গ্যাস সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী ইউরিয়া সার উৎপাদন করতে পারছে না বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানাধীন পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে চারটিই গ্যাসের অভাবে বন্ধ। সেপ্টেম্বরের আগে পর্যাপ্ত গ্যাস দিতে পারবে না পেট্রোবাংলা। এ অবস্থায় আগামী জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে মাঝারি চাহিদার মৌসুমে (মিনি পিক সিজন) এবং নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া সর্বোচ্চ চাহিদার মৌসুমে (পিক সিজন) সার সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সার উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত একাধিক কর্মকর্তা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে এ মুহূর্তে সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে। সে কারণে দামও তুলনামূলক অনেক কম। কিন্তু দেশে ডলার সংকটের কারণে বিসিআইসি এখন ইউরিয়া আমদানি করতে পারছে না। আগামী জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাঝারি চাহিদার মৌসুমে প্রায় ৭ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়ার প্রয়োজন। বিসিআইসির হাতে আছে মাত্র ৪ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন। বাকি সার এরই মধ্যে আমদানি করতে হবে। তবে সময়মতো সার আমদানি করা যাবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ নিয়ে বিসিআইসির কর্মকর্তারা কিছুটা উদ্বেগের মধ্যে আছেন। আবার সর্বোচ্চ চাহিদার সময় (নভেম্বর-মার্চ) সার আমদানি করতে হবে বেশি দামে। তবে ডলারের পর্যাপ্ত জোগানের ওপর সবকিছু নির্ভর করছে। সরকার ডলার না দিতে পারলে আমদানিও বন্ধ থাকতে পারে।
বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘কারখানা বন্ধ ও সার সংকট হতে পারে—এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়কে চিঠি লিখেছি। মন্ত্রণালয় সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিচ্ছে। যমুনা, আশুগঞ্জ ও শাহজালাল ফার্টিলাইজার চালুর জন্য প্রস্তুত রয়েছে। গ্যাস পেলে এগুলো উৎপাদনে যাবে।’ কবে নাগাদ গ্যাস সরবরাহ করা হতে পারে—সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাতে পারেননি।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান খান কালবেলাকে বলেন, ‘সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু করা হচ্ছে। এখন বিদ্যুতের পিক সিজন। তাই বিদ্যুতে বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। আগস্টের শেষ পর্যন্ত এই সরবরাহ করা হবে। সেপ্টেম্বরে গিয়ে সারে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো হবে।’
বন্ধ যে চার কারখানা: চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার, শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড, যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড এবং আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডে বর্তমানে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
কারখানা বন্ধ রেখে দ্বিগুণ দামে আমদানি: দেশের কারখানাগুলো বন্ধ থাকায় প্রায় দ্বিগুণ দামে ইউরিয়া আমদানি করতে হয় সরকারকে। দেশে উৎপাদিত ইউরিয়া টনপ্রতি উৎপাদন খরচ হয় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। আর বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকায়। ফলে আমদানি বাবদ প্রতি বছর প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে সরকারকে। সব কারখানায় উৎপাদন সচল রাখা সম্ভব হলে সার আমদানির প্রয়োজন হতো না। সরকারকেও প্রতি বছর এ খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হতো না।
কর্মকর্তারা জানান, আমদানিকৃত ইউরিয়া দেশে উৎপাদিত ইউরিয়ার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দাম। মানেও বাংলাদেশের ইউরিয়া বিশ্বসেরা। কিন্তু কারখানা বন্ধ রাখার ফলে দেশের চেয়ে তুলনামূলক নিম্নমানের ইউরিয়া বেশি দামে আমদানি করতে হয়। দিন দিন আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। অথচ দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখা গেলে সারে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে। আমদানি শূন্যের কোটায় নামানো গেলে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকার অপচয় ঠেকানো সম্ভব।
চাহিদা ২৭ লাখ মেট্রিক টন: দেশে কৃষি উৎপাদনের জন্য প্রতি বছর ২৭ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয়। এই সারের পুরোটাই বিসিআইসি সরবরাহ করে। তাদের মালিকানাধীন পাঁচটি কারখানায় যা উৎপাদিত হয়, বাকি ইউরিয়া বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। সৌদি আরব, কাতার ও দুবাই থেকে এ সার আমদানি করে বিসিআইসি।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বিসিআইসির কাছে ইউরিয়ার মজুত আছে ৪ লাখ ২৪ হাজার ৩৬৬ মেট্রিক টন। এর মধ্যে গুদামে আছে ৩ লাখ ৫২ হাজার ২২০ মেট্রিক টন। পাইপলাইনে আছে ১১ হাজার ৩১৬ মেট্রিক টন। জিপিইউএফপিতে মজুত আছে ৬০ হাজার ৮৩০ মেট্রিক টন। নিয়মিত উৎপাদন সচল রাখতে না পারলে আমদানিনির্ভরতায় এ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।
জানা গেছে, আগামী পিক সিজনের জন্য ১০ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া চেয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক সভা থেকে বিসিআইসিকে এ টার্গেট দেওয়া হয়।
সরকারের বিসিআইসির ১৩ হাজার কোটি টাকা:
বিসিআইসির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আমদানি ও দেশে উৎপাদিত ইউরিয়ার ভর্তুকি বাবদ সরকারের কাছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা পাবে বিসিআইসি। সরকার এ টাকা পরিশোধ করতে পারছে না। অর্থ বিভাগ এ টাকা পরিশোধের কোনো উদ্যোগও নিচ্ছে না। ফলে এক ধরনের অচলাবস্থার দিকেই এগোচ্ছে বিসিআইসি।
বিসিআইসির চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা পাওনা পরিশোধে অর্থ বিভাগকে বারবার তাগিদ দিচ্ছি। কিন্তু টাকা পাচ্ছি না।’
পেট্রোবাংলার পাওনা ২৩০০ কোটি টাকা:
বিসিআইসির পাঁচটি সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বাবদ ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা)। সামর্থ্যের অভাবে এ টাকা দিতে পারছে না বিসিআইসি।
তাদের ভাষ্য, সরকারের কাছে ভর্তুকির ১৩ হাজার কোটি টাকা পাওনা আছে। সেখান থেকে টাকা পাওয়া গেলে তারা পেট্রোবাংলার পাওনা পরিশোধ করতে পারবে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান খান কালবেলাকে বলেন, ‘সার কারখানাগুলোতে গ্যাসের প্রচুর টাকা বকেয়া রয়েছে। এ বিষয়ে বারবার তাগাদা দিয়েও কোনো সুরাহা হচ্ছে না।’
প্রতি কারখানায় মাসে খরচ ১২ কোটি টাকা:
বন্ধ থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতি মাসে একেকটি কারখানায় ১২ থেকে ১৩ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। তা ছাড়া কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ রাখা হলে যন্ত্রপাতিতে নানা ত্রুটি দেখা দেয়। কারখানা চালুর আগে এসব যন্ত্র মেরামতের জন্য অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হয়। অর্থাৎ কারখানা বন্ধ রাখা হলে নানামুখী সমস্যার সৃষ্টি হয়।
নিজেদের কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকার পাশাপাশি আমদানিতে অনিশ্চয়তা না কাটায় এবার সার নিয়ে বিসিআইসি কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।