

আধুনিক গবেষণাগার, পিয়ার-রিভিউ জার্নাল কিংবা ডিজিটাল ডেটাবেইসের বহু আগেই মুসলিম বিশ্বে গড়ে উঠেছিল এক শক্তিশালী জ্ঞান আন্দোলন। বাগদাদ থেকে কর্ডোবা, সমরকন্দ থেকে কায়রো—এই বিস্তৃত ভূখণ্ডে জ্ঞানচর্চা ছিল কেবল পেশা নয়, বরং নৈতিক দায়িত্ব ও ইবাদতের অংশ।
ইতিহাসে যা আজ ‘ইসলামী স্বর্ণযুগ’ (আনুমানিক অষ্টম থেকে চতুর্দশ শতক) নামে পরিচিত, সে সময় মুসলিম বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, জ্যোতির্বিদ, প্রকৌশলী ও দার্শনিকরা গ্রিক, ফারসি, ভারতীয় ও রোমান সভ্যতার জ্ঞান সংরক্ষণ করেছেন এবং সেখানেই থেমে থাকেননি। তারা গণিতে নতুন পদ্ধতি সৃষ্টি করেছেন, পরীক্ষাভিত্তিক বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছেন, চিকিৎসাবিদ্যাকে ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে উন্নীত করেছেন এবং এমন যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন, যা দিয়ে পৃথিবী মাপা ও আকাশ পর্যবেক্ষণ সম্ভব হয়েছে।
এটি শুধু অতীতের সাফল্যের গল্প নয়। এটি কৌতূহল, সাহস ও বুদ্ধিবৃত্তিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ইতিহাস—যেখানে বিশ্বাস করা হতো, জ্ঞান সমগ্র মানবজাতির জন্য।
কালবেলার পাঠকদের জন্য এমনই ১০ জন মুসলিম বিজ্ঞানীর সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো, যাদের অবদান আজও আধুনিক পৃথিবীকে প্রভাবিত করছে।
১. আল-খাওয়ারিজমি (৭৮০-৮৫০ খ্রি.)
বীজগণিত ও অ্যালগরিদমের স্থপতি
মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমি আধুনিক বিশ্বের ওপর নিভৃতে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছেন। বাগদাদের বিখ্যাত বাইতুল হিকমায় কাজ করার সময় তিনি এমন এক গাণিতিক পদ্ধতি গড়ে তুলেন, যা সংখ্যা ও যুক্তিকে সভ্যতার কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত করে।
সমীকরণ সমাধান বিষয়ে তার গ্রন্থ থেকেই ‘আল-জাবর’ ধারণার জন্ম, যা আজকের বীজগণিত। তার নাম ল্যাটিন ভাষায় রূপান্তরিত হয়ে জন্ম দেয় ‘Algorithm’ শব্দের—যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফটওয়্যার ও ডিজিটাল প্রযুক্তি।
আজও কেন গুরুত্বপূর্ণ: তিনি শুধু সমীকরণ সমাধান করেননি; মানুষকে গাণিতিকভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছেন।
২. ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭)
শতাব্দীর পর শতাব্দী চিকিৎসাবিদ্যার মানদণ্ড
ইবনে সিনা মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী চিকিৎসাবিজ্ঞানী। কৈশোরেই রোগী চিকিৎসা ও শাসকদের পরামর্শ দিতে শুরু করেন। তার অমর গ্রন্থ আল-কানুন ফিৎ তিব্ব (The Canon of Medicine) ছয় শতাধিক বছর ইউরোপ ও মুসলিম বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য ছিল।
চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি লিখেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, দর্শন, নীতিশাস্ত্র ও রসায়ন নিয়ে। তার মতে, চিকিৎসা মানে শুধু দেহ নয়—মানুষকে পূর্ণাঙ্গভাবে বোঝা।
আজও কেন গুরুত্বপূর্ণ : আধুনিক রোগ নির্ণয় ও রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসার ভিত্তিতে রয়েছে তার পদ্ধতিগত চিন্তা।
৩. আল-রাজি (৮৫৪-৯২৫)
পরীক্ষাভিত্তিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের পথিকৃৎ
আল-রাজি চিকিৎসাবিদ্যায় পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। হাসপাতাল পরিচালক হিসেবে তিনি রোগের লক্ষণ, চিকিৎসা ও ফলাফল লিপিবদ্ধ করতেন—যা ক্লিনিক্যাল কেস স্টাডির সূচনা। তিনিই প্রথম গুটিবসন্ত ও হাম আলাদা করে শনাক্ত করেন। রসায়নে তিনি পাতন, পরিস্রবণ ও স্ফটিকায়নের পদ্ধতি উন্নত করেন।
আজ কেন গুরুত্বপূর্ণ : তিনি চিকিৎসাকে কুসংস্কার থেকে বিজ্ঞানভিত্তিক ধারায় নিয়ে আসেন।
৪. আল-বিরুনি (৯৭৩-১০৪৮)
যিনি পৃথিবীর পরিমাপ নির্ণয় করেছিলেন
আধুনিক যন্ত্র ছাড়াই আল-বিরুনি পৃথিবীর ব্যাসার্ধ নির্ণয় করেন অবিশ্বাস্য নির্ভুলতায়। পাশাপাশি তিনি ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও ভূগোল নিয়ে গবেষণা করেন এবং অন্য সভ্যতাকে সম্মানের চোখে দেখেন।
আজও কেন গুরুত্বপূর্ণ : তিনি বিজ্ঞান ও মানবিকতার সংযোগের প্রতীক।
৫. ইবনে আল-হাইসম (৯৬৫-১০৪০)
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির জনক
তিনি পরীক্ষাভিত্তিক গবেষণাকে বাধ্যতামূলক করেন। আলোকবিদ্যায় প্রমাণ করেন, দৃষ্টি চোখ থেকে আলো নির্গমনের কারণে নয়, বরং আলো চোখে প্রবেশ করার ফলে হয়।
আজও কেন গুরুত্বপূর্ণ : আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার পদ্ধতি তাঁর চিন্তার উত্তরাধিকার।
৬. আল-কিন্দি (৮০১-৮৭৩)
সভ্যতার সেতুবন্ধনকারী
গ্রিক, ফারসি ও ভারতীয় জ্ঞান অনুবাদ ও সংরক্ষণে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। গণিত, সংগীত, চিকিৎসা ও ক্রিপ্টোগ্রাফিতে অবদান রেখেছেন।
আজও কেন গুরুত্বপূর্ণ : তিনি প্রমাণ করেছেন, জ্ঞান সহযোগিতায় সমৃদ্ধ হয়।
৭. ইবনে রুশদ (১১২৬-১১৯৮)
যুক্তিবাদের সাহসী কণ্ঠ
তিনি বিশ্বাস ও যুক্তির সহাবস্থান প্রতিষ্ঠা করেন। ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থায় তার দর্শনের প্রভাব ছিল গভীর।
আজও কেন গুরুত্বপূর্ণ: সমালোচনামূলক চিন্তা ও বিশ্বাসের সহাবস্থানের ভিত্তি গড়ে দেন।
৮. আল-জাহরাউই (৯৩৬-১০১৩)
আধুনিক অস্ত্রোপচারের জনক
শতাধিক অস্ত্রোপচার যন্ত্রের নকশা ও পদ্ধতি তিনি লিপিবদ্ধ করেন। তার অনেক যন্ত্র আজও ব্যবহৃত।
আজও কেন গুরুত্বপূর্ণ : অস্ত্রোপচারকে পদ্ধতিগত ও শিক্ষণযোগ্য বিদ্যায় রূপ দেন।
৯. জাবির ইবনে হাইয়ান (৭২১-৮১৫)
পরীক্ষামূলক রসায়নের রূপকার
তিনি পদার্থ বিশ্লেষণে পরীক্ষার ব্যবহার চালু করেন, যা আধুনিক রসায়নের ভিত্তি।
আজও কেন গুরুত্বপূর্ণ : ল্যাবভিত্তিক বিজ্ঞানচর্চার সূচনা করেন।
১০. নাসিরুদ্দিন আত-তুসি (১২০১-১২৭৪)
আকাশ মানচিত্রের কারিগর
গ্রহগতির ব্যাখ্যায় তার গণিত পরবর্তী জ্যোতির্বিদ্যায় প্রভাব ফেলে। তিনি মধ্যযুগের অন্যতম উন্নত মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।
আজও কেন গুরুত্বপূর্ণ : প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
যে চেতনা তাদের একসূত্রে বেঁধেছিল
এই মনীষীরা বিশ্বাস করতেন জ্ঞান অর্জন ইবাদত, কৌতূহল নৈতিক গুণ এবং জ্ঞান মানবজাতির সম্পদ। তাদের সভ্যতায় গ্রন্থাগার, হাসপাতাল ও মানমন্দির ছিল জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান।
সূত্র : দ্য হালাল টাইমস
মন্তব্য করুন