আইনি প্রক্রিয়ায় কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও স্বস্তিতে নেই বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। কারামুক্ত বেশিরভাগ নেতাকর্মীই মানসিক ও শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। জটিল রোগে আক্রান্ত অনেকেই অতীতে বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করিয়েছেন। সমস্যা বেড়ে যাওয়ায় তাদের আবারও বিদেশে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। তবে এমন অনেক নেতাকর্মীকে বিদেশে যেতে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। কারও কারও পাসপোর্ট দীর্ঘদিন ধরে আটকে রাখা হয়েছে। এমনকি সব কিছু ঠিকঠাক করে রওনা হওয়ার পর বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির একাধিক নেতা।
জানা গেছে, তিন মাসের বেশি সময় কারাবন্দি থাকায় ছয় কেজি ওজন কমেছে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। গত ৪ মার্চ চিকিৎসার জন্য তিনি সস্ত্রীক সিঙ্গাপুরে গেছেন। এ ছাড়া দুই নেতা চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেছেন। আরও কয়েকজন ঢাকায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
জানা গেছে, চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহ কয়েকজন। বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির পাসপোর্ট দুই বছর ধরে ফেরত দেওয়া হচ্ছে না। ফলে তিনি বিদেশে যেতে পারছেন না। পাসপোর্ট আটকে রাখা ও বিমানবন্দরে নেতিবাচক আচরণকে পরিকল্পিত হয়রানি মনে করছেন বিএনপি নেতারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২২ সালের ১৬ মার্চ ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। সে বছর ৭ এপ্রিল তার ই-পাসপোর্ট ডেলিভারি দেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তিনি পাসপোর্ট পাননি।
এ্যানি জানান, দুই বছর আগে তার নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করা হয়। অন্যদের পাসপোর্ট দেওয়া হলেও তার পাসপোর্ট আটকে রাখা হয়েছে। তিনি পাসপোর্ট অফিসে একজন সহকারী পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওই পরিচালক ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলে এ্যানিকে জানান, মামলা থাকার কারণে তার পাসপোর্ট দেওয়া যাবে না। মামলা তদন্ত করে পাসপোর্ট দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অবশ্য এই সময়ের মধ্যে লক্ষ্মীপুর ও ঢাকা থেকে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এ্যানির মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে খোঁজখবর নেন। তারা জানতে চাইলে এ্যানি বলেন, তিনি সাজাপ্রাপ্ত নন। পাসপোর্ট পাওয়া তার সাংবিধানিক অধিকার।
বিএনপির এই নেতা জানান, ওই ঘটনার পর তিনি আদালতের শরণাপন্ন হলে আদালত গত বছরের ৩ এপ্রিলের মধ্যেই তাকে পাসপোর্ট দেওয়ার আদেশ দেন। ২০২২ সালের ২৮ জুন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির পাসপোর্ট কেন দেওয়া হবে না—সে বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ওপর রুল জারি করেন।
এ্যানি জানান, উচ্চ আদালতের আদেশ নিয়ে পাসপোর্ট অফিসে যোগাযোগ করলে তারা এ বিষয়ে আপিল করবে বলে জানায়। একপর্যায়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের আপিল খারিজ হলে আদালতের আদেশসহ আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে পাসপোর্ট অফিসে যান শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। কিন্তু তাকে পাসপোর্ট না দিয়ে বলা হয় যে, আপিলের রিভিউ আবেদন করবে পাসপোর্ট অধিদপ্তর। এখন আগামী ১৮ মার্চ রিভিউ আবেদনের শুনানির দিন ধার্য রয়েছে বলে জানান এ্যানি।
শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি কালবেলাকে বলেন, ‘পাসপোর্ট হচ্ছে একজন ব্যক্তির সাংবিধানিক ও নাগরিক মৌলিক অধিকার। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা সত্ত্বেও তাকে পাসপোর্ট না দিয়ে নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার পাশাপাশি নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।’
তিনি জানান, তার হার্টের বাইপাস সার্জারি করা হয়েছে। দ্রুত ফলোআপ দরকার। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস ও চোখের সমস্যায় ভুগছেন। দিনে দিনে এসব শারীরিক জটিলতা বাড়ছে। অথচ তাকে পাসপোর্ট না দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।
জানা যায়, এর আগে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ চিকিৎসার জন্য ভারতে যেতে চাইলে বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশ বাধা দেয়। ওইদিন দুপুর ১২টার দিকে হাফিজ উদ্দিন আহমদকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন থেকে ফেরত পাঠানো হয়। তার মালপত্র ফ্লাইটে তোলা হলেও ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে অপেক্ষা করতে বলে। পরে তাকে জানানো হয় যে, তিনি বিদেশে যেতে পারবেন না। এরপর ১৩ ডিসেম্বর হাফিজ উদ্দিন আহমদ এ নিয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। পরে গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর ভারতে যান চিকিৎসার জন্য।
বিদেশে থাকা অবস্থায় একটি মামলায় মেজর (অব.) হাফিজের সাজা হয়। গত ৩ মার্চ তিনি দেশে ফেরেন। বিএনপির অভিযোগ, বিমান থেকে নামার পর কর্তৃপক্ষ তাকে বিমানবন্দরের ভেতরে বসিয়ে রাখে। পরে অবশ্য তাকে বের হতে দেওয়া হয়। সম্প্রতি আদালতে আত্মসমর্পণের পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল গত ২৯ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টার দিকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে চাইলে বিমানবন্দরে পাসপোর্টসহ কাগজপত্র আটক করে তাকে দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখা হয়। পরে অবশ্য তাকে বিদেশে যেতে দেওয়া হয়। এরপর গত ৪ মার্চ ফেরার সময় আবারও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ আলালের। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসা শেষে সেদিন রাত পৌনে ৮টায় ঢাকা বিমানবন্দরে নামার পর ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে ও তার সহধর্মিণীকে কোনো কারণ ছাড়াই বসিয়ে রাখে। আলাল জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর আগে ভারতের চেন্নাইয়ে তার অপারেশন হয়েছিল। নিয়মিত চেকআপের জন্য অনেক আগেই চেন্নাই যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সাড়ে তিন মাসের বেশি সময় কারাগারে থাকায় তিনি যেতে পারেননি। এতে তার শরীর অনেক খারাপের দিকে গেছে।
আলাল আরও জানান, বিদেশে যেতে তার কোনো বাধা নেই। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও তাকে মানসিকভাবে হয়রানি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, কারামুক্ত হওয়ার পর অসুস্থ হয়ে ঢাকায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ও হবিগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র জি কে গউছসহ কয়েকজন। কিছুদিনের মধ্যে ভারতে যেতে চান সদ্য কারামুক্ত জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান পলাশ। তিনি বুধবার বলেন, কারাগারে থাকা অবস্থায় বিভিন্ন রকম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তীব্র শীতেও কম্বল দেওয়া হয়নি। এতে করে অনেকেই ঠান্ডাজনিত রোগে ভুগছেন। কয়েক মাস কারাগারে থাকায় তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করছেন।
এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আওয়ামী দখলদার সরকার একটি ডামি নির্বাচন করার জন্য বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের অসংখ্য নেতাকর্মীকে মিথ্যা ও গায়েবি মামলায় গ্রেপ্তার করে অন্যায়ভাবে দিনের পর দিন কারাগারে আটকে রাখে। সেখানে একটা মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম যে অধিকার, সেটা দেওয়া হয়নি। তীব্র শীতে একটা কম্বলও দেওয়া হয়নি। বালু মেশানো ভাত খেতে দেওয়া হয়েছে। জেলের মধ্যে বিএনপি নেতাকর্মীদের এভাবে নিপীড়ন নির্যাতন করা হয়েছে। বিনা চিকিৎসা ও কারা কর্তৃপক্ষের অবহেলায় ১৩ জনের বেশি নেতাকর্মী কারাগারে মারা গেছেন। অনেকেই কারামুক্ত হলেও শারীরিকভাবে অসুস্থ। অনেককে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।’