ফরহাদ হোসেন, কয়রা (খুলনা)
প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০২৫, ০৯:৫১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

চারদিকে বিশাল জলরাশি, কোথাও নেই সুপেয় পানি

পুকুর থেকে পানি নিচ্ছেন এলাকার নারী শিশুরা। ছবি : কালবেলা
পুকুর থেকে পানি নিচ্ছেন এলাকার নারী শিশুরা। ছবি : কালবেলা

সুন্দরবন বেষ্টিত খুলনার কয়রায় দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির তীব্র সংকট। চারদিকে সুবিশাল জলরাশি থাকলেও কোথাও নেই পানযোগ্য পানি। অনেক স্থানে গভীর নলকূপ থাকলেও পানিতে আয়রন ও লবণযুক্ত। পুকুরের দূষিত পানি পান করে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেকেই।

উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে ৩ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। কিন্তু ৬০ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত। ৫নং কয়রা, ৬নং কয়রা, ৪নং কয়রা, গড়িয়াবাড়ি, পাথরখালী, মঠবাড়ি, তেঁতুলতলার চর, কালীবাড়ি সাতহালিয়া, চৌকুনী, গাতিরঘেরিসহ উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় খাবার পানির সংকট রয়েছে।

সরেজমিনে শুক্রবার (২১ মার্চ) উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৫ নম্বর কয়রা গ্রামের সরকারি পুকুরে গিয়ে দেখা যায়, খাবার পানি সংগ্রহের জন্য কয়েকটি গ্রাম থেকে লোকজন পড়ন্ত বিকেলে দূরদূরান্ত থেকে হেঁটে পানি নিতে এসেছেন। অনেকেই কাঁখে কলসি নিয়ে দলবদ্ধভাবে আসছেন পানি নিতে। কেউ বা ব্যস্ত কলসিতে পানি ভরতে। আবার অনেকেই কলসিতে পানি ভরে ফিরে যাচ্ছেন বাড়ির পথ ধরে।

৬ নম্বর কয়রা গ্রাম থেকে ৪ কিলোমিটার হেঁটে ফাঁকা মাঠ পাড়ি দিয়ে পুকুরের পানি নিতে এসেছেন পঞ্চাশোর্ধ খাদিজা খাতুন। বয়সের কারণে অনেকটা পথ হেঁটে আসায় হাঁপিয়ে উঠেছেন তিনি। ক্লান্তি দূর করতে কলসি রেখে বিশ্রামে বসে পড়েছেন ঘাটে। বিশ্রামের সময় কথা হয় তার সঙ্গে। কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘পানির অনেক কষ্ট আমাদের। প্রতিদিন চার কলস পানি লাগে আমার। একবারে চার কলস পানি নিতে পারি না। তাই বাধ্য হয়ে দুইবার আসতে হয় এখানে। পানি নিতে আমি আর আমার মেয়ে আসি। দুজন দুই কলস করে পানি নিয়ে যাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘বয়স হয়ে গেছে। এখন আর আগের মতো হাঁটতে পারি না। দুইবার পানি আনতে দিনের আধাবেলা লেগে যায়। আমাদের আশপাশে আর কোথাও মিষ্টি পানি না থাকায় এই পানি দিয়ে খাওয়া ও রান্নার কাজ করতে হয়।’ স্থানীয় বাসিন্দা রওশানারা খাতুন বলেন, ‘আমাদের এখানে টিউবওয়েলে ভালো পানি পাওয়া যায় না। বর্ষা মৌসুমের পর ২০ লিটার পানি ৩০ টাকা দিয়ে কয়রা সদর থেকে কিনে খেতে হয়। শুনতিছি সরকার পানির ট্যাঙ্কি দেয়, কিন্তু আমরা পাই না। আমাদের তো আর টাকা দিয়ে পানি কিনে খাওয়ার সামর্থ্য নাই। তাই বাধ্য হয়ে পুকুরের পানি খাই।’

পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে পানি নিতে আসা তাসলিমা খাতুন বলেন, ‘আমরা বর্ষাকালে একটু ভালো থাকি। তারপর বাকি সময় ধরে খুবই কষ্ট হয় আমাদের। কিন্তু আমাদের এক পুকুর থেকে মানুষ, গরু-ছাগল একলগে পানি খাচ্ছি। মাঝে মাঝে পানিদূষণের কারণে অনেকেই নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছি। পুকুরের চার পাশে ঘেরা বেড়া থাকলে গরু-ছাগল পুকুরে নেমে পানি দূষিত করতে পারত না।’

৬ নম্বর কয়রা গ্রামে বসবাসকারী নৃগোষ্ঠী মুন্ডা সম্প্রদায়ের বাসন্তী মুন্ডা বলেন, ‘আমাদের কয়েক কিলোমিটার দূর হতে পুকুরের পানি এনে খেতে হয়। দিনের অর্ধেক সময় পার করতে হয় রান্না ও খাওয়ার পানি আনতে। এ রকম সমস্যা অধিকাংশ জায়গায়।’

কয়রা সদর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডে অবস্থিত স্থানীয়দের দান করা ৩ বিঘা জমির ওপর সরকারি পুকুরটি খনন করা হয় ৮০-এর দশকে। সেই থেকে পুকুরটি কয়েকবার নামমাত্র খনন করা হলেও এ রক্ষণাবেক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেয়নি কর্তৃপক্ষ। সরেজমিন দেখা গেছে, পুকুরের দুই পাড়ে দুটি পিএসএফ অকেজো হয়ে পড়ে আছে। নেই কোনো ঘাটের ব্যবস্থা। প্রতিদিন শত শত নারী-পুরুষ বিভিন্ন গ্রাম থেকে হেঁটে, কেউ ভ্যানে করে পুকুর থেকে কাদামিশ্রিত, লবণযুক্ত পানি নিয়ে যাচ্ছে। পুকুরটির চারপাশে ঘেরা বেড়ার ব্যবস্থা না থাকায় গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি অবাধে পুকুরে নেমে দূষিত করছে পানি।

চিকিৎসকরা বলছেন, মানুষ ও পশুপাখি একই পুকুরের পানি ব্যবহারের ফলে রোগের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। দূষিত পানি পান করার ফলে আমাশয়, ডায়রিয়া, কলেরা, হেপাটাইটিসসহ নানা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে অনেক মানুষ। বিশেষ করে ছোট শিশু ও বৃদ্ধরা এসব রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি।

কয়রা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী ইস্তিয়াক আহমেদ বলেন, কয়রা একটি দুর্যোগপ্রবণ এলাকা। এখানে অধিকাংশ মানুষই দরিদ্র। লবণাক্ততার করণে অধিকাংশ এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন করা সম্ভব হয় না। গ্রীষ্মকালে পুকুরের পানি কমে যাওয়ায় খাবার পানির সংকট থাকে। তবে সরকারিভাবে ট্যাঙ্ক সরবরাহ করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় লোকজনের সারা বছরের জন্য প্রয়োজনীয় পানির চাহিদা পূরণের চেষ্টা চলছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুলী বিশ্বাস কালবেলাকে বলেন, ৫ নম্বর কয়রা সরকারি পুকুরের বিষয়টা জানা ছিল না। আপনার মাধ্যমে জেনেছি। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরের মাধ্যমে দ্রুত পুকুরের পিএসএফ সংস্কার করে চারপাশে ঘেরার ব্যবস্থা করা হবে। যাতে পুকুরে কোনো পশুপাখি প্রবেশ করতে না পারে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্রেমিকের স্ত্রীকে এইচআইভি ইনজেকশন পুশ করলেন তরুণী

ট্রফি উদযাপনের দিনে রাজশাহী-বগুড়াবাসীকে যে বার্তা দিলেন মুশফিক

নির্বাচনকে গণতন্ত্র পুনর্গঠনের আন্দোলন হিসেবে দেখছি : জুনায়েদ সাকি

এনপিএ ও কমিউনিটি ব্যাংকের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত

ভারতকে ‘ভালো প্রতিবেশী’ বললেন চীনের প্রেসিডেন্ট

সাজাপ্রাপ্ত সাবেক প্রেসিডেন্টের সমর্থকদের সমাবেশে বজ্রপাত, আহত ৮৯

নিখোঁজ কুকুরের সন্ধান দিলে ৩ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা

দেশের বাইরে বসে বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণের দিন শেষ : সারজিস

ফলাফল না জানা পর্যন্ত কেন্দ্র ছাড়বেন না : শেখ আব্দুল্লাহ 

৩২ দলের অংশগ্রহণে শেষ হলো জমজমাট ‘হোন্ডা ফুটসাল লিগ’

১০

হাসপাতালে নারী ওয়াশরুমে গোপন ক্যামেরা, ইন্টার্ন চিকিৎসক আটক

১১

দুই স্পিডবোটের সংঘর্ষে নারী নিহত

১২

মিজানুর রহমান সোহেলের ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ বইয়ের প্রি-অর্ডার শুরু

১৩

বিদ্যালয়ের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় দুই শিক্ষকের মারামারি

১৪

বিএনপি ১৮ কোটি মানুষের ৩৬ কোটি হাতকে কর্মের হাতে পরিণত করবে : সালাহউদ্দিন

১৫

গণমানুষের স্বাস্থ্যসেবায় বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ : ডা. রফিক

১৬

এলাকার মানুষের দুঃখ দূর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ : হাবিব

১৭

আবার নির্বাচনের আগে বিএনপির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র : মির্জা আব্বাস

১৮

বৃষ্টির পূর্বাভাস

১৯

ঢাবিতে দোয়া-স্মরণসভায় শহীদ ওসমান হাদির ন্যায়বিচারের দাবি

২০
X