ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) মাস্টারদা সূর্যসেন হলের ক্যান্টিনে খাওয়ার পর পাওনা টাকা চাওয়ায় ক্যান্টিন মালিককে মারধর করে দাড়ি ছিঁড়ে ফেলা সেই ছাত্রলীগ নেতা আরাফাত হোসেন অভিকে এবার বহিষ্কার করেছে হল প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) মাস্টারদা সূর্যসেন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন ভূইয়া স্বাক্ষরিত এক বিবৃতির মাধ্যমে এই বহিষ্কারাদেশ জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘এতদ্বারা আপনার অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখে আনুমানিক দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে আপনি ক্যান্টিনে গিয়ে দুপুরের খাবার নিয়ে চলে যাওয়ার সময় বাকি খাতায় লিখে রাখতে বলেন। এ সময় ক্যান্টিনের ক্যাটারার জন্য মো. ফাহিম আপনার নিকট পূর্বের বাকি ২ হাজার ৬৫০ টাকা চাওয়ায় আপনি পরে পরিশোধ করবেন বলে জানান। ক্যান্টিনের ক্যাটারার তার ম্যানেজারকে বলে পরবর্তীতে আপনাকে আর বাকি খাবার না দিতে। এতে আপনি মেজাজ হারিয়ে ফাহিমের কলার চেপে ধরে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন এবং চর-থাপ্পড় দেন। একপর্যায়ে, আপনি ফাহিমের শার্টের কলার এবং দাড়ি ছিঁড়ে ফেলেন। ছাত্ররা আপনাদের দুজনকে আলাদা করে দিলে আপনি পরবর্তীতে ফাহিমকে ডেকে নিয়ে শাসান এবং এই ঘটনা নিয়ে কোনোরূপ বাড়াবাড়ি না করতে বলেন।’
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘উপরোক্ত ঘটনায় ক্যান্টিন ক্যাটারারের লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রদত্ত রিপোর্টে ও সকল সাক্ষ্য-প্রমাণ, সিসিটিভি ফুটেজ থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদির ভিত্তিতে আপনি দোষী হিসেবে প্রমাণিত। এ ছাড়া গত ২০২১ সালের বিএ (সম্মান) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ায় এবং এমএ শ্রেণিতে ভর্তি না হওয়ায় বর্তমানে আপনার ছাত্রত্বও নেই, তথাপি আপনি হলে অবৈধভাবে অবস্থান করছেন।’
অতি দ্রুত হল ত্যাগের নির্দেশ প্রদান করে এতে বলা হয়, ‘এ ধরনের ঘটনা ঘটানো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি লঙ্ঘন, মর্যাদা ও আইনের পরিপন্থি। উল্লিখিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আপনার (বিশেষ দ্বৈতাবাসিক কক্ষ নং- ১৭৯) বরাদ্দকৃত সিট বাতিলসহ আগামী ২৩-০২-২০২৪ তারিখের মধ্যে আপনাকে হল ত্যাগের নির্দেশ প্রদান করা হলো। ভবিষ্যতে আপনাকে হলে অবস্থান করতে দেখা গেলে আপনার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
এর আগে গত ১২ ফেব্রুয়ারি দুপুরে হলের ক্যান্টিনে খাওয়ার পর ক্যান্টিন মালিক মো. ফাহিম হোসাইন (৩৫) এদিনের খাবার বিলসহ পূর্বের বকেয়া বিল (২৬৫০ টাকা) চাইলে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী এবং এই ছাত্রলীগ নেতা তার (ক্যান্টিন মালিক) এবং ক্যান্টিন ম্যানেজারের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে বেধড়ক মারধর করেন। এ সময় ক্যান্টিন মালিকের মুখ থেকে এক মুষ্টি দাড়ি ও পরনের শার্ট-গেঞ্জি ছিঁড়ে ফেলেন। এরপর ভুক্তভোগী ফাহিম হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন ভূঁইয়া বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিলে তা আমলে নিয়ে তিনি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানান।
অভিযোগপত্রে ভুক্তভোগী ফাহিম উল্লেখ করেছিলেন, ‘দুপুরে ক্যান্টিন চলাবস্থায় আমি ক্যাশে বসা ছিলাম। এমন সময় মো. আরাফাত হোসেন অভি এসে আমার কাছে খাবার চায়, আমি খাবার দিলাম এবং আগের বাকি টাকা ২ হাজার ৬৫০ টাকা তার কাছে চাওয়াতে তিনি আমার উপরে উত্ত্যক্ত হয়ে অতর্কিত হামলা করে বসে। এ সময়ে তিনি আমার গায়ে হাত তুলে এবং আমাকেসহ আমার ম্যানেজারকে দুই দফা মারধর করে। এ সময়ে তিনি আমার দাড়ি, শার্ট, লুঙ্গি, গেঞ্জি টেনে ছিঁড়ে ফেলে। আমি নিরুপায় হয়ে ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে যাই এবং হলের ছাত্রদের কাছে আশ্রয় নেই।
অভিযোগের বিষয়ে আরাফাত হোসাইন অভি ঘটনার দিন বলেছিলেন, আমি দুপুরে খাবার খেতে গেলে ক্যান্টিন মালিক বকেয়া টাকা চাইলে আমি বললাম আমার বিকাশে সমস্যা টাকা তুলতে পারছি না। আমি প্রমাণও দেখাইলাম। পরে আমি সেখান থেকে বের হওয়ার সময় তিনি ম্যানেজারকে বললেন আমাকে যেন নেক্সট টাইম খাবার না দেয়। এটা শুনে আমি ক্যান্টিন মালিককে বললাম আপনি এটা কেমন কথা বললেন, সমস্যা তো থাকতে পারে। এরপর হঠাৎ করে তিনি আমাকে ধাক্কা মারেন, আমিও তার কলার টেনে ধরি। তারপর ধাক্কাধাক্কির মধ্যে তার দাঁড়িতে আমার হাত লেগে ছিঁড়ে যায়। তিনি আমাকে প্রথম ধাক্কা দেয়। আমি কোনো মারধর করিনি।
উল্লেখ্য, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির শয়ন ও সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত স্বাক্ষরিত এক বিবৃতির মাধ্যমে সূর্যসেন হল শাখার সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়।
মন্তব্য করুন