

খাবারসংক্রান্ত মানসিক রোগ মানে শুধু কম বা বেশি খাওয়া নয়। এসব সমস্যার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শরীরের ওজন, খাবার এবং নিজের চেহারা নিয়ে অতিরিক্ত ভয়, লজ্জা ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা।
অনেক সময় বাইরে থেকে বিষয়টি বোঝা যায় না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে এটি মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব রোগ থেকে সেরে উঠতে চিকিৎসক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা প্রয়োজন হয়।
নিচে খাবারসংক্রান্ত ছয়টি পরিচিত মানসিক রোগ এবং তাদের সাধারণ লক্ষণ তুলে ধরা হলো।
এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা ইচ্ছাকৃতভাবে খুব কম খান বা খাবার এড়িয়ে চলেন। তাদের মধ্যে ওজন বেড়ে যাওয়ার তীব্র ভয় থাকে এবং নিজের শরীরকে তারা বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি মোটা মনে করেন।
অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তি খুব কম ওজনের না হলেও শরীরের ওজন দ্রুত কমে যেতে পারে। একে অ্যাটিপিক্যাল অ্যানোরেক্সিয়া বলা হয়।
অ্যানোরেক্সিয়ার এক ধরনের ক্ষেত্রে ব্যক্তি শুধু কম খাওয়া, উপবাস বা অতিরিক্ত ব্যায়ামের মাধ্যমে ওজন কমান। আরেক ধরনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খাওয়ার পর বমি করা, জোলাপ বা প্রস্রাব বাড়ানোর ওষুধ ব্যবহার কিংবা অতিরিক্ত ব্যায়ামের মাধ্যমে খাবার শরীর থেকে বের করার চেষ্টা করা হয়।
দীর্ঘদিন এই সমস্যায় ভুগলে চুল ও নখ ভেঙে যাওয়া, হাড় দুর্বল হওয়া, হরমোনের সমস্যা, সন্তান ধারণে জটিলতা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে হৃদযন্ত্রের সমস্যা থেকে মৃত্যুঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
বুলিমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা অল্প সময়ের মধ্যে অনেক খাবার খান এবং তখন মনে করেন, খাওয়ার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। এরপর ওজন বাড়ার ভয় থেকে বমি করা, উপবাস থাকা, জোলাপ বা প্রস্রাব বাড়ানোর ওষুধ ব্যবহার কিংবা অতিরিক্ত ব্যায়াম করেন।
এর ফলে গলা ব্যথা, দাঁতের ক্ষয়, লালাগ্রন্থি ফুলে যাওয়া, অ্যাসিডিটি, পানিশূন্যতা এবং শরীরে লবণের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। গুরুতর অবস্থায় হৃদযন্ত্রের সমস্যা বা স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ে।
এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা ক্ষুধা না থাকলেও খুব দ্রুত ও অনেক খাবার খান, অনেক সময় গোপনে। খাবার খাওয়ার পর তারা লজ্জা, অপরাধবোধ বা নিজের ওপর বিরক্তি অনুভব করেন।
বুলিমিয়ার সঙ্গে মিল থাকলেও এখানে খাবার খাওয়ার পর বমি বা অতিরিক্ত ব্যায়ামের মতো আচরণ দেখা যায় না। এই সমস্যায় অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে, যা ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়।
পাইকা রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা খাবার নয় এমন জিনিস খেতে চান। যেমন মাটি, চুন, কাগজ, চুল, সাবান বা বরফ।
যদি এই আচরণ সংস্কৃতি বা ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ না হয়, তখন একে রোগ হিসেবে ধরা হয়। এটি বুদ্ধিবিকাশজনিত সমস্যা, অটিজম বা গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এর ফলে বিষক্রিয়া, সংক্রমণ, পেটের ক্ষত এবং অপুষ্টির ঝুঁকি থাকে।
এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি খাবার খাওয়ার কিছু সময় পর তা আবার মুখে তুলে চিবিয়ে গিলে ফেলেন বা ফেলে দেন। সাধারণত খাবার খাওয়ার আধা ঘণ্টার মধ্যেই এটি ঘটে।
শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক সময় এই সমস্যা নিজে থেকেই কমে যায়। তবে চিকিৎসা না হলে ওজন কমে যাওয়া ও অপুষ্টি দেখা দিতে পারে। বড়দের ক্ষেত্রে মানসিক থেরাপির মাধ্যমে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের খাবারের প্রতি আগ্রহ কম থাকে বা নির্দিষ্ট গন্ধ, স্বাদ, রং কিংবা খাবারের গঠনের প্রতি তীব্র বিরক্তি থাকে। ফলে তারা প্রয়োজনীয় ক্যালরি ও পুষ্টি পান না।
এর কারণে ওজন কমে যাওয়া, বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক বৃদ্ধি না হওয়া এবং সামাজিকভাবে অন্যদের সঙ্গে খেতে অস্বস্তি তৈরি হয়। এটি সাধারণ খুঁতখুঁতে খাওয়ার অভ্যাসের চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর।
এ ছাড়া আরও কিছু কম পরিচিত সমস্যা রয়েছে। যেমন পার্জিং ডিসঅর্ডার, যেখানে অতিরিক্ত না খেলেও ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য বমি বা জোলাপ ব্যবহার করা হয়। নাইট ইটিং সিনড্রোমে মানুষ রাতে ঘুম থেকে উঠে খাবার খান। আবার ওএসএফইডি নামে একটি শ্রেণিতে এমন সমস্যাগুলো রাখা হয়, যেগুলো নির্দিষ্ট কোনো রোগের পুরো মানদণ্ডে পড়ে না।
বর্তমানে অর্থোরেক্সিয়া নিয়েও আলোচনা বাড়ছে। এতে মানুষ অতিরিক্ত স্বাস্থ্যকর খাবার নিয়ে এতটাই চিন্তিত হয়ে পড়ে যে, স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়। এটি এখনো আলাদা রোগ হিসেবে স্বীকৃত না হলেও এতে অপুষ্টি ও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে।
খাবারসংক্রান্ত মানসিক রোগগুলো শুধু খাওয়ার অভ্যাসের বিষয় নয়। এগুলো গভীর মানসিক ও শারীরিক সমস্যার সঙ্গে জড়িত। কারও মধ্যে এসব লক্ষণ দেখা গেলে লজ্জা বা ভয় না পেয়ে দ্রুত চিকিৎসকের সহায়তা নেওয়া জরুরি।
সময়মতো চিকিৎসা, পরিবার ও সমাজের সমর্থন পেলে এসব সমস্যা থেকে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সম্ভব।
সূত্র : হেলথলাইন
মন্তব্য করুন