

মানসিক রোগ নিয়ে কুসংস্কার ও অবহেলা বাংলাদেশের সমাজে নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে বস্তি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে মানসিক রোগকে আজও অনেক সময় ‘জিনে ধরা’, ‘আসর’ বা অলৌকিক সমস্যার ফল হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে মানুষ দূরে থাকে এবং রোগ আরও জটিল আকার ধারণ করে। রাজধানীর কড়াইল বস্তির সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, সচেতনতা ও সঠিক উদ্যোগ থাকলে এ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সম্ভব।
কড়াইল বস্তির তালতলা এলাকার বাসিন্দা মশুরা বেগমের জীবনকথা এই পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী উদাহরণ। একজন কবিরাজ হিসেবে তিনি নিজেই একসময় ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমে রোগ সারানোর চেষ্টা করতেন। স্বামী ও সন্তানের মানসিক রোগকে তিনি প্রথমে অলৌকিক সমস্যা ভেবেছিলেন। কিন্তু ঝাড়ফুঁক ব্যর্থ হলে বাধ্য হয়েই জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে চিকিৎসার শরণাপন্ন হন। দীর্ঘ চিকিৎসার পর পরিবারের তিনজন সদস্যের সুস্থ হয়ে ওঠা মশুরা বেগমের বিশ্বাসে আমূল পরিবর্তন আনে। এখন তিনি শুধু একজন সচেতন মানুষই নন, বরং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার একজন সক্রিয় দূত।
এ পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাজ্যের এনআইএইচআরের অর্থায়নে পরিচালিত ‘ট্রান্সফর্ম’ প্রকল্প। কড়াইল বস্তির বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এই প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল—মানুষ যাদের কাছে আগে যেত, যেমন কবিরাজ, ফার্মেসির কর্মী ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী তাদেরই প্রশিক্ষণের আওতায় আনা। তিন দিনের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ১৫৩ জনকে মানসিক রোগ শনাক্ত ও সঠিক চিকিৎসাকেন্দ্রে রেফার করার সক্ষমতা দেওয়া হয়। ফলাফল ছিল চোখে পড়ার মতো। যেখানে আগে বছরে মাত্র ৩৩ জন মানসিক রোগের চিকিৎসা নিতেন, সেখানে এক বছরের মধ্যে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫৭ জনে।
এ সাফল্য দেখিয়ে দেয়, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পথ সুগম করতে হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিশ্বাসের জায়গাগুলোকেই কাজে লাগাতে হবে। তমিজ মিয়ার মতো প্রথাগত নিরাময়কারীর পরিবর্তন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যিনি একসময় ‘জিনে ধরা’ ধারণায় বিশ্বাস করতেন, প্রশিক্ষণের পর তিনিই এখন রোগীদের হাসপাতালে পাঠাচ্ছেন এবং বলছেন এই রোগের চিকিৎসা আছে, খরচও লাগে না। এটি শুধু একজন মানুষের পরিবর্তন নয়, বরং একটি সমাজের মানসিকতার রূপান্তর। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর আগের মতো সচেতনতামূলক কার্যক্রম আর চলছে না। লিমা আক্তারের মতো স্থানীয় ফার্মেসি মালিকদের মতামত স্পষ্ট। লিফলেট, পোস্টার ও ভিডিও ডকুমেন্টারির মাধ্যমে সচেতনতা অব্যাহত রাখা গেলে আরও বেশি মানুষ চিকিৎসার আওতায় আসতে পারত। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা কোনো এককালীন কর্মসূচি হতে পারে না; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
কড়াইল বস্তিতে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ মানুষের বসবাস, অথচ মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। ‘ট্রান্সফর্ম’ প্রকল্প দেখিয়েছে, সঠিক পরিকল্পনা ও স্থানীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে এ ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করা সম্ভব। তাই এ প্রকল্প আরও কয়েক বছর চালু রাখার দাবি যৌক্তিক ও সময়োপযোগী।
আমর মনে করি, মানসিক রোগ কোনো লজ্জা নয়, এটি চিকিৎসাযোগ্য একটি স্বাস্থ্যসমস্যা। কড়াইল বস্তির অভিজ্ঞতা আমাদের সে কথাই আবার মনে করিয়ে দেয়। এখন প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি উদ্যোগে এমন প্রকল্প আরও বিস্তৃত করা, যাতে কুসংস্কারের অন্ধকার ভেঙে দেশের সব প্রান্তিক মানুষ চিকিৎসার আলোয় আসতে পারে।
মন্তব্য করুন