বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ
প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:১৬ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ক্ষণিকের আনন্দ অনন্ত নিরানন্দ

ক্ষণিকের আনন্দ অনন্ত নিরানন্দ

আজকের সমাজে আমরা এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে ক্ষণিকের আনন্দ জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। মোবাইল স্ক্রলের তৃপ্তি, ফেসবুক বা রিলসের অন্তহীন প্রবাহ, কিংবা ভার্চুয়াল বিনোদনের সাময়িক স্বস্তি—এসবই আমাদের ক্লান্ত মনকে মুহূর্তের জন্য আরাম দেয়। কিন্তু এ স্বল্পস্থায়ী আনন্দের বিনিময়ে আমরা ধীরে ধীরে হারাচ্ছি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি, পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা এবং মানবিক মূল্যবোধের ভিত। সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্যটি হলো—এই ক্ষয়ের সবচেয়ে বড় এবং নীরব শিকার হয়ে উঠছে আমাদের সন্তানরা।

আজ মা-বাবা হিসেবে আমাদের দায়িত্ববোধ ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে সন্তানের খাওয়া-পরা নিশ্চিত করা, ভালো স্কুলে ভর্তি করানো, কিংবা একাধিক প্রাইভেট টিউটর ও কোচিংয়ের ব্যবস্থা করার মধ্যেই। আগের তুলনায় অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ার ফলে এসব কিছুটা সহজ হয়েছে—এ কথা সত্য। অনেক পরিবারেই দেখা যায়, সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিতে গাড়ি আছে, হাতে আছে দামি স্মার্টফোন, পড়াশোনার জন্য আছে একাধিক গাইড ও কোচিং। কিন্তু সেই সক্ষমতার মোহে আমরা একটি মৌলিক সত্য ভুলে যাচ্ছি—সন্তানকে মানুষ করতে হলে তাকে সময় দিতে হয়, সান্নিধ্য দিতে হয় এবং সবচেয়ে বেশি দিতে হয় মনোযোগ ও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা।

আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, পরিবারই সন্তানের প্রথম ও সবচেয়ে বড় বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয়ে কোনো পরীক্ষার খাতা নেই, কোনো পাঠ্যসূচিও নেই, কিন্তু প্রতিটি আচরণই সেখানে পাঠ হয়ে ওঠে। মা-বাবা কীভাবে কথা বলেন, মতভেদ হলে কীভাবে সমাধান করেন, বড়দের প্রতি কীভাবে সম্মান দেখান—এসব দেখেই সন্তান শেখে। এ বিদ্যালয়ে বইয়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন আদর-স্নেহ, শাসনের চেয়ে বেশি যুক্তিবোধ, আর নির্দেশের চেয়ে বেশি নিজের জীবনে তা প্রয়োগের উদাহরণ।

পরিবারের খাবার টেবিল হওয়া উচিত সেই বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ—যেখানে শিক্ষক হবেন মা-বাবা ও মুরুব্বিরা, আর শিক্ষার্থী হবে সন্তানরা। কিন্তু বাস্তবতায় আজ আমরা দেখি, একই টেবিলে বসে সবাই আলাদা স্ক্রিনে ব্যস্ত। কেউ মোবাইলে রিলস দেখছে, কেউ মেসেজ দিচ্ছে, কেউ টিভির দিকে তাকিয়ে আছে। খাবার আছে, কিন্তু সংলাপ নেই; একসঙ্গে বসা আছে, কিন্তু মানসিক উপস্থিতি নেই। এ নীরবতাই ধীরে ধীরে পরিবারকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে। সন্তান কখন ঘরে ফিরছে, কখন ঘুমাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে কিংবা কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে—এসব বিষয়ে আমাদের সচেতন তদারকি দিনদিন শিথিল হয়ে পড়ছে। অনেক সময় দেখা যায়, সন্তান রাত পর্যন্ত বাইরে থাকলেও মা-বাবা ব্যস্ত থাকেন নিজেদের কাজে বা মোবাইলে। আমরা বাবারা ডুবে থাকছি ফেসবুক, রিলস কিংবা দোকানের আড্ডায়; মায়েরা সময় কাটাচ্ছেন প্রিয় সিরিয়াল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এসব আমাদের মুহূর্তের আনন্দ দেয়; কিন্তু এই আনন্দের বিনিময়ে যে মূল্য দিতে হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ।

এই অবহেলার ফাঁকেই অনেক সন্তান ধীরে ধীরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কেউ বন্ধুবান্ধবের চাপ বা কৌতূহল থেকে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে, কেউ অপরাধপ্রবণ গোষ্ঠীর সংস্পর্শে আসে, কেউ আবার নীরবে মানসিক চাপ, হতাশা বা আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগতে থাকে। তখন বাবা-মায়ের ‘হুঁশ’ ফিরলেও বাস্তবতা নির্মম—সংশোধনের সুযোগ অনেকটাই ফুরিয়ে যায়। তখন প্রশ্ন আসে, ‘আগে বুঝলাম না কেন?’ কিন্তু সময় তখন আর ফিরে আসে না।

সন্তান মানুষ করার দায়িত্ব কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কোচিং সেন্টার বা টিউটরের একার নয়। তারা সহায়ক হতে পারে, বিকল্প নয়। সন্তানের জীবনের সবচেয়ে প্রভাবশালী শিক্ষক মা-বাবাই। সময় দেওয়া, মনোযোগ দিয়ে শোনা, সন্তানের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া, ভুল করলে যুক্তি দিয়ে বোঝানো এবং ভালো কাজে উৎসাহ দেওয়া—এসবই একটি সুস্থ, দায়িত্বশীল ও মানবিক প্রজন্ম গঠনের মূল ভিত্তি।

অন্যথায় আমরা অজান্তেই এমন এক সমাজ গড়ে তুলছি, যেখানে বাহ্যিক সাফল্য থাকবে—ভালো ফলাফল, ডিগ্রি, চাকরি থাকবে—কিন্তু ভেতরে থাকবে শূন্যতা, একাকিত্ব ও অনন্ত নিরানন্দ। তাই এখনই সময় থামার, ভাবার এবং ফিরে দেখার। ক্ষণিকের আনন্দের মোহ কাটিয়ে যদি আমরা পরিবারকে আবার জীবনের কেন্দ্রে না ফিরিয়ে আনি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের জবাবদিহি করার মতো কোনো ভাষা, কোনো যুক্তি—হয়তো কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না।

লেখক: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহ্বায়ক, ওয়েলবিয়িং-ফার্স্ট ইনিশিয়েটিভ (ওয়েফি), বাংলাদেশ

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় চোখে আলো ফিরেছে ৮৪ জনের

বাজেটে মোবাইল, বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তিপণ্যে বড় সুখবর

ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বিশ্বকাপ উন্মাদনায় দেশের পতাকা থাকুক সবার উপরে

গাজায় সহিংসতার দায়ে ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রীর ওপর ফ্রান্সের নিষেধাজ্ঞা

ঢাকায় নিখোঁজ জবি শিক্ষার্থীর বাবা, সন্ধান চায় ছেলে

নতুন রিসাইক্লিং উদ্যোগ / ৯০ শতাংশর বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য কমিয়েছে সিঙ্গার বাংলাদেশ

সরকারি বাঙলা কলেজে অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা

বাংলার নদী, বাংলার জীবন : ইতিহাস থেকে বর্তমান অবস্থা

ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১০

সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগে ‘হিট’ প্রকল্পের আওতায় ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত

১১

ল্যাবএইডে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক সেমিনার অনুষ্ঠিত

১২

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন

১৩

কক্সবাজারে ১৯ রোহিঙ্গা আটক

১৪

হিজবুল্লাহর রকেট হামলায় পিছু হটল ইসরায়েলি বাহিনী

১৫

ব্রাজিলের পতাকা টানাতে গিয়ে কিশোরের মৃত্যু

১৬

কাপ্তাই হ্রদে ডুবে চবি শিক্ষার্থীর মৃত্যু 

১৭

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সমর্থন চাইল নরওয়ে, তুলে ধরল একাধিক কারণ

১৮

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের উপদেষ্টা মঞ্জুশ্রী রায় চৌধুরীর পরলোকগমন

১৯

রামিসা হত্যা : দ্রুতই শুনানি করতে চান রাষ্ট্রপক্ষ

২০
X