তামাক ব্যবহারের অন্যতম মাধ্যম বিড়ি। দরিদ্র শ্রেণির ধূমপায়ীদের মধ্যে বিড়ি বেশ জনপ্রিয়। সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশে বিড়ি সম্মুখীন হয়েছে নানা প্রতিকূলতায়। শ্রমঘন দেশীয় কুটির শিল্প হিসেবে যেখানে বিড়ি আনুকূল্য পাওয়ার দাবিদার, সেখানে বিড়িকে সম্মুখীন হতে হয়েছে নানাবিধ প্রতিকূলতায়। বিড়ির বাজার প্রতিযোগী সিগারেট, বিশেষত বহুজাতিক সিগারেট কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে অন্যায্য সুবিধা ভোগ করে বিড়িকে অসম প্রতিযোগিতায় নিক্ষেপ করে এর বাজার দখল করেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ২০১৯ সালের প্রকাশনায় বলা হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্কদের তামাক ব্যবহারের বৈশ্বিক গবেষণা ২০০৯ ও ২০১৭ দেখাচ্ছে যে, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের ধূমপানের হার কমেছে দারুণভাবে—২০০৯ সালে ২৩ শতাংশ থেকে ২০১৭-তে ১৮ শতাংশ। তবে ধূমপানের এ নিম্নহার হয়েছে মূলত বিড়ির কারণে, যেটি ২০০৯-এ ছিল ১১.২ শতাংশ আর ২০১৭-তে হয়েছে ৫ শতাংশ।
পক্ষান্তরে সিগারেটের অবস্থা রয়েছে প্রায় অপরিবর্তিত, ২০০৯-এ ১৪.২ শতাংশ থেকে ২০১৭-তে ১৪ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের ২০০৯-এর আরেকটি প্রকাশনা জানাচ্ছে যে, বাংলাদেশে তামাকের ব্যবহার বিড়ি ও ধোঁয়াহীন তামাক গ্রহণ থেকে সিগারেটের ব্যবহারের দিকে সরে গেছে। সিগারেটের বহুস্তরের কর ব্যবস্থা কমদামি সিগারেটের সেবনকে উৎসাহিত করছে। যেহেতু কর ব্যবস্থার মাধ্যমে কমদামি সিগারেট ক্রয়ক্ষমতার মাঝে রাখা হচ্ছে, ফলে কমদামি সিগারেটের বাজার সম্প্রসারণ সিগারেটের বাজারকেই সমৃদ্ধ করছে।
নানাবিধ প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকা বিড়িকে সাম্প্রতিককালে মোকাবিলা করতে হচ্ছে নতুন সমস্যার সঙ্গে। সেটি হচ্ছে নকল বিড়ি। বিড়ি থেকে সরকার নির্ধারিত শুল্ক আদায়ের মাধ্যম হচ্ছে ব্যান্ডরোল। বিড়ি উৎপাদনকারীরা সরকারের কাছ থেকে নির্ধারিত দামে ব্যান্ডরোল কিনে তা বিড়ির প্যাকেটে লাগিয়ে দেয়। বৈধ ব্যান্ডরোল সংবলিত বিড়িই হচ্ছে আসল বিড়ি। পক্ষান্তরে নকল বিড়ি হচ্ছে ব্যান্ডরোলবিহীন, নকল ব্যান্ডরোলযুক্ত কিংবা একই ব্যান্ডরোল পুনঃব্যবহার করা। যেসব বিড়ি সরকার নির্ধারিত শুল্ক প্রদান না করে বিক্রি হয় সেগুলোই নকল বিড়ি। বর্তমানে ২৫ শলাকার এক প্যাকেট বিড়ির দাম সরকার নির্ধারণ করেছেন ১৮ টাকা, যার মধ্যে সরকার নির্ধারিত শুল্ক ৯.০৯ টাকা। তাই ৯ টাকার কম দামে বিক্রি হওয়া বিড়িকে নকল বিড়ি হিসেবে গণ্য করা যায়। কম দামে ভোক্তার কাছে বিড়ি বিক্রির প্রত্যাশা থেকেই নকল বিড়ির উৎপত্তি। বিড়ির দাম যখন কম ছিল, তখন নকল বিড়ির অস্তিত্ব তেমন ছিল না। ২০ বছর আগে বিড়ির দাম ছিল ২.৮৩ টাকা। তারপর দাম ক্রমাগতভাবে বেড়েছে, যার মধ্যে রয়েছে কয়েকবারের অতিমাত্রায় বৃদ্ধি—২০১৫-১৬ বছরের ৪.৯১ থেকে ২০১৬-১৭-তে ৭.১০, ২০১৭-১৮-তে ১২.৫০, ২০১৯-২০-এ ১৪ ও ২০২০-২১-এ ১৮ টাকা। বিড়ির দাম যখন বেড়েছে, তখন কম দামে বিড়ি প্রাপ্তির একটা বাজার তৈরি হয়েছে। নকল বিড়ি সেই বাজারের চাহিদা মেটাচ্ছে।
যেহেতু সরকার নির্ধারিত কর প্রদান করতে হয় না, নকল বিড়ি আসল বিড়ির চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করা যায়। ফলে দরিদ্র শ্রেণির ভোক্তারা সহজেই নকল বিড়ির প্রতি আকৃষ্ট হয়। নকল বিড়ি বিক্রিতে মুনাফা বেশি বলে তা বিক্রির জন্য ছোট ছোট দোকানি ও ভ্রাম্যমাণ হকারদের আগ্রহও বেশি।
বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে টিকে থাকতে হলে আর উচ্চ আয়ের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে কর্মসংস্থানের বিকল্প নেই। শ্রমঘন কুটির শিল্প বিড়ি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে তাদের জন্য যারা প্রচলিত কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ করতে পারে না। দরিদ্র নারী, প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বিড়ি অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে ভূমিকা রাখছে অনন্য। বিড়ির এ অবস্থানকে শক্তিশালী করতে হবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে। বিড়ির দাম বাড়িয়ে নকল বিড়ির বাজার সৃষ্টি এ অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রচেষ্টায় ছুরিকাঘাত। বিড়ির দাম বাড়লে সরকারের রাজস্ব আহরণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিড়ির মূল্য বৃদ্ধি নকল বাজার সৃষ্টি করে বিড়িকে ক্ষতিগ্রস্ত করে কর্মসংস্থান তথা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
তাই অবিলম্বে বিড়ির দাম কমিয়ে সরকারের রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির ব্যবস্থার পাশাপাশি নকল বিড়ির বাজার নস্যাৎ করে প্রকৃত বিড়ি শিল্পকে সমৃদ্ধ করে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনীতির উন্নয়নে অবদান রাখা প্রয়োজন।
লেখক: সম্পাদক, মেহনতি কণ্ঠ