

আইরিশ ঔপন্যাসিক, কবি এবং সাহিত্য সমালোচক জেমস জয়েস আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। বিংশ শতাব্দীর সাহিত্যে তিনি যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন, যার প্রভাব বিশ্বসাহিত্যে বিদ্যমান।
জেমস জয়েস ১৮৮২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে জন্মগ্রহণ করেন। তার অধিকাংশ লেখালেখি ডাবলিনকে কেন্দ্র করে হলেও, জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি কাটিয়েছেন প্যারিস, ত্রিয়েস্তে এবং জুরিখে। তার প্রথম উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ ‘ডাবলিনার্স’-এ অত্যন্ত নিপুণভাবে তার শহরের মধ্যবিত্ত জীবনের স্থবিরতা-আধ্যাত্মিক দৈনদশা ফুটিয়ে তুলেছেন।
জয়েসের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো সাহিত্যে ‘চেতনার প্রবাহ’ কৌশলের সফল প্রয়োগ। তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘আ পোর্ট্রেট অব দ্য আর্টিস্ট অ্যাজ আ ইয়ং ম্যান’-এ (১৯১৬) তিনি একজন তরুণ শিল্পীর আত্মিক ও বৌদ্ধিক বিকাশের চিত্র তুলে ধরেছেন। তবে তাকে বিশ্বসাহিত্যের শিখরে পৌঁছে দেয় ১৯২২ সালে প্রকাশিত মহাকাব্যিক উপন্যাস ইউডিসিস। ইউডিসিস হোমারের ‘ওডিসি’র আদলে রচিত এ উপন্যাসে জয়েস ডাবলিনের এক দিনের সাধারণ ঘটনাপ্রবাহকে অসাধারণ জটিলতায় তুলে ধরেছেন। ভাষা নিয়ে তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং মানুষের মনের গহিনের অবদমিত চিন্তার প্রকাশ এ বইটিকে আধুনিক সাহিত্যের ‘বাইবেল’ হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। তার জীবনের শেষ বড় কাজ ‘ফিনেগানস ওয়েক’। এটি সাহিত্যের ইতিহাসের অন্যতম দুর্বোধ্য বই হিসেবে পরিচিত, যেখানে তিনি বহু ভাষা ও শব্দের সংমিশ্রণে এক স্বপ্নিল জগৎ তৈরি করেছেন।
ঔপন্যাসিক হিসেবে আকাশচুম্বী খ্যাতির আড়ালে তার কবিসত্তা কিছুটা ঢাকা পড়লেও তার কাব্যগ্রন্থ ‘চেম্বার মিউজিক’ জয়েসের লিরিক্যাল দক্ষতার প্রমাণ দেয়। একজন প্রখর সাহিত্য-সমালোচক হিসেবেও সমকালীন সাহিত্যধারাকে বিচার করেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। জেমস জয়েস ছিলেন নির্ভীক শিল্পী, যিনি প্রচলিত ব্যাকরণ ও আখ্যানরীতিকে ভেঙে নতুন পথ তৈরি করেন। তিনিই শেখান ভাষাকে কেবল ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং তাকে একটি শিল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
মজার বিষয় হলো, আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও তার জীবদ্দশায় বড় কোনো প্রথাগত সাহিত্য পুরস্কার পাননি। এর প্রধান কারণ ছিল তার লেখার অত্যন্ত আধুনিক ও সাহসী ধরন, যা সেই সময়ের রক্ষণশীল বিচারকদের কাছে অনেক সময় দুর্বোধ্য বা বিতর্কিত মনে হয়েছে। তবে মরণোত্তরকালে এবং সমসাময়িকে তার কাজের স্বীকৃতি ছিল আকাশচুম্বী। যেমন, তার একটি বড় স্বীকৃতি তার নামে ব্লুমসডে উদযাপন। তার ‘ইউডিসিস’ উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ কেন্দ্র করে প্রতি বছর ১৬ জুন সারা বিশ্বে (বিশেষ করে ডাবলিনে) ‘ব্লুমসডে’ পালন করা হয়। এটি কোনো একক লেখকের সম্মানে পালিত বিশ্বের অন্যতম বড় সাহিত্য উৎসব। এ ছাড়া আয়ারল্যান্ড সরকার তাদের মহান এ লেখককে সম্মানিত করতে আয়ারল্যান্ডের পুরোনো ১০ পাউন্ডের নোটে জেমস জয়েসের ছবি ও তার লেখার অংশ স্থান দিয়েছে। তার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়ারল্যান্ড এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিভিন্ন সময় মূল্যবান স্মারক মুদ্রা প্রকাশ করে। ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিন প্রতি বছর সাহিত্যের অসাধারণ অবদানের জন্য ‘James Joyce Award’ প্রদান করে থাকে। বিশ্বখ্যাত এ সাহিত্যিক ১৯৪১ সালের ১৩ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের জুরিখ শহরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জুরিখের শোশান গোরস্তানে তাকে সমাহিত করা হয়।
মন্তব্য করুন