

একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা ধার করে অন্য একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে যেই কেন্দ্রটি চালানো হবে, সেই কেন্দ্রের জন্য দরপত্রের মাধ্যমে সরবরাহকারী নির্ধারিত হলেও অজানা কারণে বিদ্যুৎ বিভাগ এখনো সরবরাহকারী চূড়ান্ত করেনি।
এদিকে, কেন্দ্রটি চালু রাখতে হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। পিডিবি জানিয়েছে, আসন্ন রমজানে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে সব কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র চালানো হবে, যাতে খরচ কিছুটা কমে আসে। এ জন্য কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। কেন্দ্র চালানো না গেলে লোডশেডিং করতে হবে।
যে কেন্দ্রটি চালানোর জন্য কয়লা ধার করতে চাওয়া হচ্ছে, সেটি হলো পটুয়াখালীতে অবস্থিত আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেডের মালিকানাধীন ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। কয়লা ধার করা হবে কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিপিজিসিবিএল) মাতারবাড়ী ১৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে। পরে কয়লার মূল্য পরিশোধ করবে আরপিসিএল।
সম্প্রতি আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এইচ এম রাশেদ বিদ্যুৎ সচিবকে বিষয়টি জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন। চিঠির একটি অনুলিপি পাঠানো হয়েছে পিডিবি চেয়ারম্যানের কাছেও।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে পিডিবি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, ‘ধার করা কয়লা দিয়ে একটি কেন্দ্র চালানোর বিষয়ে আমরা সম্মতি দিইনি। তবে বলেছি, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র চালু রাখতে হবে। নিজেদের কয়লা নিজেদের ব্যবস্থা করতে হবে।’
কেন এখনো সরবরাহকারী চূড়ান্ত করা হয়নি—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ইয়াংথাই দরপত্র ডাকার পর একমাত্র বিডার হয়। পরে বিদ্যুৎ বিভাগ পুনরায় দরপত্র আহ্বান করে। বিষয়টি নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ কাজ করছে।’
গত ২৫ নভেম্বর বিদ্যুৎ সচিবের কাছে পাঠানো চিঠিতে আরপিসিএল-নরিনকো জানিয়েছে, বর্তমানে তাদের পটুয়াখালী কেন্দ্রটিতে যতটুকু কয়লা আছে, তা দিয়ে চলতি মাস পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। এরপর আর কয়লা থাকবে না। এ অবস্থায় কেন্দ্র চালু রাখার জন্য চিঠিতে তিনটি বিকল্প তুলে ধরা হয়—
প্রথম বিকল্পে বলা হয়েছে, স্বল্প সময়ের মধ্যে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির (ডিপিএম) মাধ্যমে আরপিসিএল সরাসরি খনি থেকে কয়লা সংগ্রহ করতে পারে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কয়লার স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী পিডিবি ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার সম্ভাব্য কয়লাখনির একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রণয়ন করা যেতে পারে। এ লক্ষ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ, পিডিবি ও আরপিসিএলের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে খনি পরিদর্শন, মূল্য আলোচনা ও চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে এ প্রক্রিয়ায় তুলনামূলক সাশ্রয়ী হলেও সময় বেশি লাগবে।
দ্বিতীয় বিকল্পে বলা হয়েছে, সিপিজিসিবিএলের মাতারবাড়ী কেন্দ্র ইন্দোনেশিয়ার পিটি বুকিত আসম টিবিকে (PT Bukit Asam Tbk) থেকে কয়লা আমদানি করে। বর্তমানে এ কেন্দ্র পূর্ণ ক্ষমতায় চালু না থাকায় মজুত কয়লা কম ব্যবহার হচ্ছে এবং জানা গেছে, মজুত প্রায় ২ লাখ টনের বেশি। এ পরিস্থিতিতে আরপিসিএল সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সম্মতিক্রমে সিপিজিসিবিএল থেকে সাময়িকভাবে কিছু কয়লা ধার নিতে পারে, যার মূল্য পরবর্তী সময়ে পরিশোধ করা হবে।
তৃতীয় বিকল্পে বলা হয়েছে, সীমিত দরপত্র পদ্ধতি (এলটিএম) অনুসরণ করে অস্থায়ী ভিত্তিতে কয়লা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে পিডিবি, বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে সম্ভাব্য কয়লাখনির তালিকা তৈরি করে দরপত্র আহ্বান ও প্রক্রিয়াকরণ করা যেতে পারে। তবে এটিতেও কিছু সময় প্রয়োজন হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিনটি বিকল্পের মধ্যে ধার করা কয়লা দিয়ে কেন্দ্র চালানো ছাড়া বর্তমানে আর কোনো বাস্তব বিকল্প নেই। কারণ, এ কেন্দ্রের জন্য কয়লা সরবরাহে চারবার দরপত্র আহ্বান করা হলেও প্রতিবারই সিঙ্গাপুরভিত্তিক ইয়াংথাই কাজ পেয়েছে। কিন্তু আরপিসিএলের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের স্বার্থরক্ষা না হওয়ায় প্রতিবারই টেন্ডার বাতিল করা হয়।
এ ধারাবাহিকতার ফলেই এখন বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর জন্য কয়লার প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এমনকি বর্তমান সরকার বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি ও অনিয়ম কমানোর কথা বললেও বাস্তবে অগ্রগতি খুবই কম।
জানা গেছে, আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেডের এই ১৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় ইউনিট ১ এপ্রিল জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। কেন্দ্রটির বাণিজ্যিক উৎপাদনের (সিওডি) লক্ষ্য নির্ধারিত রয়েছে ৩১ ডিসেম্বর।
বর্তমানে কয়লার মজুত এবং অবশিষ্ট আমদানিকৃত কয়লার পরিমাণ বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্রটির একটি ইউনিট ডিসেম্বর পর্যন্ত চালানো সম্ভব। তবে প্রথম ইউনিট পূর্ণ ক্ষমতায় চালু রাখা এবং দ্বিতীয় ইউনিটের সিওডি অর্জনের জন্য অতিরিক্ত কয়লার সরবরাহ জরুরি ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে।
মন্তব্য করুন