

একটি ঘটনার তদন্ত শেষ না হতেই উঁকি দিচ্ছে আরেকটি। তদন্তের ভারে যেন নুয়ে পড়েছে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। বিপিএলের ফিক্সিং তদন্তের প্রতিবেদন জমা হতেই সামনে আসে নারী নির্যাতনের অভিযোগ, এরপর যোগ হয় পূর্বাচলের মাটি চুরি। সবশেষে আবারও নতুন করে ফিক্সিংয়ের অভিযোগ—একটির পর একটি তদন্তেই আটকে আছে বিসিবি। অথচ দেড় বছরে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার কোনো তদন্তেরই প্রকাশ পায়নি চূড়ান্ত রিপোর্ট। তবে কি বিসিবিতে চলছে ধামাচাপারই নীতি!
অক্টোবরে বিসিবির নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের পর একাধিক ঘটনার তদন্তে আলাদা আলাদা কমিটি গঠন করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত কোনো তদন্তেরই প্রতিবেদন প্রকাশ পায়নি। উল্টো প্রতিবেদন প্রকাশ না করেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় নেতিবাচক সমালোচনার মুখে পড়েছে বোর্ড। এতে তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। সর্বশেষ নারী দলের সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলমের তোলা যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটির মেয়াদ তিন দফা বাড়ানো হয়। বোর্ড পরিচালক থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায়ের অনেকের নামেই অভিযোগ ওঠে গণমাধ্যমে। আজ সেসব অভিযোগের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা তদন্ত কমিটির, কিন্তু সেটিও আদৌ প্রকাশ পাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে খোদ বিসিবিতেও। কালবেলার সঙ্গে আলাপকালে এক পরিচালক বলেন, ‘৩১ জানুয়ারি তাদের কমিটির মেয়াদ শেষ হবে। কিন্তু প্রতিবেদন কবে নাগাদ বোর্ডের কাছে জমা দেবে, তার নিশ্চয়তা নেই। আগামীকাল পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হবে কি না, তা-ও নিশ্চিত নই আমরা।’
আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বোর্ড যে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করেই ব্যবস্থা নিচ্ছে, তার প্রমাণও রয়েছে। ২০২৪-২৫ মৌসুমের বিপিএলে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ফিক্সিংয়ের অভিযোগ সামনে এলে তৎকালীন বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদের নির্দেশে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। প্রায় ৯ মাস ধরে চলা তদন্ত শেষে বিসিবিতে জমা দেওয়া হয় ৯০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন। এ সময় তদন্ত কমিটির ২৫টি বৈঠকে ব্যয় হয় প্রায় ৩৮ লাখ টাকা। এত বড় ও ব্যয়সাপেক্ষ প্রতিবেদন হলেও তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি বিসিবি। গোপনীয়তার অজুহাতে উল্টো বিপিএলের ড্রাফট থেকে বাদ দেওয়া হয় ৯ ক্রিকেটারকে। কী অপরাধে বা কোন অভিযোগে তাদের বাদ দেওয়া হলো—সে প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা। আশার কথা হচ্ছে, সর্বশেষ বোর্ড সভায় বিসিবির ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের চেয়ারম্যান অ্যালেক্স মার্শাল রিপোর্টটির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রকাশের ব্যাপারে কোনো আলাপ হয়নি বলে জানিয়েছে বোর্ড সভায় উপস্থিত এক পরিচালক।
এই তো ডিসেম্বরেই পূর্বাচল স্টেডিয়ামের ১২ হাজার ৫০০ সিএফটি মাটি উধাও হতে দেখা গেছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২৪ লাখ টাকা। এ ছাড়া অবশিষ্ট মাটির মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা; এতে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৭ লাখ টাকা। বিসিবির মতো প্রতিষ্ঠানের মাটি চুরি কীভাবে সম্ভব, তার অনুসন্ধানও হয়েছিল। বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের চেয়ারম্যান নাজমুল আবেদীন ফাহিমের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি সেই রিপোর্ট বোর্ডে জমা দিয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। কিন্তু দুমাস পেরিয়ে গেলেও কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা দেখা যায়নি। অন্য সব ঘটনার মতোই পর্দার আড়ালে চাপা পড়ে গেছে মাটি চুরির এই ঘটনা।
শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিসিবিতে ব্যাপক অনিয়মের অনুসন্ধান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একাধিক দফা তদন্ত শেষে সংস্থাটি বেশ কয়েকটি গুরুতর অভিযোগের সত্যতাও পায়। তবে সেই প্রতিবেদন আজও জনসমক্ষে প্রকাশ পায়নি। এমনকি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধেও কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। বোর্ডের একটি সূত্র বলছে, দুদকের পরামর্শ অনুযায়ী, আগামী মাসের শুরুতেই বিসিবি অ্যাডমিনিস্ট্রি বিভাগ ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ চূড়ান্ত।
কিন্তু একের পর এক ঘটনার তদন্ত হলেও রিপোর্ট প্রকাশিত না হওয়ায় বোর্ডের দায় দেখছেন অনেকেই। বিসিবির সাবেক পরিচালক সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর কালবেলাকে বলেন, ‘ঘটনাগুলোর সঙ্গে তাদেরও সম্পৃক্ততা আছে মনে হচ্ছে, না থাকলে তো অবশ্যই এগুলো সামনে আসত। এই যে এবার বিপিএল ফিক্সিং নিয়ে আলোচনা, সেখানে মিডিয়ায় দেখলাম প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধেও অভিযোগ—সত্য, মিথ্যা জানি না; সেটা তো তদন্তে হলে প্রকাশ পাবে। আবার নারী ক্রিকেটের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় অভিযোগ উঠল, বোর্ডের পরিচালক নাজমুল আবেদীন ফাহিমের নামও জড়ালো। কিন্তু তারও তদন্ত এখনো শেষ হতে দেখলাম না।’ এসব তদন্ত আই-ওয়াশ হয়ে থাকলে দেশের ক্রিকেট ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও মত দেন এই পরিচালক, ‘এগুলোর তদন্ত রিপোর্ট সবার সামনে আসা দরকার, না হলে দর্শকরা আস্থা হারাবে। একই সঙ্গে পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানগুলোও বিসিবি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।’ এবার বোর্ড কোন পথে হাঁটে, সেটাই দেখার অপেক্ষায় সবাই।
মন্তব্য করুন