ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার হত্যার ঘটনায় এবার জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েছেন ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র। মঙ্গলবার (১১ জুন) বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকা থেকে তাকে হেফাজতে নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।
আটকের কথা জানাজানি হওয়ার পর বুধবার (১২ জুন) সকালে ঝিনাইদহ শহরের পায়রা চত্বরে প্রতিবাদ জানিয়ে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে। অন্যদিকে মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর কালীগঞ্জে এমপি আনারের অনুসারীরা মিন্টুর আটকের ঘটনাকে সাধুবাদ জানিয়ে তার বিচার ও কঠিন শাস্তি দাবি করেছে। এদিকে বুধবার বেলা ১১টার দিকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের ব্যানারে জেলা সভাপতি শাহরিয়ার করিম রাসেলের সভাপতিত্বে এবং সম্পাদক রানা হামিদের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাসুদ আহম্মেদ সঞ্জু, ধর্মবিষয়ক সম্পাদক আনিসুর রহমান খোকা, কৃষি ও সমবায়বিষয়ক সম্পাদক অ্যাড. আব্দুল মালেক মিনা, ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক মামুন রহমান টোকন, জেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম, জেলা ছাত্র লীগের সাধারণ সম্পাদক আল ইমরান প্রমুখ। কে এই মিন্টু
মিন্টুর উত্থান নিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেই স্কুলজীবনে ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে আজ ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। এ সময়ে দীর্ঘ রাজনীতির পথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি। এরশাদ সরকারের আমলে ছাত্রনেতা হিসেবে, বিএনপির শাসন আমলে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা হিসেবে দলের পক্ষে মাঠে দেখা গিয়েছে তাকে। একটি সময় যখন ঝিনাইদহে আওয়ামী লীগের হাল ধরার কেউ ছিল না তখন স্বেচ্ছাসেবক লীগের ব্যানারে ঝিনাইদহ শহরে স্লোগানে স্লোগানে দলের জানান দিয়েছেন একক নেতৃত্বে। আজ সেই নেতা তারই দলের সংসদ সদস্য আনায়ারুল আজিম আনার হত্যা ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে ডিবির হাতে আটক হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবে সকলের কাছে প্রশ্ন, এমন একজন দাপুটে নেতা কীভাবে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেন?
সাইদুল করিম মিন্টু আটকের দিন ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা ছিল। কিন্তু তার বিষয়ে কোনো আলোচনায় হয়নি সভায়। নাম না প্রকাশের শর্তে অনেকের অভিমত, এখনই তার ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করা যাবে না। জেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদককে গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে কোনো সিদ্ধান্ত না পাওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাবে না।
সাইদুল করিম মিন্টুর বর্তমান অবস্থান
সাইদুল করিম ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার জোড়াদাহ ইউনিয়নের ভায়না গ্রামের বাসিন্দা। ওই এলাকার প্রয়াত রুহুল কুদ্দুস ও আঙ্গুরা বেগম দম্পতির সন্তান। জন্ম ১৯৬৪ সালের ২ জুন। বর্তমানে ঝিনাইদহ শহরের আরাপপুর ইন্দিরা সড়কের বাড়িতে স্ত্রী আর্মিজা শিরিন আক্তার ও দুই সন্তান ও এক পুত্রবধূকে নিয়ে তিনি বসবাস করেন। তার মালিকানায় ‘দৈনিক বীরজনতা’ নামে একটি পত্রিকা ঝিনাইদহ থেকে প্রকাশিত হয়। স্ত্রী আর্মিজা শিরিন আক্তার ওই পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক এবং সাইদুল করিম মিন্টু সেই পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি। মিন্টুর পিতা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি ১৯৭৩ সালে তার নিজ এলাকা হরিণাকুণ্ডুতে জাসদ গণ বাহিনীর হাতে খুন হন।
রাজনৈতিক জীবন
ছাত্রলীগের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবন শুরু সাইদুল করিম মিন্টুর। ১৯৭৮ সালে ঝিনাইদহ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এরপর ১৯৮৩ সালে জেলা ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালে নিজ যোগ্যতায় পূর্ণ সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৮৯ সালে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। ঝিনাইদহে দীর্ঘদিন দাপটের সঙ্গে ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছেন তিনি। এরপর ১৯৯৭ সালে ছাত্রলীগের সাবেক কর্মীদের নিয়ে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেন তিনি। ১৯৯৯-২০০০ সালে শ্রমিক লীগ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। এরপর ২০১৫ সালের ২৫ মার্চ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০২২ সালে দ্বিতীয় বারের মতো সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর আগে ২০১১ সালের ১৩ মার্চ ঝিনাইদহ পৌরসভা নির্বাচনে সাইদুল করিম মিন্টু মেয়র নির্বাচিত হন। পরে সীমানা জটিলতার মামলার কারণে আইনগত সমস্যায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় ২০২২ সাল পর্যন্ত টানা ১১ বছর তিনি ঝিনাইদহ পৌরসভার মেয়র পদে ছিলেন। এর বাইরে ১৯৯৮ সালে ছাত্র নেতা মোম হত্যাকাণ্ডে অন্যতম আসামি ছিলেন তিনি। ২০১৪ সালে বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গফফার হত্যা ঘটনায় ছিলেন সন্দেহভাজন। তিনি ওই হত্যাকাণ্ডের মদদদাতা এমন অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে।
ঝিনাইদহ সিআইডি সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালে ঝিনাইদহ শহরের মডার্ণ পাড়ায় সংঘটিত তরিকুল হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ২ আসামি তাদের স্বীকারোক্তিতে ইন্ধনদাতা হিসেবে সাইদুল করিম মিন্টুর নাম উল্লেখ করেছিল। অন্যদিকে মোম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাক্ষীদের বয়ানের ফোকর গলে ওই মামলার আসামিরা খালাস পায়। এ ছাড়া শ্রমিক নেতা গফফার হত্যা ঘটনায় নিহত গফফরের স্ত্রী সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে সরাসরি সাইদুল করিম মিন্টুকে হত্যাকারী হিসেবে বক্তব্য দেন।
এদিকে আনোয়ারুল আজীম হত্যাকাণ্ডে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু আটক হওয়ার পর ঝিনাইদহ জেলা শহরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেল থেকেই শহরের পায়রা চত্বর, পোস্ট অফিস মোড়, মুজিব চত্বরসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও টহল জোরদার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার আজিম উল আহসান কালবেলাকে বলেন, ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার হত্যার মামলাটি ঢাকার ডিবি পুলিশ তদন্ত করছে। এ ছাড়া সাইদুল করিম মিন্টুকেও ঢাকা থেকে আটক করা হয়েছে। তাই যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা শহরে বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সেই সঙ্গে পুলিশের টহলও বাড়ানো হয়েছে।
মন্তব্য করুন