হরিরামপুর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৪, ০২:৫৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

পদ্মার ভাঙনে দ্বিখণ্ডিত হরিরামপুরের মূল ভূখণ্ড

পদ্মা তীরে ভাঙন। ছবি : কালবেলা
পদ্মা তীরে ভাঙন। ছবি : কালবেলা

পদ্মার ভাঙনে ভৌগোলিকভাবে দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে মানিকগঞ্জের পদ্মা অধ্যুষিত উপজেলা হরিরামপুরের মূল ভূখণ্ড।

জেলার ৭টি উপজেলার মধ্য সর্ববৃহৎ উপজেলা হরিরামপুর। ২৪৫ দশমিক ৪২ বর্গকিলোমিটার আয়তনে পদ্মা নদীবেষ্টিত ১৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ উপজেলা। যার ৯টি ইউনিয়নই পদ্মার ভাঙনকবলিত হয়ে হাজার হাজার মানুষ জমিজমাসহ ভিটেবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। নদীভাঙনের ফলে এ উপজেলার অনেক পরিবার জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ ঢাকার সাভার, ধামরাই ও গাজীপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করছেন।

এ ছাড়াও গত কয়েক বছরে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনেক স্থাপনাসহ হাজার বিঘা কৃষিজমিও।

জানা যায়, ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর থেকেই এ উপজেলায় প্রথম নদীভাঙনের সূচনা হয়। ধারাবাহিক ভাঙনের ফলে উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ৯টি ইউনিয়নই নদীভাঙনের কবলে পড়ে। এতে করে ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে সুতালড়ী, আজিমনগর ও লেছড়াগঞ্জ তিনটি ইউনিয়নই সত্তর দশকের মধ্যেই পুরোপুরি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

আশির দশকের শুরুর দিকে উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে বিলীন হয়ে যাওয়া তিনটি ইউনিয়নে চর জেগে ওঠে। পরবর্তীতে ১৯৮৩/৮৪ সালের দিকে জেগে ওঠা চরে মানুষজন নতুন করে বসবাস করতে শুরু করে। এরপর ৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় আবার ডুবে যায় জেগে ওঠা তিনটি ইউনিয়নের চর। মানুষজন চরাঞ্চল ছেড়ে আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পুনরায় ৯৮ সালের বন্যায় পরে আবারও চর জেগে ওঠে এবং মানুষজন স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।

বর্তমান তিনটি ইউনিয়নের চরাঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজারের অধিক মানুষের বসবাস। একই উপজেলায় বসবাস করলেও প্রায় ১০ কিলোমিটার নদী পথ দ্বিখণ্ডিত করে উপজেলার ভৌগোলিক মূল ভূখণ্ড। বর্তমান চরাঞ্চলের জনগণ নদী পাড়ি দিয়েই উপজেলা সদরসহ জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। এক্ষেত্রে তাদের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ইঞ্জিনচালিত ট্রলার। তবে দুর্গম এই চরাঞ্চলের উৎপাদিত কৃষিপণ্য উপজেলার খাদ্য চাহিদা মেটাতে ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলেও স্থানীয়রা জানান।

ভাঙনকবলিত বাকি ৬টি ইউনিয়নের মধ্যে কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের প্রায় ৭০ ভাগ, গোপীনাথপুর ইউনিয়নের প্রায় ৬০ ভাগ, রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের প্রায় ৬০ ভাগ, বয়ড়া ইউনিয়নের প্রায় ৭০ ভাগ, হারুকান্দি ইউনিয়নের প্রায় ৬০ ভাগ ও ধুলশুড়া ইউনিয়নের প্রায় ৭০ ভাগ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এসব এলাকার বাসিন্দারা এখনো পদ্মার আগ্রাসনের শঙ্কায় ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়েই বসবাস করছেন বলে জানান নদী তীরবর্তী এলাকায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।

উপজেলার কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের কোটকান্দি গ্রামের আশি বছর বয়সী শেখ সোহরাব জানান, আমার বাপ দাদার বাড়ি ছিল বড় বাহাদুরপুর। ১৯৪৯ সালের দুর্ভিক্ষের সময় নদীভাঙন শুরু হয়। এক বছরের মধ্যে আমাদের বসতবাড়িসহ জমিজমা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। ওই সময় আমাদের বসতভিটাসহ প্রায় ১৩ বিঘা জমি নদীতে চলে যায়। পরে আমার মামার বাড়ির ওয়ারিশসূত্রে এই গ্রামে বসবাস শুরু করি।

একই গ্রামের পঁচাত্তর বছর বয়সী মহিউদ্দিন সরদার বলেন, ‘আমাগো বাড়ি আছিল এই ইউনিয়নেরই কুমারকান্দি। আমার দাদার আমলে আমাগো বাড়ি পদ্মায় গেছে। বাবার কাছ থেকে হুনছি, ওই সময় আমাগো প্রায় ৭০ বিঘা জমি নদীতে নিয়া গেছে।’

রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বীরমুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল হোসেন জানান, ১৯৭১ সালের পর থেকেই আমার ইউনিয়নে ভাঙন দেখা দেয়। বর্তমান প্রায় ৬০ ভাগ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। পূর্বের কোনো সরকার নদী ভাঙনরোধে কাজ করেনি। আওয়ামী লীগ সরকার আসার পরেই এ উপজেলায় নদীভাঙন রোধে কাজ শুরু হয়। পর্যাপ্ত পরিমাণ জিও ব্যাগ ফেলে নদীর তীর রক্ষা কাজ করা হয়। তারপরেও প্রতি বছরই কিছু না কিছু ভাঙতেই থাকে। এ স্থায়ী বেড়িবাঁধটা জরুরি হয়ে পড়েছে।

মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, এ উপজেলার ভাঙনকবলিত এলাকায় রক্ষায় ২০১৬ সাল থেকে ২০২২ পর্যন্ত উপজেলার ধুলশুড়া থেকে কাঞ্চনপুরের কুশিয়ারচর পর্যন্ত নদীর তীর রক্ষায় অস্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণে ধাপে ধাপে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকার জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। এ ছাড়াও চরাঞ্চলে আজিমনগর, সুতালড়ী ও লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের চরাঞ্চল রক্ষায়ও প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে।

মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দীন জানান, হরিরামপুরের বেশিরভাগ এলাকায় জিওব্যাগ ফেলে নদীশাসনের কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অবশিষ্ট কাজের জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বরাবর বাজেটের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বাজেট অনুমোদন পেলেই আমরা বাকি এলাকায় কাজ শুরু করতে পারব। এ ছাড়াও বর্ষা মৌসুমে যখন যেখানে ভাঙন শুরু হয়, আমরা জানার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করি।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঘূর্ণিঝড় রিমালে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে নেই ঈদ আনন্দ

হাট ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের খোঁজ নিলেন মেয়র

রাতে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের আভাস, সতর্ক সংকেত

আগামী বিশ্বকাপের টিকিট কি পাবে পাকিস্তান-নিউজিল্যান্ড?

আমের কেজি ৩ লাখ টাকা, চাষ হচ্ছে বাংলাদেশে

সেন্টমার্টিন ইস্যু নিয়ে যা বললেন ফখরুল

পাখা ছাড়া ঘুমাতে পারে না জমিদার

ঈদ জামাতের জন্য প্রস্তুত শোলাকিয়া

বাজারের প্রধান আকর্ষণ কালো পাহাড়

ভাই হারালেন ডিপজল 

১০

সংবর্ধিত হলেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শুসেন চন্দ্র শীল

১১

সিলেটে পশুর হাটে কমছে না দাম, ক্রেতাদের অপেক্ষা

১২

জাতীয় ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করবেন রাষ্ট্রপতি

১৩

ধাওয়া দিয়ে মাঝ নদীতে লঞ্চ থামালেন ম্যাজিস্ট্রেট

১৪

গাজীপুরে মহাসড়কে যাত্রীদের ঢল, ভোগান্তি চরমে

১৫

সিলেটে ১১ ট্রাক চিনি জব্দ

১৬

কোপায় ব্রাজিলের খেলা দেখবেন না রোনালদিনহো

১৭

বসত ঘর থেকে হ্যাপি গোল্ড ও কিং ফিসার মদ উদ্ধার

১৮

মেয়াদ শেষেও বিমার টাকা দিচ্ছে না প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স!

১৯

কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির গরু

২০
X