কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:০৭ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচনী ইশতেহারে প্রবীণবান্ধব প্রতিশ্রুতি কোথায়

ড. দিলীপ কুমার সাহা
নির্বাচনী ইশতেহারে প্রবীণবান্ধব প্রতিশ্রুতি কোথায়

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নে ব্যস্ত। এ ইশতেহারই মূলত প্রতিটি দলের রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন, অগ্রাধিকার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রতিফলন ঘটে। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, দেশের ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বিষয়টি এখনো অধিকাংশ রাজনৈতিক আলোচনায় প্রান্তিক। একটি রাষ্ট্রের সভ্যতা, মানবিকতা ও নৈতিক অগ্রগতির প্রকৃত মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সে রাষ্ট্র তার প্রবীণ নাগরিকদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে—এ প্রশ্নের উত্তরের মাধ্যমে। শিশু ও যুবসমাজ যেমন ভবিষ্যতের প্রতীক, তেমনি প্রবীণরা অতীতের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম ও সাফল্যের জীবন্ত দলিল। অথচ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধির প্রতিযোগীতায় প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে ক্রমেই নীতিনির্ধারণের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে—বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

উন্নয়ন গবেষণা ও পরিসংখ্যান বলছে, আগামী দুই দশকে দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। গড়আয়ু বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন ও জন্মহারের হ্রাস—এ তিন মূল বাস্তবতার সম্মিলনে দেশ দ্রুত একটি তারুণ্যসমাজ থেকে ক্রমান্বয়ে বার্ধক্যপ্রবণ সমাজে রূপান্তরিত হচ্ছে। যে জনগোষ্ঠী একসময় সংখ্যায় নগণ্য ছিল, আগামী দুই-তিন দশকে তারাই হয়ে উঠবে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান সামাজিক বাস্তবতা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি এ পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত আছি? আমাদের রাষ্ট্রীয় দর্শন, সামাজিক কাঠামো ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার কি প্রবীণবান্ধব? প্রবীণ নাগরিকরা শুধু বয়সের ভারে নুয়ে পড়া কিছু মানুষ নন; তারা এ রাষ্ট্রের ইতিহাসের নির্মাতা। এ প্রবীণরাই সব সংগ্রাম থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পুনর্গঠন, প্রশাসন পরিচালনা, শিক্ষা বিস্তার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন—সব ক্ষেত্রেই তাদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তাদের অনেকেই মুখোমুখি হতে হচ্ছে আর্থিক অনিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও পারিবারিক অবহেলার মতো নির্মম বাস্তবতার। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রবীণদের জন্য বার্ধক্য ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কিংবা কিছু আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও সেগুলো এখনো খণ্ডিত, অপ্রতুল ও অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডিতে আবদ্ধ। গ্রামাঞ্চলের প্রবীণদের অবস্থা যেমন করুণ, তেমনি নগরজীবনের প্রবীণদের সমস্যা আরও জটিল—একাকিত্ব, মানসিক অবসাদ, নিরাপদ আবাসনের অভাব ও ব্যয়বহুল স্বাস্থ্যসেবা তাদের জীবনকে করে তুলছে অনিশ্চিত। অন্যদিকে পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন এ সংকটকে আরও তীব্র করেছে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারে রূপান্তর, কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে সন্তানদের শহর বা বিদেশমুখী হওয়া—সব মিলিয়ে প্রবীণদের ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক যত্নব্যবস্থা আজ দুর্বল। ফলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বেড়েছে, কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি স্পষ্ট। এ প্রেক্ষাপটে ‘প্রবীণবান্ধব রাষ্ট্র’ ধারণাটি শুধু একটি কল্যাণমূলক শব্দ নয়; এটি একটি নৈতিক ও সাংবিধানিক প্রশ্ন। রাষ্ট্র কি প্রবীণদের করুণার চোখে দেখে, নাকি অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়? প্রবীণদের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ কি শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, নাকি তা একটি স্থায়ী দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ? বিশেষ করে নির্বাচনী সময়গুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে প্রবীণদের প্রসঙ্গ প্রায়ই সীমিত থাকে ভাতা বৃদ্ধির আশ্বাসে। অথচ প্রবীণবান্ধব রাষ্ট্র গঠন মানে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়—এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে স্বাস্থ্য, বাসস্থান, সামাজিক অংশগ্রহণ, আইনগত সুরক্ষা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার। এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট, পরিমাপযোগ্য ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ছাড়া প্রবীণবান্ধবতার দাবি অর্থহীন।

একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র বুঝে নেয়—আজকের প্রবীণরা একসময় এ রাষ্ট্রের তরুণ ছিলেন আর আজকের তরুণরাই হবে আগামী দিনের প্রবীণ। সুতরাং প্রবীণদের প্রতি অবহেলা মানে ভবিষ্যতের নিজের প্রতি অবহেলা। এ বাস্তবতা উপলব্ধি করেই রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—প্রবীণবান্ধবতা কি শুধুই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, নাকি এটি রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক দায়?

প্রতিশ্রুতি থেকে দায়বদ্ধতায় উত্তরণের সময় প্রবীণবান্ধব রাষ্ট্র গঠন কোনো দয়ামূলক প্রকল্প নয়; এটি একটি সুন্দর সমাজের মৌলিক দায়িত্ব। একটি রাষ্ট্র তার প্রবীণ নাগরিকদের যেভাবে সম্মান দেয়, সেভাবেই তার গণতান্ত্রিক চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিফলিত হয়। বাংলাদেশ আজ যে জনমিতিক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে, সেখানে প্রবীণদের প্রশ্ন উপেক্ষা করার সুযোগ আর নেই। প্রবীণদের জন্য কিছু বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। প্রয়োজন জাতীয় প্রবীণ নীতিকে আইনে পরিবর্তন করা—যেখানে স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, আবাসন, আইনগত সুরক্ষা ও সক্রিয় বার্ধক্যের সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকবে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে এ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিতের ব্যবস্থা থাকবে। তদুপরি জেরিয়াট্রিক স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং কমিউনিটিভিত্তিক যত্নব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে প্রবীণদের সমাজের বোঝা হিসেবে নয়, সম্পদ হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, প্রশাসক, পেশাজীবী ও কর্মজীবী প্রবীণদের অভিজ্ঞতা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য অমূল্য সম্পদ। তাদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে সামাজিক পরামর্শ, স্বেচ্ছাসেবা, স্থানীয় সরকার ও নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা গেলে সমাজ আরও সমৃদ্ধ হবে।

এ প্রেক্ষাপটে আসন্ন নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আমাদের সুস্পষ্ট প্রত্যাশা—তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রবীণবান্ধব সমাজ গঠনের সুস্পষ্ট, পরিমাপযোগ্য ও বাস্তবভিত্তিক অঙ্গীকার অর্ন্তভুক্ত করা—যাতে নির্বাচনী ইশতেহারে প্রবীণদের বিষয়টি যেন প্রতীকী অনুচ্ছেদে সীমাবদ্ধ না থাকে। এটি হতে হবে সুস্পষ্ট অগ্রাধিকার, যেখানে প্রতিশ্রুতি থাকবে রোডম্যাপসহ বাস্তবায়নের রূপরেখা। আর ভোটারদের ও দায়িত্ব রয়েছে প্রবীণদের প্রশ্নে কে কতটা আন্তরিক, তা বিবেচনায় নিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি নৈতিক—একটি রাষ্ট্র কি তার প্রবীণ নাগরিকদের শুধু স্মরণ করে নির্বাচনের সময়, নাকি সারাজীবনের অবদানের স্বীকৃতি দেয় নীতিগতভাবে? প্রবীণবান্ধব রাষ্ট্র গঠন যদি শুধু প্রতিশ্রুতি হয়, তবে তা হবে রাজনৈতিক সৌজন্যতা কিন্তু তা যদি দায় হিসেবে গৃহীত হয়, তবেই গড়ে উঠবে একটি মানবিক ও টেকসই বাংলাদেশ। আসন্ন নির্বাচন হোক এমন এক সুযোগ, যেখানে রাজনীতি মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত হবে আর নির্বাচনী ইশতেহারে প্রবীণদের মর্যাদা ও অধিকার স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে। প্রবীণদের মর্যাদা নিশ্চিত করা মানে শুধু অতীতকে সম্মান করা নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি নিরাপদ সমাজ নির্মাণ। এখন সময় প্রতিশ্রুতি নয়, একান্তই তা দায়বদ্ধতার।

লেখক: যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জেরোন্টোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সোহেল হত্যায় একজনের মৃত্যুদণ্ড, ২ জনের যাবজীবন

আন্তর্জাতিক মুট কোর্ট প্রতিযোগিতায় সেরা ৮-এ কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

নিজ দলের প্রার্থীকেই অবাঞ্ছিত ঘোষণা গণঅধিকারের নেতাকর্মীদের

লক্ষ্মীপুরে যাচ্ছেন জামায়াত আমির

বিয়ের আগে যে ৭ প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি

প্রতিটি মুসলিম যেন এই অনুভূতি পায় : মারিয়া মিম

রমজানে বিনামূল্যে ইফতার পাবেন ১২ লাখ মানুষ

মুক্তিযোদ্ধা চাচাকে বাবা বানিয়ে চাকরি, কারাগারে জেষ্ঠ্য সহকারী সচিব

বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকে শোকজ

ইরানে মোসাদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে একজনের মৃত্যদণ্ড কার্যকর

১০

সাত সাগর আর তেরো নদী পাড়ি দিয়ে মুখোমুখি জায়েদ-তানিয়া

১১

দেশে ফিরতে চান সালাউদ্দিন

১২

ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হলেন হাবিব ওয়াহিদ

১৩

সবচেয়ে দুর্বল লিগের তকমা পেল বিপিএল

১৪

অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন রাভিনা

১৫

জুলাই আন্দোলনকারীরাই একদিন বিশ্বে নেতৃত্ব দেবে : প্রধান উপদেষ্টা

১৬

১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষের ভূমিধস বিজয় হবে : সালাহউদ্দিন আহমদ 

১৭

২৫ বছরের কৃষি পরিকল্পনা ঠিক করেছে সরকার

১৮

ট্রাম্পের সমালোচনা করতে গিয়ে হামলার শিকার কংগ্রেসের মুসলিম নারী সদস্য

১৯

ঘুমের মধ্যে পায়ের রগে টান লাগলে যে দোয়া পড়বেন

২০
X