বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে গত বছরের ৫ আগস্ট রাজধানীর পার্শ্ববর্তী সাভারের আশুলিয়া থানার সামনে আস-সাবুরসহ ছয়জনকে পুড়িয়ে ফেলে পুলিশ। এর মধ্যে পাঁচজন ছিল মৃত ও একজন জীবিত। শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে করা মামলায় গতকাল সোমবার আস-সাবুরের পিতা অবসরপ্রাপ্ত গার্মেন্টস কর্মকর্তা মো. এনাব নাজেজ জাকিসহ আরও তিনজন সাক্ষী তাদের সাক্ষ্য প্রদান করেন। তিন সাক্ষীর জেরা শেষে বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ আগামীকাল বুধবার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেছেন। এর আগে চার দিনে এ মামলায় ৯ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা শেষ হয়। এ নিয়ে মামলাটিতে মোট ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জেরা শেষ হয়েছে।
এনাব নাজেজ জাকি সাক্ষ্য প্রদানকালে ট্রাইব্যুনালের কাছে আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর দুটি ভিডিও দাখিল করেন। ভিডিও দুটি ট্রাইব্যুনালে চালু (প্লে) করলে দেখা যায়, একটিতে হত্যাকাণ্ডের পর লাশগুলো একটি রিকশাভ্যানে চ্যাংদোলা করে তুলে স্তূপ করা হচ্ছে। দ্বিতীয় ভিডিওতে একটি পুলিশ ভ্যানের ভেতরে লাশগুলোকে আগুন দিয়ে পোড়ানোর দৃশ্য রয়েছে। যেখানে একজন পুলিশ সদস্যকে আগুনের তীব্রতা বাড়ানোর জন্য কাঠের বেঞ্চ নিক্ষেপ করতে দেখা যায়। ভিডিও প্রদর্শনকালে সাক্ষী কান্নায় ভেঙে পড়েন। সাক্ষী ভিডিওতে রিকশাভ্যানের ওপর পড়ে থাকা অবস্থায় তার ছেলের মৃতদেহ শনাক্ত করেন। এ সময় ট্রাইব্যুনালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণ ঘটে।
এনাব নাজেজ জাকি তার জবানবন্দিতে বলেন, ঘটনার পরদিন ৬ আগস্ট বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে আমার ছেলেকে অনেক খোঁজাখুঁজি করি। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমরান নামে একজন সমন্বয়ক আমার বড় ছেলেকে জানায়, আশুলিয়া থানার সামনে কয়েকটা পোড়ানো লাশ রয়েছে। সেখানে আপনার ভাইয়ের লাশ আছে কি না, এসে শনাক্ত করেন। আমার ছেলে আস-সাবুরকে তার পরিধেয় টি-শার্টের পোড়া অংশ এবং মোবাইলের সিম দেখে শনাক্ত করে। লাশের সঙ্গে থাকা মোবাইল থেকে সিমটি বের করে অন্য একটি মোবাইলে সংযুক্ত করার পর দেখা যায় ওই সিমটি আমার ছেলে আস-সাবুরের। আমি আমার ছেলের লাশের দিকে এক নজর তাকিয়েছি, কিন্তু তার চেহারা এমন বীভৎস অবস্থায় ছিল—তাকে চেনার কোনো উপায় ছিল না।
তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এবং সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের উসকানিতে, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের নির্দেশে, সে সময়কার আশুলিয়া থানার ওসি, এসআই, কনস্টেবল এরা আমার ছেলেকে হত্যা করে। ঢাকা উত্তরের উপপুলিশ কমিশনার আব্দুল্লাহ হেল কাফি, ডিবির এসআই আরাফাত হোসেন, ঢাকা ১৯-এর সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামের সহায়তা ও মদদে পুলিশ এ হত্যাকাণ্ড চালায়। আমি আমার ছেলের হত্যাকারীদের বিচার ও শাস্তি চাই। যেভাবে আসামিরা আমার ছেলেকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে, আমি সে ধরনের শাস্তি চাই।
রাজশাহীতে আন্দোলনে অংশ নেওয়া জসিম উদ্দিন তার সাক্ষ্যে বলেন, সন্ত্রাসীরা পেছন থেকে হামলা চালায় এবং গুলি করে, ককটেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। সাউন্ড গ্রেনেডের অংশ আমার বাঁ পায়ে লাগে এবং আমি আহত হই। আমি আমার মোটরসাইকেলে উঠতে যাই। তখন চার থেকে পাঁচজন ছাত্র-জনতা আন্দোলনের নেতা আলী রায়হানকে গুলিবিদ্ধ আমার দিকে নিয়ে আসছিল। তাকে মোটরসাইকেলে করে বিকল্প পথে অনেক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রেখে আমি আবার আন্দোলনে ফিরে আসি এবং জানতে পারি, শাহ মখদুম কলেজ এবং স্বচ্ছ টাওয়ারের পাশে শাকিব আনজুম নামের আরেকজন ছাত্র গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মরে পড়ে আছে। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের প্রতিবন্ধকতার কারণে তার লাশ কেউ নিতে সাহস পাচ্ছিল না। এরপর আমি দেখি, শাকিব আনজুমের আত্মীয়স্বজনরা কিছুক্ষণ পর সেখানে এসে ভ্যানে তার লাশ নিয়ে তালাইমারী শহীদ মিনারের কাছে তাদের বাড়ি নিয়ে যায়। আর গুলিবিদ্ধ আলী রায়হান চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত বছরের ৮ আগস্ট মারা যায়। এই নিরীহ নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমন করতে দেশব্যাপী এ হত্যাকাণ্ড, আহত ও ক্ষতির জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আইজিপি মামুন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ডিএমপি এবং আরএমপির পুলিশ কমিশনার, রাজশাহীর তৎকালীন মেয়র খায়রুজ্জামান লিটনসহ অন্যান্য যাদের কথা বলেছি তারা দায়ী। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ফাঁসি চাই।
যাত্রাবাড়ী এলাকায় আন্দোলনে শহীদ ইমাম হাসান তায়িম ভূঁইয়ার ভাই রবিউল আওয়াল ভূঁইয়া তার সাক্ষ্যে বলেন, তায়িমের বন্ধুদের কাছ থেকে জানতে পারি, পুলিশ টিয়ার গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড এবং গুলি করলে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। তায়িম তার দুজন বন্ধুসহ লিটনের চায়ের দোকানে আশ্রয় নেয়। পুলিশ সেখান থেকে তাদের তিনজনকে টেনে বের করে এবং বেধড়ক মারধর করে। পুলিশ তাদের গালি দিয়ে দৌড় দিতে বলে। তায়িম প্রথমে দৌড় দেয়। তখন তায়িমের পায়ে একজন পুলিশ সদস্য গুলি করে দেয়। সে পেছন ফিরে তাকালে তখন তার শরীরের নিম্নাংশে আরেকটি গুলি করা হয়। গুলিটি সামনের দিকে প্রবেশ করে পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়। তায়িমকে শটগান দিয়ে আরও অনেক গুলি করা হয়। তখন তার বন্ধু রাহাত তাকে পেছন দিয়ে ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল তাকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে। তখন পুলিশ রাহাতকেও গুলি করে এবং তাকে বাধ্য করে তামিমকে ফেলে রেখে যেতে। রাহাত চলে যাওয়ার পরও আধা ঘণ্টা পর্যন্ত তায়িম ওখানে পড়েছিল। তায়িম ওখানে পড়ে কাতরাচ্ছিল এবং আকুতি করছিল আমাকে বাঁচান বাঁচান বলে। সাংবাদিকসহ উপস্থিত অনেকেই তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিতে চেয়েছিল; কিন্তু পুলিশ সদস্যরা তাকে নিতে দেয়নি; বরং তারা তার মৃত্যু উপভোগ করছিল। ওখান থেকে ২০ গজের মধ্যে রাস্তার দুই পাশে দুটি হাসপাতাল ছিল। আধা ঘণ্টা পর পুলিশ ভ্যানে করে তাকে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে নিয়ে ভ্যান থেকে মাটিতে নামিয়ে পাঁচ থেকে ছয়জন পুলিশ বুট জুতা দিয়ে তাকে মাড়িয়ে তার চেহারা বিকৃত করে ফেলে। তাদের মধ্যে ছিল এডিসি শামিম, এডিসি মাসুদুর রহমান মনির ও এসি নাহিদ। পরে কেউ তাকে ভ্যানে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ট্রাইব্যুনালে এ মামলায় প্রসিকিউশন পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এসএইচ তামিম, প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ প্রমুখ শুনানি করেন। এ সময় অন্য প্রসিকিউটররা উপস্থিত ছিলেন। এদিকে এ মামলায় পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন। আর এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়া আসামি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে গত ১০ জুলাই অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এ ছাড়া এ মামলায় দোষ স্বীকার করে ঘটনার সত্যতা উদ্ঘাটনে (অ্যাপ্রোভার) রাজসাক্ষী হতে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের আবেদন মঞ্জুর করেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর গত ৩ আগস্ট এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়।
মন্তব্য করুন