ভারিবর্ষণ ও উজানের ঢলে সৃষ্ট বন্যায় বাংলাদেশের ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুরের বিরাট অঞ্চল তলিয়ে গেছে। চারদিকে শুধু উদ্ধারের আকুতি। খাবার ও বাসস্থানের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। ভেসে গেছে অনেক ঘরবাড়ি, ফসলের মাঠ ও গবাদি পশু, যা গত ৫০ বছরেও ঘটেনি। এমন অবস্থায় সহায়তার হাত বাড়িয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দল এবং প্রতিষ্ঠান। বরাবরের মতোই দল গোছানোর পাশাপাশি দুর্যোগপূর্ণ এসব এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বিএনপি। এরই মধ্যে বন্যাকবলিত বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছেন দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। যেসব এলাকায় বন্যার প্রকোপ বেশি, সেসব এলাকার ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকাও সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এদিকে গত জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহত এবং আহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে বিএনপি। দলের একাধিক দাতব্য ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন (জেডআরএফ) এবং ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) ও ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ত্রাণ সংস্থানের জন্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর নেতৃত্বে একটি কেন্দ্রীয় অর্থ কমিটিও গঠন করেছে বিএনপি।
জানা গেছে, দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে বন্যায় বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত বৃহস্পতিবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভায় বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানো এবং ত্রাণ বিতরণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে যুক্তরাজ্য থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেগম সেলিমা রহমান, মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ ও সালাহউদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে বন্যার কারণ এবং সাংগঠনিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সভায় দেশের ক্রমবর্ধমান আশঙ্কাজনক বন্যা পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের নেতৃত্বে বন্যাকবলিত মানুষের সহায়তায় বেশ কয়েকটি টিম গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয়ভাবে সারা দেশের বন্যা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং করবে বিএনপি। এ ছাড়া স্থায়ী কমিটির সদস্যদের বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ গতকাল শুক্রবার বিকেলে কুমিল্লায় হোমনায় গোমতী বাঁধের বন্যাকবলিত বিবিরবাজার এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে দলের পক্ষে ত্রাণ সহায়তা তুলে দেন। এ সময় বিএনপির কুমিল্লা বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়াসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আপনারা বানভাসি মানুষ। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ হলেও আপনাদের কথা ভুলেননি। তিনি আপনাদের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও নির্দেশনা দিয়েছেন সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা যাতে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ান এবং উদ্ধার কার্যক্রমে যুক্ত হন। সেজন্য আমরা দ্রুত আপনাদের মাঝে এসেছি। এই অঞ্চলের সব নেতাকর্মীকে আহ্বান জানাই যতদিন ত্রাণ সহায়তা দরকার, ততদিন পাশে থাকবেন। বিশেষ করে বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনের সময়ও পাশে থাকবেন। আমরা কেন্দ্র থেকে আপনাদের সহায়তা দেব।
গতকাল লক্ষ্মীপুর সদরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন এবং দুর্গতদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী তুলে দেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির সদস্য সচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। পরে স্থানীয় ভবানীগঞ্জে এক পথসভায় তিনি বলেন, বন্যায় দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের কাছে ছুটে যাওয়া এই মুহূর্তে বিএনপির প্রধান কাজ।
চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে ড্যাব ও জেডআরএফ: শেখ হাসিনার পতনের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সাধারণ মানুষের ওপর আওয়ামী সন্ত্রাসী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্মম নির্যাতনে হতাহতদের খোঁজ নিচ্ছে বিএনপি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, জেডআরএফের প্রেসিডেন্ট তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের পক্ষে প্রতিদিনই নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা এবং আহতদের চিকিৎসাসহ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিনই প্রতিনিধিরা বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং আর্থিকভাবে সহযোগিতা করছেন নেতারা।
ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার কালবেলাকে বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসার জন্য জেডআরএফের চিকিৎসক দল সর্বাত্মকভাবে সহায়তা করছে। এখন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও ওষুধ বিতরণ করা হচ্ছে। বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি তারেক রহমানের পক্ষে বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহত দুই শতাধিক ছাত্র-জনতাকে চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। এ কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে।
জেডআরএফের রিহ্যাবিলিটেশন কমিটির আহ্বায়ক ডা. শাহ মুহম্মদ আমান উল্লাহ প্রতিদিনই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের খোঁজখবর নিচ্ছেন। তিনি বলেন, তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমানের পক্ষে হাসপাতালে গিয়ে আহতদের সঙ্গে কথা বলে শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসার সার্বিক খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। এখন বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ, ওষুধসহ আর্থিক সহায়তা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
ছাত্র আন্দোলনে হতাহতদের পরিবারে আর্থিক সহায়তা: এদিকে তারেক রহমানের পক্ষে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারকে সহায়তা দিচ্ছে দলের অন্যতম সেল ‘আমরা বিএনপি পরিবার’। রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে আহতদের সঙ্গে কথা বলে সাহায্য পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন সেলের উপদেষ্টা ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল ও আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমন। রুমন জানান, প্রায় দেড় শতাধিক আহত ব্যক্তিকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। নিহত কয়েকজনের পরিবারকেও সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। শিগগিরই বন্যার্তদের জন্য ত্রাণসহায়তা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।