বায়ুদূষণ রোধে সরকার বিভিন্ন সময় নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তা রোধ করা সম্ভব হয়নি। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য এখনই বায়ু দূষণ রোধে কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তন আরও বেড়ে যাবে। আর এ থেকে মুক্তি পেতে বায়ুমান উন্নয়নে স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘ মেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করার জানিয়েছে বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) নামের একটি সংগঠন।
বৃহস্পতিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ঢাকার কারওয়ানবাজার ডেইলি স্টার ভবনে আয়োজিত ‘নির্মল বায়ু নিশ্চিত করণ : প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ বিষয়টি জানানো হয়েছে। ক্যাপস ও ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে আলোচনা সভাটি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ বিষয়ে বক্তারা বলেন, যে কোনো নির্মাণকাজ চলাকালে নির্মাণাধীন স্থান ঘিরে রাখতে হবে। এ ছাড়া নির্মাণসামগ্রী পরিবহনের সময় ভালো ভাবে ঢেকে নিতে হবে। শুষ্ক মৌসুমে সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, ওয়াসা এবং পরিবেশ অধিদপ্তরকে সমন্বয় করে দূষিত শহরগুলোতে দিনে দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর পর পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
রাস্তার ধুলাবালি সাকশন ট্রাক ব্যবহার করে সংগ্রহ করা যেতে পারে। অবৈধ ইটভাটাগুলো বন্ধ করে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিকল্প ইটের প্রচলন বাড়াতে হবে। এ ছাড়া ব্যক্তিগত এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি নিয়ন্ত্রণে জোড়-বিজোড় নম্বর প্লেট অনুযায়ী গাড়ি চলাচলের প্রচলন করা যেতে পারে।
মধ্যমেয়াদি পদক্ষেপের বিষয়ে বক্তারা বলেন, সরকারি-বেসরকারি উভয় উদ্যোগে প্রচুর পরিমাণ গাছ লাগাতে হবে। শহর এলাকায় ছাদ বাগান গড়ে তুলতে সকলকে উৎসাহিত করতে হবে। দূষিত শহরগুলোর আশপাশে জলাধার সংরক্ষণ করতে হবে। সাইকেল চলাচলের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করতে হবে। আগুনে পোড়ানো ইটের পরিবর্তে সেন্ড বক্সের ব্যবহার বাড়াতে হবে। সিটি গভর্নেন্সের প্রচলনের মাধ্যমে উন্নয়নমূলক কার্যকলাপের সমন্বয় সাধন করতে হবে।
তৃতীয় ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের বিষয়ে বক্তারা বলেন, অবশ্যই নির্মল বায়ু আইন-২০১৯ প্রণয়ন করতে হবে। পরিবেশ সংরক্ষণ ও সচেতনতা তৈরির জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক বাজেটের বরাদ্দ আরও বৃদ্ধি করতে হবে। নিয়মিত বায়ু পর্যবেক্ষণ স্টেশন (ক্যামস)-এর ব্যাপ্তি বাড়াতে হবে। সমগ্র ঢাকা শহরকে এর আওতায় আনতে হবে। এ ছাড়াও বায়ু দূষণের পূর্বাভাস দেওয়ার প্রচলন করতে হবে। পরিবেশ ক্যাডার সার্ভিস এবং পরিবেশ আদালত যতদ্রুত সম্ভব চালু ও কার্যকর করতে হবে।
সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘এটা নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে অনেক কাজ করার আছে। শুধু পরিবেশ অধিদপ্তর এককভাবে এ কাজ করতে পারবে না। উন্নয়নের সংজ্ঞার বিষয়ে আমরা যেভাবে সবাই একমত হই। তেমনি বায়ু দূষণ রোধে আমাদের সবার একমত হয়ে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। ২০৪১ সালে আমাদের যে ভিশন আছে, উন্নয়নের ভিশন সেটার সঙ্গে এই বায়ু দূষণ রোধটাকেও রাখতে হবে। বায়ু দূষণ কেন্দ্রিক আমাদের অনেক কাজ বাকি এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। তবে আমাদের এই বায়ু দূষণকে রোধ করতে হবে এজন্য যা যা করণীয় সমস্ত কিছুই যথাযথভাবে আমাদের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’
পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক(ডিজি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ‘বিদ্যুতে আমরা সবাই উপকারভোগী অথচ বায়ু দূষণের কথা এলেই কেন যেন সবাই বিদ্যুৎকে সবার আগে দোষারোপ করছি। আমরা এখন রিনয়েবল এনার্জিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। কয়লাভিত্তিক অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে কাজ করছি। বায়ু দূষণ রোধে প্রকৃতপক্ষে আমাদের নবায়নযোগ্য শক্তির বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।’
ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশের (আইএবি) ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী নকীর সভাপতিত্বে এবং বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী, ক্লাইমেট পার্লামেন্ট বাংলাদেশের সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, ক্লাইমেট পার্লামেন্ট বাংলাদেশের সদস্য আহসান আদেলুর রহমান আদেল, অর্থ মন্ত্রণালয়বিষয়ক সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য রানা মোহাম্মদ সোহেল, সুইডেন দূতাবাস বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগের ফাস্ট সেক্রেটারি ড্যানিয়েল নোভাক, পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ফজলে রেজা সুমন প্রমুখ।
মন্তব্য করুন