সজিব ঘোষ
প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৫, ১০:০৯ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

৬৫৩ কোটি টাকার ঘা শুকায়নি, ফের চীনের ইঞ্জিন চায় সরকার

তীব্র সংকটে রেল
ট্রেন। ছবি : সংগৃহীত
ট্রেন। ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশ রেলওয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটে ভুগছে। সবচেয়ে তীব্র সংকট এখন লোকোমোটিভ (রেলের ইঞ্জিন) নিয়ে। এ অবস্থায় সরকার চীনের কাছে ২০টি লোকোমোটিভ অনুদান হিসেবে চেয়েছে। শুধু তাই নয়, যদি চীন অনুদান দেয়, তবে কাস্টমস শুল্ক, ডিডি ও ভ্যাট বাবদ খরচও চীনকেই বহন করতে হবে—এমন শর্তও সরকারের আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চীন আসলেই অনুদান দেবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ। চীনের ইঞ্জিন নষ্ট হলে বা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ রেলওয়ের যথেষ্ট সক্ষমতা নেই। চীন তাদের নিজস্ব নেটওয়ার্কে মিটারগেজ লোকোমোটিভ ব্যবহার করে না, কেবল সীমিত শিল্পাঞ্চল বা খনিতে ব্যবহার করে। ফলে ভবিষ্যতে যন্ত্রাংশ পাওয়া কঠিন হতে পারে। চীনা ইঞ্জিন নিয়ে আগের অভিজ্ঞতাও ইতিবাচক নয়।

২০১৩ সালে চীন থেকে ৬৫৩ কোটি টাকায় ২০ সেট ডেমু ট্রেন কেনা হয়েছিল, যেগুলোর আয়ু ধরা হয়েছিল ২০ বছর। কিন্তু মাত্র ছয় বছরেই এগুলো অচল হয়ে পড়ে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এতে সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় হয়েছে।

তাদের মতে, ‘সব অনুদান নিলেই লাভ হয় না। চালানোর মতো সক্ষমতা আছে কি না, সেটিও দেখতে হয়।’ তারা মনে করেন, অনুদান নেওয়ার আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করা জরুরি। নতুন ইঞ্জিন আনা হলে সেগুলো একেবারে নতুন নাকি পুরোনো—তাও নিশ্চিত হওয়া দরকার। পুরোনো ইঞ্জিন আনা হলে বিপদ আরও বাড়বে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, নীতিগত অনুমোদন ছাড়াই সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ইআরডির মাধ্যমে এরই মধ্যে আবেদন করা হয়েছে। তবে চীন সরাসরি অনুদান দেবে নাকি শুধু সরবরাহ করবে—এ বিষয়ে কোনো লিখিত নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।

গত ১৪ জুলাই প্রকল্প যাচাই কমিটির এক সভায় রেলওয়ের পক্ষ থেকে ‘২০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহ’ শীর্ষক প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। সভায় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাদ দিয়ে রেলওয়ে মাস্টার প্ল্যান, এসডিজি, জাতীয় পরিবহন পরিকল্পনা এবং আইআইএফসির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের তথ্য যুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্তত ১০ বছর পর সার্ভিস ব্যবস্থার বিষয়টিও প্রস্তাবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার কথা বলা হয়।

রেল সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, ‘চীন অনুদান দেবে কি না, লিখিতভাবে জানায়নি, তবে মৌখিকভাবে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ইঞ্জিন আনার বিষয়টি কনক্রিট হয়নি।’

রেলওয়ের যন্ত্রপ্রকৌশল বিভাগের তথ্যে জানা যায়, পুরোপুরি অনুদান হিসেবে লোকোমোটিভ চাওয়া হয়েছে, এমনকি কাস্টমস ও ভ্যাটের খরচও চীনকে বহন করতে বলা হয়েছে। রেল কর্মকর্তাদের দাবি, লোকোমোটিভের তীব্র সংকট মোকাবিলায় অন্য কোনো বিকল্প নেই।

বর্তমানে রেলের বহরে ৩০৬টি লোকোমোটিভ আছে—এর মধ্যে ১৭৪টি মিটারগেজ এবং ১৩২টি ব্রডগেজ। কিন্তু মিটারগেজ লোকোমোটিভের ৭১ শতাংশই ২০ বছরের বেশি পুরোনো, এর মধ্যে ৬৮টি ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে। এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়বহুল ও যন্ত্রাংশ দুর্লভ হয়ে পড়েছে।

রেলের মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী, ধাপে ধাপে মিটারগেজ লাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছে। ফলে অনুমান করা হচ্ছে, অন্তত ২০৫৫ থেকে ২০৬০ সাল পর্যন্ত মিটারগেজ ট্রেন চালু রাখতে হবে। সে কারণে নতুন মিটারগেজ লোকোমোটিভ আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।

তবে চীনা লোকোমোটিভ নিয়ে আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘অনুদান আনা বড় বিষয় নয়, এগুলো ব্যবহারযোগ্য হবে কি না, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। চালাতে সমস্যা হলে বা যন্ত্রাংশ না পাওয়া গেলে এগুলো বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। ডেমু কেনায় যেমন অর্থ অপচয় হয়েছে, তেমন অভিজ্ঞতা যেন আবার না হয়।’

রেল সচিবও স্বীকার করেছেন, ‘বাংলাদেশে চীনা লোকোমোটিভ ব্যবহারের অভিজ্ঞতা নেই। তাই নতুন লোকোমোটিভ আনা হলে সার্ভিস ওয়ারেন্টি, রিপেয়ারিং প্লান্ট বা অন্তত পাঁচ বছরের সার্ভিস গ্যারান্টি নিশ্চিত করতে হবে।’

তবে এ প্রক্রিয়ায় নীতিগত অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন আছে। গাইডলাইন অনুযায়ী, বৈদেশিক অর্থায়নের জন্য প্রাথমিক প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন নিতে হয়। চীনা লোকোমোটিভ প্রকল্পের ক্ষেত্রে তা অনুসরণ হয়নি বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ফলে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মেয়ে হত্যার রায় শুনতে আদালতে রামিসার বাবা 

শাপলা চত্বর হত্যা মামলা / দিপুমণি-ফারজানা রূপাসহ ৯ আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির

বিশ্বকাপ ভিসা প্রত্যাখ্যান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দা ইরানের

ট্রেনের সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষ, চট্টগ্রামের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ

এক কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়ের বাধা অতিক্রমের গল্প

খুলনার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের রেল যোগাযোগ বন্ধ

আবাসিক হোটেলে সাবেক ইউপি সদস্যের মরদেহ, বোরকা পরা নারীকে খুঁজছে পুলিশ

১১টায় রায় ঘোষণা, একটি ন্যায়বিচারের জন্য উন্মুখ পুরো জাতি

ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ধনকুবের

ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি ব্রিজ ধসে জনদুর্ভোগ চরমে

১০

ধান কাটতে বলায় গাছের ডাল দিয়ে পিটিয়ে হত্যা

১১

মেট্রোরেল নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত, আজ থেকেই কার্যকর

১২

বিসিবিতে আজ আমেজহীন আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার নির্বাচন

১৩

শাপলা চত্বর হত্যাযজ্ঞ মামলা: ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন আজ

১৪

রাশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

১৫

জব্দ ইরানি অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত মিত্র দেশগুলোকে দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

১৬

তরুণীকে তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ

১৭

আলোচিত মামলার রায় শোনার অপেক্ষায় জাতি, আদালতে সোহেল-স্বপ্না

১৮

মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর গোয়েন্দাগিরি করছে ইসরায়েল, কারণ ইরান

১৯

মার্টিনেস ও সিমেওনের গোলে হন্ডুরাসকে হারাল আর্জেন্টিনা

২০
X