রায়পুরা (নরসিংদী) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৪, ০৯:১৭ এএম
আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৪, ১০:০১ এএম
অনলাইন সংস্করণ

সরকারি হাসপাতালগুলোতে বেড়েই চলেছে দালালদের দৌরাত্ম্য

নরসিংদী সদর হাসপাতালে রোগীদের ভিড়। ছবি : কালবেলা
নরসিংদী সদর হাসপাতালে রোগীদের ভিড়। ছবি : কালবেলা

নরসিংদীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে দালালদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। কমবেশি প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে দালালচক্রের প্রভাব লক্ষণীয়। দালালরা সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থার খারাপ চিত্র তুলে ধরে রোগীদের ভাগিয়ে নিচ্ছে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে।

চিকিৎসকরা রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিলে সেগুলোও তারা বিভিন্ন কৌশলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে করাচ্ছে। আর এসব দালালের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা হাসপাতালে কর্মরত সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তি, আশপাশের ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকসহ প্রভাবশালীরা।

দালালরা গ্রামের দরিদ্র, অসহায়, যারা কিনা চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে কিছুই জানে না তাদের টার্গেট করে। কম খরচে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অস্ত্রোপচার করিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বেসরকারি কোনো ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যায় এবং ভর্তি করায়। ফলে সরকারি হাসপাতালের স্বল্প মূল্যের পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় এবং অধিক অর্থ ব্যয় করে সর্বস্বান্ত হয়ে ফেরে ভুক্তভোগীরা। মানহীন হাসপাতালে যাওয়ায় অনেক সময় সুচিকিৎসার অভাবে রোগীর মৃত্যু ঘটে।

নাম গোপন রাখার শর্তে এক দালাল বলেন, জেলা ও সদর হাসপাতাল এলাকায় গড়ে ওঠা বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর মালিকরা এলাকার স্থানীয় প্রভাবশালী লোক, হাসপাতালে কর্মরত ঝাড়ুদার, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন কর্মকর্তা ও কর্মচারী, ইজিবাইক চালকদের নিয়ে দালাল চক্র তৈরি করা হয়েছে। চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা লিখে দেওয়ার পর দালালরা রোগীদের বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যায়। একজন রোগী নিয়ে আসতে পারলে দালাল ১০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং পরিস্থিতি ভেদে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন পায়। যতবেশি পরীক্ষা করবে রোগী, তত বেশি কমিশন পাবে দালাল।

এ বিষয়ে সচেতন মহল বলছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না। স্বাস্থ্য কপ্লেক্সে একটু বেশি জ্বর-ঠান্ডা নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসলেই রোগীদের জেলা কিংবা সদর হাসপাতালে রেফার করে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলেই বলে নরসিংদীতে যান, জেলা বা সদরে।

রায়পুরা উপজেলার হাসনাবাদ এলাকার আরিফ মিয়া নামে এক শিক্ষক বলেন, সরকারি হাসপাতালে সেবা নেওয়ার পথে নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। বিত্তবানরা সরকারি হাসপাতালের ধারেকাছে যায় না। নিরুপায় মানুষই সেখানে চিকিৎসা নিতে যায়। সেবাগ্রহীতারা কম ব্যয়ে ভালো সেবা পাওয়ার প্রত্যাশা করে। সরকারও হাসপাতালগুলোতে কম ব্যয়ে সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে হাসপাতালগুলোতে। আর এই সরকারি হাসপাতালগুলোতেই যদি এমন হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা নেবে কীভাবে?

নরসিংদী সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রায়পুরা উপজেলার নিলক্ষা গ্রামের মাহফুজুর রহমান বলেন, হাসপাতালে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও তা হাসপাতালে আসা রোগীদের সেবায় ব্যবহার হচ্ছে না। এ হাসপাতালে সিন্ডিকেটধারী অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায়ীদের সিরিয়াল অনুযায়ী ব্যক্তিমালিকানা অ্যাম্বুলেন্স বেশি টাকায় ভাড়া নিতে হয়। সরকারি অ্যাম্বুলেন্স নিতে চাইলে বিভিন্ন টালবাহানা করে।

জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রায়পুরা উপজেলার চরসুবুদ্ধি খাঁপাড়া গ্রামের বয়বৃদ্ধা আমেনা বেগমের সঙ্গে আসা তার নাত্নি তামান্ন আক্তার বলেন, আমার দাদুর শ্বাসকষ্টের জন্য ডাক্তার দেখাতে এসেছি। ডাক্তার দেখেছে এবং এক্স-রে ও ইসিজি করার জন্য লিখে দিয়েছে। আমি দাদুকে নিয়ে ডাক্তারের রুম থেকে বের হতেই একজন লোক আমাদের বলে ‘আসেন আমার সঙ্গে, আপনাকে কম টাকায় খুব দ্রুত পরীক্ষাগুলো করিয়ে দেব। এখানে অনেক মানুষ, আপনি পরীক্ষা করাতে পারবেন না।’ কিন্তু আমরা তার সঙ্গে যাইনি। এ হাসপাতালেই পরীক্ষাগুলো করিয়েছি এবং খুব দ্রুতই পরীক্ষার রিপোর্ট দিয়েছে। টাকাও অনেক কম লেগেছে।

নরসিংদী জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এএনএম মিজানুর রহমান বলেন, নরসিংদী জেলা হাসপাতালকে একটি আধুনিক ও মডেল হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষে কাজ করে যাচ্ছি। মানুষের সেবার পরিধি বাড়ানোর জন্য আমি প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন দপ্তরে দপ্তরে যোগাযোগ করছি। আমাদের এখানে এক্স-রে বন্ধ ছিল, আমি ডিজিটাল এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম চালু করেছি। অন্যান্য পরীক্ষাগুলোও নিয়মিত করা হচ্ছে। এছাড়া জেলা হাসপাতালে রোগীরা যেন সঠিক চিকিৎসা সেবা পায় সে জন্য আমি প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। তাছাড়া হাসপাতাল দালালমুক্ত করতে আমি বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছি। একদিনেই আর দালালমুক্ত করতে পারব না। তবে আমি আশা করি, সকলের সহযোগিতা পেলে খুব দ্রুতই এ হাসপাতাল দালালমুক্ত হবে।

নরসিংদী সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মাহমুদুল কবির বাশার বলেন, দালালদের বিষয়ে আমরা অনেকবার অভিযান পরিচালনা করেছি। থানা থেকে পুলিশ এনে এবং নিজেরাও দালালদের ধাওয়া করেছি। পুলিশ তো আর সব সময় থাকে না, পুলিশ বের হয়ে গেলে দালালদের উৎপাত আরও বেড়ে যায়। এতো অভিযান পরিচালনা করেও কোনো সুরাহা পাচ্ছি না। দালাল নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন। আশেপাশে অনেক ক্লিনিক রয়েছে, এসব ক্লিনিকের লোকজন জড়িত।

রায়পুরা, পলাশ, শিবপুর, মনোহরদী ও বেলাব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা সেবা পাচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসনে রোগীদের জেলা কিংবা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বলেন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তারার কয়েক ঘণ্টা বসে থেকে নামমাত্র রোগী দেখে তারা প্রাইভেট ক্লিনিকে বসেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ ব্যাপারে নরসিংদীর ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. ফারহানা আহমেদ বলেন, আমি যদিও ভারপ্রাপ্ত, তারপরও যতটুকু জেনেছি, আগের সিভিল সার্জন স্যার হাসপাতালগুলো দালালমুক্ত করতে ধাপে ধাপে পুলিশের সহযোগিতায় অভিযান পরিচালনা করেছে। দালালরা টিকিট কেটে রোগী সেজে হাসপাতালে থাকে, যার কারণে তাদের চেনা খুবই মশকিল। তবে আমরা পুলিশের সহায়তা প্ল্যান করে কীভাবে দালালদের আইনের আওতায় আনা যায় ও হাসপাতালগুলো দালালমুক্ত করা যায় সে ব্যাপারে আগাচ্ছি। আমাদের কাছে ম্যাজেস্ট্রেসি পাওয়ার নেই। আমি সিভিল সার্জন হিসেবে কাউকে এরেস্ট করতে পারব না। আমাদের তখন টিম নিয়ে এরেঞ্জ করে যেতে হয়। এ জন্য আপনাদের সহযোগিতার প্রয়োজন। আপনাদের সহযোগিতা পেলে আমরা খুব দ্রুতই হাসপাতালগুলো দালালমুক্ত করতে পারব।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাকসু নির্বাচনে সাইবার বুলিংরোধে ৫ সদস্যের কমিটি

১৮ মামলার আসামিকে কুপিয়ে হত্যা

নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণায় শঙ্কা দূর হয়েছে : যুবদল নেতা আমিন

আহত নুরের খোঁজ নিলেন খালেদা জিয়া

বাংলাদেশ পুনর্নির্মাণে ৩১ দফার বিকল্প নেই : লায়ন ফারুক 

চবির নারী শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ, উত্তপ্ত ক্যাম্পাস

অবশেষে জয়ের দেখা পেল ম্যানইউ

আ.লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে সাংবাদিককে লাঞ্ছিতের অভিযোগ

আসিফের ঝড়ো ইনিংসও পাকিস্তানের জয় থামাতে পারল না

খুলনায় জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে হামলা, আহত ১৫

১০

বাবা-মেয়ের আবেগঘন মুহূর্ত ভাইরাল, মুগ্ধ নেটিজেনরা

১১

ডাচদের বিপক্ষে জয়ে যে রেকর্ড গড়ল লিটনরা

১২

সাকিবের রেকর্ডে ভাগ বসালেন লিটন

১৩

বিএনপিপন্থি ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের নতুন কমিটি নিয়ে নানা অভিযোগ

১৪

জয়ের কৃতিত্ব কাদের দিলেন লিটন?

১৫

চায়ের দোকানে আ.লীগ নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

১৬

ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতে যা বললেন তাসকিন

১৭

বগুড়ায় বিক্ষোভ মিছিল থেকে জাপা অফিসে ভাঙচুর

১৮

প্রতিটি জেলা থেকে ট্যালেন্ট হান্ট চালু করবে বিএনপি : আমিনুল হক 

১৯

ফুল হয়ে ফোটে খাদ্য-অর্থের অভাব মেটাচ্ছে শাপলা

২০
X