফিলিস্তিনের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রীতি ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত

সিলেটে তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ

১৫ লাখ টাকার একটি খাসি, কেড়ে নিল লাকীর হাসি

বিশ্বকে মহাবিপদ থেকে বাঁচাতে যে সতর্কবার্তা দিল তুরস্ক

হত্যা নাকি মৃত্যু, দেড় মাস পর কিশোরের লাশ উত্তোলন

কীসের বিনিময়ে মুক্তি পেলেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ?

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নৈশপ্রহরী হত্যা, দুজনের যাবজ্জীবন

খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনায় দোলাইপাড়ে বিএনপির দোয়া মাহফিল

১০

সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি নিয়ে সংসদে ক্ষোভ

১১

স্মার্ট নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে ছাত্রলীগের প্রতি আহ্বান পলকের

১২

মাদক-বাল্যবিবাহ-যৌতুক প্রতিরোধে ভূমিকা পালনকারীদের পুরস্কৃত করবে ছাত্রলীগ 

১৩

বিদ্যুৎস্পর্শে প্রাণ গেল কিশোরের

১৪

প্রধানমন্ত্রীকে খালি হাতেই ফিরতে হয়েছে : বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি

১৫

খতনা করাতে গিয়ে ঘুমের বড়ি, মৃত্যুর মুখে শিশু

১৬

মার্কিন বিমানবাহী রণতরী আইজেনহাওয়ার কেন পালিয়ে গেল?

১৭

রাসেল ভাইপারে মৃত্যুরোধে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম সরবরাহ চেয়ে আইনি নোটিশ

১৮

ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটিকে স্বাগত জানিয়ে মিছিল

১৯

ঢাকায় আমেরিকান দূতাবাসের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন

২০
X