

ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহের ছেলে ও বর্তমানে নির্বাসিত রেজা পাহলভির সমর্থকরা দাবি করছেন, ইরানের রাস্তায় যে বিপুল মানুষ নেমে এসেছে, তা মূলত পাহলভির দেওয়া আন্দোলনের আহ্বানের সরাসরি ফল। তাদের মতে, এ বিক্ষোভ আসলে পাহলভির নেতৃত্বের পক্ষে একটি গণভোটের মতো। জনতার উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, তিনি এতে ‘জয়ী’ হয়েছেন।
তবে বাস্তবতা হলো, ইরানের জন্য বিকল্প নেতৃত্বের প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বহু ইরানি নাগরিক, যারা ৪৭ বছর ধরে চলা ধর্মীয় শাসনের অবসান চান, তারা এখনো রাজতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে সন্দিহান। শাহের আমলের স্মৃতি এবং সেই সময়ের দমন-পীড়ন অনেকের মনে এখনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও রেজা পাহলভির প্রতি স্পষ্ট সমর্থন এখনো দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন পর্যন্ত তাকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেননি। পাহলভির সমর্থকরা বিদেশি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলোয় জোর দিয়ে বলছেন, বিক্ষোভকারীদের মুখে মুখে ‘শাহ ফিরিয়ে আনো’ ধরনের স্লোগান শোনা যাচ্ছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র খুবই সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যেমনটি ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর ক্ষেত্রে ট্রাম্প তাড়াহুড়ো করে সমর্থন দেননি, তেমনি ইরানের ক্ষেত্রেও তিনি পাহলভিকে সমর্থন দিতে দ্বিধায় আছেন। এর একটি বড় কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্র আশঙ্কা করছে যদি তারা প্রকাশ্যে কোনো এক পক্ষকে সমর্থন করে, তাহলে ইরান গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
বর্তমান বিক্ষোভের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, বিক্ষোভকারীদের কোনো সুস্পষ্ট একক নেতা বা একগুচ্ছ রাজনৈতিক দাবি নেই। দুর্নীতি, দমন-পীড়ন এবং ভয়াবহ মূল্যস্ফীতির অবসান—এ তিনটি দাবি ছাড়া আন্দোলনের একটি স্পষ্ট রূপরেখা এখনো গড়ে ওঠেনি। এ শূন্যতাই রেজা পাহলভির জন্য কিছুটা সুবিধা তৈরি করেছে। কারণ, তার অন্তত নাম-পরিচিতি রয়েছে এবং তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজতন্ত্রপন্থি সমর্থন গড়ে তুলেছেন।
অন্যদিকে, ইরানের ভেতরে এমন কিছু ব্যক্তি আছেন যারা দেশটিকে একটি ধর্মনিরপেক্ষতার দিকে নিয়ে যেতে পারতেন। উদাহরণ হিসেবে নোবেলজয়ী মানবাধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মদি এবং সংস্কারপন্থি রাজনীতিবিদ মোস্তফা তাজজাদেহর নাম উল্লেখ করা যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ নেতারা বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন সময় কারাবন্দি থাকায় কার্যকর নেতৃত্ব দিতে পারছেন না।
একজন ইরানি নাগরিক পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ইরান এখন ‘ইশতেহারবিহীন রাজনীতির যুগে’ বসবাস করছে। অর্থাৎ, কোনো সুসংগঠিত রাজনৈতিক পরিকল্পনা বা ভবিষ্যৎ রূপরেখা এখনো সামনে আসেনি। এ পরিস্থিতির মধ্যে রেজা পাহলভি তার সমর্থকদের আবারও রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছেন। আগামী মঙ্গলবার তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোতে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন বলে কথা রয়েছে। তবে তার দলের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, এখনো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তার কোনো বৈঠক নির্ধারিত হয়নি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরানের জনগণ পরিবর্তন চাইছে ঠিকই, কিন্তু সেই পরিবর্তনের নেতৃত্ব কে দেবে এবং দেশটি কোন পথে যাবে—রাজতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র না অন্য কোনো নতুন ব্যবস্থায় তা এখনো পরিষ্কার নয়।
ট্রাম্পের সতর্ক অবস্থানের আরেকটি স্পষ্ট ইঙ্গিত হলো, ইরানিরা যদি আক্রমণের শিকার হয় সে ক্ষেত্রে তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসার জন্য যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তা স্পস্ট নয়। সেইসঙ্গে এখন পর্যন্ত সে বিষয়ে তিনি কোনো বাস্তব পদক্ষেপ নেননি।
এ সতর্কতার কারণে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে, ট্রাম্প হয়তো ইরান সরকারের ভেতরে থাকা কোনো বিচ্ছিন্ন বা ভিন্নমতাবলম্বী গোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজছেন। এ প্রেক্ষাপটে ওমানের কর্মকর্তারা, যারা ঐতিহ্যগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছেন, তারা এই সপ্তাহান্তে তেহরান সফরে যাচ্ছেন। বিষয়টি ইঙ্গিত দেয় যে, পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হচ্ছে।
যদিও ইরানের ভেতরে সরকার ও জনগণের মধ্যে হতাশা এবং এক ধরনের চরম অসহায়ত্ব বাড়ছে। তবুও এমন কোনো লক্ষণ নেই যে, সরকারের কিছু অংশে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্ক বা উদ্বেগ দেশটির সর্বোচ্চ নেতাকে তার অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করছে। তিনি এখনো দৃঢ়ভাবে ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত ধরে রাখা এবং দেশের ভেতরেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বজায় রাখার সিদ্ধান্তে অনড়। তার কাছে এটি কেবল একটি পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, বরং জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রতীক।
অন্যদিকে, ট্রাম্প হয়তো রেজা পাহলভিকে পুরোপুরি সমর্থন দিতে দ্বিধায় আছেন আরেকটি কারণেও। কারণ, পাহলভির প্রত্যাবর্তনের দাবিতে যে স্লোগান রাস্তায় শোনা যাচ্ছে, সেগুলোর অর্থ ভুলভাবে ব্যাখ্যা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গার্ডিয়ান পত্রিকাকে দেওয়া একটি অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে এক ইরানি নাগরিক বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেছেন, “আজ যেসব স্লোগান শোনা যাচ্ছে, তা আসলে মুকুট বা রাজতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার আহ্বান নয়; এগুলো একটি বন্ধ গলি থেকে বেরিয়ে আসার আকুতি। যখন কোনো সমাজের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকে না, তখন সে পিছু হটে আগ্রহ থেকে নয়, বাধ্য হয়ে। এই পিছু হটা কোনো সচেতন সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি ক্লান্ত রাজনৈতিক শরীরের স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া, যে শরীর আর কোনো ‘চিকিৎসা’ বা পরামর্শে সাড়া দিচ্ছে না।”
তিনি আরও বলেছেন, “দশকের পর দশক ধরে সমাজকে বলা হয়েছে ‘অপেক্ষা করো’। মানুষ অপেক্ষা করেছে। বলা হয়েছে, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’। কিন্তু কিছুই ঠিক হয়নি। বলা হয়েছে, ‘এর চেয়ে খারাপ আর হবে না, এখানেই শেষ’। অথচ পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। তারপর বলা হলো, ‘এর কোনো বিকল্প নেই’। আর ঠিক এ মুহূর্তেই রাজপথ নিজেই তার বিকল্প তৈরি করেছে। এটা কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক যুক্তি দিয়ে নয়, বরং টিকে থাকার প্রবৃত্তি থেকে।”
এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, বর্তমান বিক্ষোভ ও স্লোগানসমূহ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ বা রাজতান্ত্রিক আবেগের প্রতিফলন নয়। বরং এগুলো একটি গভীরভাবে ক্লান্ত, হতাশ এবং দিশাহীন সমাজের আত্মরক্ষার বা বাঁচার তাগিদ থেকে জন্ম নেওয়া প্রতিক্রিয়া। ইরানের মানুষ পরিবর্তন চাইছে ঠিকই, কিন্তু সেই পরিবর্তনের রূপ, নেতৃত্ব এবং দিকনির্দেশনা এখনো অনিশ্চিত ও অস্পষ্ট।
একজন বিশ্লেষকের ভাষায়, “রাজতন্ত্রপন্থি স্লোগান আসলে পাহলভির প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ নয়; এটি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণার ঘোষণা। যখন ‘হ্যাঁ’ বলার মতো কোনো বিকল্প সামনে থাকে না, তখন মানুষ জোরে ‘না’ বলে চিৎকার করে ওঠে। সবাই হয় অতীতে আটকে আছে, নয়তো ফাঁপা প্রতিশ্রুতির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। সামনে যদি কিছুই দেখা না যায়, তাহলে সমাজ স্বাভাবিকভাবেই পেছনের দিকে তাকায়, কারণ সামনে তাকিয়ে দেখার মতো কিছু নেই।”
এ বক্তব্যে স্পষ্টভাবে বোঝানো হয়েছে যে, রাজতন্ত্রের কথা শোনা গেলেও তা মূলত বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিবাদী প্রতিক্রিয়া, ভবিষ্যতের জন্য সুস্পষ্ট কোনো রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নয়।
এদিকে ইরানের লেখকদের সংগঠন ‘ইরানিয়ান রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন’ বিদেশ থেকে চাপিয়ে দেওয়া সমাধান নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, ‘শিকারি শক্তির বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আকাশ থেকে কখনোই স্বাধীনতা নেমে আসবে না। যারা দেশের ভেতরে ও বাইরে থাকা শোষকদের থেকে নিজেদের স্বাধীনতা বজায় রেখে বর্তমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে, তারা কোনো কাল্পনিক অতীতের পুনরাবৃত্তির জন্য অপেক্ষা করে না, আবার তথাকথিত বা ভুয়া সংস্কারকদের দিকেও তাকিয়ে থাকে না।’
এ বক্তব্যে তারা পরিষ্কার করে জানিয়েছে যে, ইরানের জনগণের মুক্তির পথ কোনো বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ বা পুরোনো শাসনব্যবস্থার পুনরাবৃত্তির মধ্য দিয়ে আসবে না। ইরানের বামপন্থি রাজনৈতিক ধারার মধ্যে রেজা পাহলভির প্রতি বিরূপ মনোভাব বহুদিনের। এ মনোভাবের প্রতিফলন দেখা যায় তেহরান ও আশপাশের এলাকার বাস শ্রমিক ইউনিয়নের বক্তব্যে। এ ইউনিয়নটি ইরানের সবচেয়ে পরিচিত ও স্বাধীন শ্রমিক সংগঠনগুলোর একটি। তারা বুধবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা ‘পুরোনো ও কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতার কাঠামোর পুনরুত্থানের’ বিরোধিতা করে।
ইউনিয়নটি আরও বলেছে, ‘শ্রমিকদের মুক্তির পথ কোনো এমন নেতার মাধ্যমে আসে না, যাকে জনগণের ঊর্ধ্বে বসানো হয়, কিংবা বিদেশি শক্তির ওপর ভর করে এই মুক্তি অর্জন করা সম্ভব নয়।’ এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, শ্রমজীবী মানুষের একটি বড় অংশই রাজতন্ত্র কিংবা বিদেশনির্ভর রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করছে।
সবশেষে বলা যায়, বর্তমান সংস্কারপন্থি ইরানি নেতৃত্ব এখন গভীর সংকটে রয়েছে। জুন মাসে টানা ১২ দিনের যুদ্ধের মাধ্যমে যে জাতীয়তাবাদের আবহ তৈরি হয়েছিল, তা দ্রুতই ফিকে হয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়টি তারা বুঝতে পারছে, কিন্তু এর কার্যকর সমাধান খুঁজে পাচ্ছে না। তাদের সামনে এখন হাতেগোনা কয়েকটি পথ খোলা আছে।
একদিকে তারা জনগণকে একত্রিত করার চেষ্টা করতে পারে এই বলে যে, সব সমস্যার পেছনে রয়েছে বিদেশি ষড়যন্ত্র এবং কিছু দাঙ্গাবাজ গোষ্ঠী। অন্যদিকে তারা আশা করতে পারে যে, অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টেকনোক্র্যাটরা হয়তো কোনোভাবে প্রয়োজনীয় সম্পদ জোগাড় করে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঠেকাতে পারবেন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবেন। তবে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আহমাদ নাগিবজাদেহ মনে করেন, সমস্যার সমাধান আর কেবল প্রযুক্তিগত বা অর্থনৈতিক পদ্ধতিতে সম্ভব নয়। ইউরোনিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত ইরানকে ইউরোপে যা ঘটেছিল সেটাই পুনরাবৃত্তি করতে হবে। অর্থাৎ, ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বন্দ্বে রাষ্ট্রের পক্ষেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ এ মন্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ইরানের বর্তমান সংকট ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
লেখক: প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক ও বিশ্লেষক। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানের ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর। তিনি মূলত আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে লেখালেখি করেন। মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, ইউরোপীয় রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত বিষয়ে তার বিশ্লেষণ বিশেষভাবে সমাদৃত। জটিল কূটনৈতিক বিষয়গুলো সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করার দক্ষতার জন্য তিনি পাঠকদের কাছে পরিচিত। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ
মন্তব্য করুন