কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৪:২২ পিএম
আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৪:২৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

‘মা আস্থা রাখো’ বলে ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন ভণ্ড দরবেশ

সমস্যা সমাধানের কথা বলে ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন ভণ্ড দরবেশ। ছবি : কালবেলা
সমস্যা সমাধানের কথা বলে ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন ভণ্ড দরবেশ। ছবি : কালবেলা

বিগত ২০২৩ সালে আমেনা খান নামে এক চিকিৎসকের পরিচয় হয় ভণ্ড এক দরবেশের সঙ্গে। পারিবারিক সমস্যায় থাকা ওই চিকিৎসক সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে দারস্থ হন ভণ্ড এক দরবেশের কাছে। পারিবারিক সমস্যা সমাধানের কথা বলে ভুক্তভোগী নারীর কাছ থেকে হাতিয়ে নেন ২৫ লাখ টাকা।

প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে গত ৭ নভেম্বর রাজধানীর খিলগাঁও থানায় একটি মামলা দায়ের করেন ওই ভুক্তভোগী নারী। মামলার সূত্র ধরে এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তদন্তের এক পর্যায়ে গতকাল চক্রের মূলহোতা আশিকুর রহমানকে মাগুরা জেলা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কেরানীগঞ্জ থেকে এই চক্রের আরও ১৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সোমবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর মালিবাগে অবস্থিত সিআইডির সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ আলী মিয়া।

মোহাম্মদ আলী মিয়া বলেন, দরবেশ বাবা পরিচয়দানকারী এই চক্রের ১৯ জন সদস্যকে মাগুরা জেলা ও ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে পৃথক অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে বাসা ভাড়া নিয়ে অবস্থান করে প্রতারণা করে আসছিল। এই চক্রের সদস্যরা মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে ২টি ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে। প্রতারকরা দৈবচয়নের মাধ্যমে বা ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত অথবা অর্থ সম্পদশালী ব্যক্তিদের দারোয়ান বা ড্রাইভারের সঙ্গে সম্পর্ক করে প্রথমে। পরে ড্রাইভার ও দারোয়ানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিবারের গোপন তথ্য সংগ্রহ করে। এ সময় তারা পারিবারিক সমস্যাগুলো কৌশলে জেনে নিয়ে একই বাড়ির মালিক ও স্ত্রীর নম্বর সংগ্রহ করে। তারপর শুরু করে প্রতারণার খেলা। স্ত্রীর কাছে স্বামীর বদনাম এবং স্বামীর কাছে স্ত্রীর বদনাম বলে কান ভারী করে। তখন উভয়ের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয় এবং প্রত্যেকে তাদের সমস্যা নিরসনের জন্য পথ খুঁজতে থাকে। এই সুযোগে প্রতারকরা মসজিদে নববীর ইমামের নাম প্রয়োগ করে প্রতারণা করতে থাকে।

তিনি বলেন, চক্রটির দ্বিতীয় কৌশল হলো গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চমকপ্রদ ও চোখ ঝলসানো বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রলুব্ধ করা হয়। লটারি পাইয়ে দেওয়া, ভাগ্য-বদল, পাওনা টাকা আদায়, মামলায় জেতানো, পারিবারিক সমস্যা সমাধানের কথা বলা হয় তাদের বিজ্ঞাপনে। আধ্যাত্মিক ও তান্ত্রিক ক্ষমতা বলে বিপদগ্রস্ত মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারবে এমন বিজ্ঞাপন দিত চক্রটি। এসব বিজ্ঞাপন দেখে কোনো ভুক্তভোগী তাদের ফোন দিলে শুরু হয় প্রতারণা। নানা কৌশলে চক্রটি লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিত।

সিআইডিপ্রধান বলেন, এভাবেই চক্রটি পারিবারিক সমস্যা সমাধান করে দেওয়ার কথা বলে এক নারী ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ‘দরবেশ বাবা’ পরিচয়ে কয়েক ধাপে তার কাছ থেকে এই টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

খিলগাঁও থানায় দায়ের করা একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে এই চক্রের সন্ধান পায় সিআইডি। ভুক্তভোগী ওই নারী পারিবারিক সমস্যা থাকায় মুক্তির পথ খুঁজছিলেন। এ অবস্থায় ফেসবুকে একটি বিজ্ঞাপন দেখে তার চোখ আটকে যায়। বিজ্ঞাপনে একজন সুদর্শন ব্যক্তি দরবেশ বেশধারী নিজেকে সৌদি আরবের মসজিদে নববীর ইমাম পরিচয় দিয়ে বলছেন, তিনি কোরআন হাদিসের আলোকে মানুষের সমস্যা সমাধানে কাজ করেন। বিজ্ঞাপনটি মন কাড়ে ওই নারী চিকিৎসকের। পরবর্তীতে বিজ্ঞাপনে দেওয়া মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করেন তিনি। অপরপ্রান্তে থাকা দরবেশ বাবা বেশধারী ব্যক্তি সুন্দরভাবে কথা বলে তার পারিবারিক সমস্যা শুনতে চান। ভুক্তভোগী চিকিৎসক তার পরিবারের সমস্যার কথা তুলে ধরেন কথিত দরবেশ বাবার কাছে। সমস্যার কথা শুনে দরবেশ তাকে বলেন, ‘মা তোমার সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। বাবার ওপর আস্থা রাখো। তোমাকে মা বলে ডাকলাম। আজ থেকে তুমি আমার মেয়ে। তবে কিছু খরচ লাগবে। খরচের কথা কাউকে জানানো যাবে না। জানালে সমস্যার সমাধান তো হবেই না, বরং সমস্যা আরও বাড়বে এবং তোমার ছেলে-মেয়ে ও স্বামীর ক্ষতি হবে।’ নারী চিকিৎসক ভণ্ড দরবেশের কথায় তার ভক্ত হয়ে যান। এরপর থেকে বিভিন্ন ধাপে বিভিন্ন সময়ে অলৌকিক সমস্যার কথা বলে প্রলোভন ও ভয়-ভীতির মাধ্যমে মোট ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় এই প্রতারক চক্র।

পরবর্তীতে এমএফএস নম্বরের সূত্র ধরে মাগুরা জেলা থেকে আশিকুর রহমান নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। সে এই চক্রের মূলহোতা। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এই চক্রের বিভিন্ন টেকনিক্যাল সাপোর্ট, বেনামে রেজিস্ট্রেশন করা সিম এবং ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেওয়ার কাজ করে সে। পরবর্তীতে আশিকুরের দেওয়া তথ্যমতে ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে কথিত দরবেশ পরিচয়দানকারী ১৮ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি।

গ্রেপ্তাররা জিজ্ঞাসাবাদে ২০২০-২১ সাল থেকে তারা এই প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। প্রথম দিকে তারা বিভিন্ন পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিত। পরবর্তীতে তারা পত্রিকা এবং বিভিন্ন চ্যানেলের পাশাপাশি ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণার বিজ্ঞাপন দিতে থাকে। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ তাদের দেওয়া মোবাইল নম্বরে ফোন দিলে সমস্যা সমাধানের নামে ভয়-ভীতি ও নানা প্রলোভন দেখিয়ে এমএফএস নম্বরে টাকা হাতিয়ে নিত চক্রটি। গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে প্রতারণার সাথে জড়িত ৪১টি মোবাইল, বিপুলসংখ্যক সিমকার্ড ও ডিজিটাল আলামত উদ্ধার করা হয়।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

২০২৫ সালে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক মাইলফলক অর্জন করল কমিউনিটি ব্যাংক

ভিসা নিয়ে বাংলাদেশকে বড় দুঃসংবাদ দিল অস্ট্রেলিয়া

কর্মস্থলে মোটরসাইকেল বহর নিয়ে এসে তোপের মুখে প প কর্মকর্তা

আলোচনায় বসতে চায় ইরান, বললেন ট্রাম্প

বিএনপিতে যোগ দিলেন এলডিপির কয়েকশ নেতাকর্মী

ককটেল ফাটিয়ে বাংলাদেশি কৃষককে ধরে নেওয়ার চেষ্টা বিএসএফের

পার্থর আসন থেকে সরে দাঁড়ালেন বিএনপির প্রার্থী 

মনোনয়নপত্র জমার সুযোগ পেয়ে যা বললেন হিরো আলম

কখন ডিম খেলে বেশি উপকার পাওয়া যায়, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

অটোরিকশাচালককে কুপিয়ে হত্যা

১০

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট হলেন রুয়েট উপাচার্য

১১

সেরা নির্বাচন উপহার দিতে পুলিশ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ : ডিআইজি রেজাউল

১২

আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ বৃদ্ধার মৃত্যু

১৩

বিমান দুর্ঘটনায় জনপ্রিয় সংগীতশিল্পীসহ ছয়জন নিহত

১৪

প্রার্থিতা ফিরে পেয়ে কাঁদলেন ১ স্বতন্ত্র প্রার্থী

১৫

সরকারি বিভিন্ন উন্নয়নকাজে এমপি রাখেন ৫০ ভাগ : রুমিন ফারহানা

১৬

খুলনায় সিআইডি অফিসে আগুন, পরে এসি বিস্ফোরণ

১৭

১৫ দিন পর দাদির জিম্মায় ঘরে ফিরল শিশু আয়েশা

১৮

সিভাসুর নতুন ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. নূরুল হক

১৯

সুরকন্যা আহমাদ মায়ার পিএইচডি ডিগ্রি লাভ 

২০
X