মানব নিরাপত্তা বা হিউম্যান সিকিউরিটির ব্যাপ্তি ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্র বা তারও পরিধির বাইরে বিস্তৃত। এ নিবন্ধে হিউম্যান সিকিউরিটির বিভিন্ন দিক এবং হিউম্যান সিকিউরিটির পরিস্থিতি সম্বন্ধে আলোকপাত করতে প্রয়াস পাবো।
মানবের বা মনুষ্যজীবনের অস্তিত্বের সবধরণের বিপদাপদই মানব নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই নিরাপত্তা হুমকি বা সিকিউরিটি থ্রেট কোথা হতে আসে? এর মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূমিকম্প, বন্যা, ঝড়, তুফান, টাইফুন, রোগব্যধি, যুদ্ধ, খাদ্যাভাব, দুর্ভিক্ষ, বাস্তুচ্যুতি ইত্যাদি সবকিছুই পড়ে।
জাতিসংঘ হিউম্যান সিকিউরিটির সাতটি উপাদান চিহ্নিত করেছে। যথা- অর্থনৈতিক, পরিবেশগত, খাদ্য, স্বাস্থ্য, রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত ও সম্প্রদায়গত উপাদান। মানুষের কর্মসংস্থানের অভাব বা বেকারত্ব মানব নিরাপত্তা হুমকির একটা অন্যতম প্রধান কারণ। দারিদ্র এবং অসম আয় বণ্টন বা সম্পদের অসম বণ্টন মানুষের ক্রয়ক্ষমতার উপর প্রভাব ফেলে। মানুষের কার্যকর কাজ না থাকলে, অর্থ উপায় করে ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে না পারলে, সেই মানুষের মস্তিষ্ক থেকে আজেবাজে চিন্তা আসে; এজন্য বলা হয়ে থাকে অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। সমাজের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য অনিষ্টকর হতে পারে তা।
একটি সমাজে বেকারত্ব তাই মানব নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় নিরাপত্তা হুমকি বা হিউম্যান সিকিউরিটি থ্রেট। একজন নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির অধিকার ক্ষুণ্ন হলে তার স্বাস্থ্য নিরাপত্তা থাকে না। বায়ুদুষণ, বিশ্ব ঊষ্ণায়ন, গ্রীনহাউজ গ্যাসের প্রভাব, নদী, সমুদ্র, খাল বিল জলাশয় দুষণ ইত্যাদি পরিবেশগত মানব নিরাপত্তা হুমকির উদাহরণ। আন্তর্জাতিক কারণেও একটি দেশের মানবনিরাপত্তা হুমকিতে পড়তে পারে। উদাহরণস্বরূপ ওজোনস্তরের ফাটল বা গ্রীন হাউজ ইফেক্ট ইত্যাকার পরিবেশ দুষণসমূহ বৃদ্ধিতে বেশি অবদান আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের যার জন্য আমাদের দেশও ক্ষতিগ্রস্ত। অন্যদিকে রাশা-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে এদেশে হুহু করে গমের দাম বেড়ে গেল, চীন থেকে উদ্ভূত করোনা ভাইরাস সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেল।
সমাজ বা রাষ্ট্রে কোনো দুষ্কৃতিকারী কর্তৃক একজনের বাড়ি বা জমি দখল তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই শুধু বিঘ্নিত করে না। সামাজিক সন্ত্রাস ও মাস্তানতন্ত্রের পথকে উত্সাহিত করে তা। এটিও একটি মানব নিরাপত্তা হুমকি । একজন মহিলা বা নারী যদি একাকী নির্ভয়ে চলাফেরা করতে না পারে, তা তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে সংকুচিত করে, যা মানব নিরাপত্তার প্রতি হুমকি, হিউম্যান সিকিউরিটি থ্রেট। একটি সমাজের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অংশ যদি দুষ্টের লালন করে, শিষ্টের দমন এমনিতেই তখন ত্বরাণ্বিত হয়। মানুষ তার সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারে না। দেশের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তখন দায়িত্ব পালন করতে পারে না। সুশাসনের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। সুশাসন না থাকলে সমাজে মানব নিরাপত্তা আশা করা আর কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার আকাশে চাঁদ দেখার আশা করা একই।
মানব নিরাপত্তা বা হিউম্যান সিকিউরিটির বিভিন্ন দিক বা ডাইমেনশন আছে। বিভিন্ন ডাইমেনশনের মধ্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ডাইমেনশনগুলোকে মোটাদাগে দুভাগে ভাগ করা যায়। এক- অভাব থেকে মুক্তি, দুই-ভয় থেকে মুক্তি।
অভাব থেকে মুক্তি
অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার তিনটি অনুষঙ্গ হলো- দারিদ্র, অর্থনৈতিক শোষণ, এবং মৌলিক চাহিদাপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি। আমাদের সরকার গুচ্ছগ্রাম তৈরি করে আশ্রয়হীনকে ঘরবাড়ি দেয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, যা উদ্যোগ হিসেবে অবশ্যই প্রশংসনীয়। সদাশয় সরকার ঘোষণা করেছে, দেশে কেউ বাড়িঘর বিহীন থাকবে না, যা অবশ্যই কল্যাণ রাষ্ট্র ব্যবস্থার অংশ। কিন্তু অস্বীকার করার জো নেই যে, আমাদের মতো দেশে বহু প্রান্তিক নাগরিক আছে, যাদের নিজেদের খাদ্য নিজেরা উত্পাদন করে খাবারের মতো প্রয়োজনীয় পরিমাণ জমিজিরেত নেই অথবা তাদের তিনবেলা প্রয়োজনীয় আহার জুটাবার মত ক্রয়ক্ষমতা নেই; স্বাস্থ্যসেবা, স্যানিটেশন, শিক্ষার সুযোগ ভীষণ সীমিত।
তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে বেকারত্বজনিত সামাজিক অবক্ষয় বিদ্যমান। এ সমস্ত দেশে মাত্র পাঁচশো টাকা আয়ের বিনিময়ে একজন বেকার যুবক, অভাবগ্রস্থ কিশোরকে দেখা যায়, কোনো আদর্শিক কারণবিহীন রাজধানীতে এসে রাজনৈতিক নেতাদের সমর্থনে মিছিল সমাবেশে যোগ দেয়, নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা তুচ্ছ করে। রাজধানীর বিভিন্ন বাণিজ্যিক ভবনের নিচে, ফুটপাতে অনেককেই ঘুমাতে দেখা যায়। এই দৃশ্য শুধু আমাদের দেশে নয় কিংবা শুধু তৃতীয় বিশ্বে যে বিদ্যমান তা নয়। ইউরোপ আমেরিকায়ও হোমলেস পপুলেশন দেখা যায়, যারা রাস্তার ধারে প্লাকার্ড টাঙ্গিয়ে ভিক্ষে করে, ফুটপাতে নিদ্রা যায়।
ভয় থেকে মুক্তি
হরতাল শব্দটা এদেশেই দেখেছি আমরা নিকট অতীতে, যার অর্থ তোমাকে কাজ করতে দেবো না। ধর্মঘটের চেয়ে ভয়াবহ হরতাল। ধর্মঘট মানে আমি কাজ করবো না। আর হরতাল মানে হলো আমি কাজ করতে দেবো না। একটি স্বাধীন দেশে এটি মানবাধিকার খর্ব করার নামান্তর। মানুষ নিরাপত্তয়া ঝুঁকিতে পড়ে যায়। অনেকেই হুমকির মুখে বাধ্য হয়, মিছিল শ্লোগানে যোগ দিতে। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ছাত্ররাজনীতিতে কোন্দল, চাদাবাজি একটা জঘন্য সমস্যা আমাদের দেশে।
বহু ছাত্র আজকাল হলে না থেকে পার্শ্ববর্তী এলাকায় মেস করে থেকে লেখাপড়া করে এজন্য যে, হলে উঠতে হলে ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে উঠতে হয়, লেখাপড়া বাদ দিয়ে মিছিলে যেতে হয়, মারামারিতে অংশ নিতে হয়। এই পরিস্থিতি যে দেশে বা যে সমাজে বিদ্যমান সে সমাজে মানব নিরাপত্তা কতটুকু হুমকিতে থাকে তা সহজেই অনুমেয়। রাজনৈতিক চাপের কারণে যদি কোনো দেশের পুলিশ বা প্রশাসন স্বাধীনভাবে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে না, যখন বিভিন্ন সরকারি সেক্টর রাজনীতিকীকরণ হয়ে যায়, তখন সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়া অলীক কল্পনা হয়ে যেতে বাধ্য।
বর্তমান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শান্তিবাহিনীর সাথে শান্তি চুক্তি বা পিস ট্রিটি করেছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণ সাধারণের জন্য সহজ হয়েছে। তদুপরি এখনো বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির মধ্যে গ্রুপিং, টেন্ডারবাজি, চাদাবাজি আছে । বেশ কিছুকাল আগে সামাজিক মাধ্যমে মেয়েদের কপালে টিপ পরা এবং স্কুল ছাত্রীর হিজাব পরা নিয়ে বিরাট হইচই হলো। এতে প্রমাণিত হয়, আমাদের সমাজে ভদ্রতা, সদাচরণ ও অধিকারবোধে সমস্যা আছে।
দারিদ্রতা এবং অভাবের কারণে তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানব পাচারের যথেষ্ট নজির আছে। প্রতারক দালাল শ্রেণি বিদেশে উন্নত বেতনের কাজের লোভ দেখিয়ে দেদারসে নারী পাচার করছে। এমতাবস্থায়, মানব নিরাপত্তার দিক এসব দেশে আঙ্গুলি নির্দেশে দেখিয়ে দেবার প্রয়োজন নেই।
মানব নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান কিভাবে
মানব নিরাপত্তা একটি সমাজ বা দেশের মানবাধিকারের সাথে সম্পর্কিত। আমি সমাজে বা রাষ্ট্রে আমার স্বাভাবিক চলাফেরার স্বাধীনতা নিয়ে নিরাপদে থাকবো, আমার প্রতি কেউ জুলুম নির্যাতন করবে না, এটা আমার মৌলিক মানবাধিকার। এটা কিভাবে অর্জন করা যাবে? রাষ্ট্র ও সমাজের দায় আছে মানব নিরপত্তার বিষয়ে দেখভাল করার। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সব স্তরে সততা এবং আইন মেনে চলার অঙ্গীকারের প্রতিফলন থাকলে এই সমস্যার প্রায় সমাধান হয়ে যাবে। উদাহরণস্বরূপ একজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি যদি স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটির কাছে চাঁদা না খায়, বরং স্কুলের সমস্যার জন্য সৎভাবে কাজ করে, শিক্ষক নিয়োগে যদি বাণিজ্য না হয়, তাহলে ওই স্কুলে ভাল শিক্ষক থাকবে, ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়ার পরিবেশ পাবে, ফলাফল ভাল হবে।
আমার একখণ্ড জমি যদি স্থানীয় মাস্তানরা দখল করে, আর আমি পুলিশ প্রশাসনকে জানাই, তবে পুলিশ প্রশাসনকে অ্যাকশনে যাবার আগে যদি চিন্তা করে মাস্তানটি কোন্ দলের তার উপর নির্ভর করবে তার বিচার, তাহলে সুশাসন কখনো প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এই ধরনের সমস্যা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রী লঙ্কা বা যে কোনো দেশেই থাকুক, সেই দেশেই সুশাসনের আশা বৃথা। সংবাদ মাধ্যমকে স্বাধীনতা দিতে হবে, যাতে তারা সঠিক সংবাদ প্রকাশ করতে পারে, একই সাথে সংবাদপত্র এবং সাংবাদিককেও সৎ ও নিরপেক্ষ হতে হবে, হতে হবে ভয়মুক্ত।
আমাদের এখানে শিক্ষক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, সাংবাদিক সবাই রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। ফলে তারা তাদের স্বস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শকে ধারণ করার জন্য কথা বলে বা চুপ থাকে। ফলে তারা কখনো অন্ধ, কখনো একচক্ষুবিশিষ্ট হয়ে সত্য প্রকাশে বিরত থাকে এবং মিথ্যার সাক্ষী হয়ে থাকে, ধীরে ধীরে বিবেকশুন্য হয় সমাজ, মানুষ। এরকম সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিবেশে মানব নিরাপত্তা শুধুই কল্পনায় পর্যবসিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর মানুষের হাত নেই। এদেশের মানুষ যে কোনো প্রাকৃতিক দৈবদুর্বিপাকে একতাবদ্ধ হয়ে মোকাবেলা করেছে, তার ঐতিহ্য আছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিভক্তি, প্রতিহিংসা এমনই একটি সমস্যা, যে সমস্যা বিদ্যমান থাকলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইন শৃঙ্খলার প্রতি আনুগত্য এসবের আশা করা যায় না। দেশপ্রেমের শিক্ষা তখন বড়ই কাগুজে হয়ে যায়।
শরীফ শেখ: লেখক, কবি ও সংস্কৃতিকর্মী
মন্তব্য করুন