সানাউল হক সানী ও মাহমুদুল হাসান
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৩, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৩, ০৪:০১ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাস্থ্যের জরুরি কেনাকাটায় তেলেসমাতি কারবার

পুরোনো ছবি
পুরোনো ছবি

মূল ব্যবসা তাদের গাড়ি মেরামত। এ কাজের জন্য মাঝেমধ্যে বিদেশ থেকে গাড়ির নানা যন্ত্রাংশ আমদানি করে। কারও আবার রয়েছে গার্মেন্ট কারখানা। বিদেশে রপ্তানি করেন নানা ধরনের পোশাক। সাধারণ দৃষ্টিতে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্পৃক্ত থাকার কথা নয়। কিন্তু করোনা মহামারির সময় চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের শতকোটি টাকার কাজ পেয়েছে এসব কোম্পানি। মেডিকেল ডিভাইস, মাস্ক ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) সরবরাহের জন্য দেশে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নানা প্রতিষ্ঠান থাকলেও তাদের বাদ দিয়ে বিনা দরপত্রে কাজ পেয়েছে পোশাক কারখানা আর গাড়ি মেরামতকারী কোম্পানি। এরপর পদে পদে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা লুটে নিয়েছে। নজিরবিহীন এই অনিয়ম হয়েছে কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি)’ প্রকল্পে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নথি বলছে, মানহীন ও পরিমাণে কম সরবরাহ, ডিপিপির চেয়ে বেশি দামে ক্রয়, একই পণ্য একই সময়ে ভিন্ন কোম্পানি থেকে আলাদা দামে ক্রয় এবং সরকারের রাজস্ব ফাঁকি—সব মিলিয়ে ১২টি খাতে প্রায় ২০০ কোটি টাকা লোপাট করেছে এসব কোম্পানি।

জানা গেছে, ১ হাজার ১২৭ কোটি ৫২ লাখ টাকার ইআরপিপি প্রকল্পে ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বাকি টাকা এসেছে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে। প্রকল্পটির ওপর নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিজিএ) কার্যালয়। এতে স্বাস্থ্যের সরঞ্জাম কেনাকাটায় নানা অনিয়ম ও অর্থ লোপাটের চিত্র বেরিয়ে এসেছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদন বলছে, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা না থাকলেও স্বাস্থ্যের সামগ্রী সরবরাহের কাজ পেয়েছে জাদিদ অটোমোবাইলস ও এসআরএস ডিজাইন অ্যান্ড ফ্যাশন নামে দুটি প্রতিষ্ঠান। প্রথমটি গাড়ির স্পেয়ার পার্টস সরবরাহকারী। অন্যটি পোশাক কারখানা। অনভিজ্ঞ এসব প্রতিষ্ঠান থেকে ৫৯ কোটি ৪০ লাখ টাকার পণ্য কেনায় সরকারের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

পণ্য সরবরাহ সংক্রান্ত কাগজপত্রে জাদিদ অটোমোবাইলসের ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে রাজধানীর পল্লবীতে। তবে সরেজমিন সেই ঠিকানায় গিয়ে তাদের অফিসের কোনো অস্তিত্ব মেলেনি। ওই বাড়িতে যারা বসবাস করেন তারাও বলছেন, এমন নামে কোনো প্রতিষ্ঠানকে তারা চেনেন না।

আশপাশে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই এলাকায় এ নামে একটি গাড়ি মেরামত প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড রয়েছে। তবে সরেজমিন সেই সাইনবোর্ডের দেখাও মেলেনি। প্রতিষ্ঠানের হদিস পাওয়া যায়নি। তবে ওই এলাকায় জাদিদ অটোমোবাইলস নামে একটি গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ ছিল। মাঝেমধ্যে গাড়ি মেরামতের যন্ত্রাংশ আমদানি করত। তবে কখনো সার্জিক্যাল পণ্য আমদানির রেকর্ড নেই। তা সত্ত্বেও এই কোম্পানিটি বিপুল পরিমাণ টাকার কাজ পেয়েছে।

জানা গেছে, করোনাকালে স্বাস্থ্যের কেনাকাটা নিয়ে নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জাদিদ অটোমোবাইলসের মালিক শামীমুজ্জামান কাঞ্চনকে ২০২০ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তলব করেছিল। এরপর এই প্রকল্পের পরিচালক অধ্যাপক ডা. ইকবাল কবীরকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

জাদিদ অটোমোবাইলসের মালিক শামীমুজ্জামান কাঞ্চন কালবেলাকে বলেন, ‘সংকটকালে সরকারি কাজ করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছি। ভুল অডিট আপত্তির কারণে ফের পণ্য সরবরাহ করেছি। এরপরও গত তিন বছরে সেই কাজের বিল পাইনি।

পল্লবীতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের খোঁজ না পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক কর্মচারীকে বিদায় করতে হয়েছে। তাই হয়তো আপনি অফিসে কাউকে পাননি।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আরেক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এসআরএস ডিজাইন অ্যান্ড ফ্যাশন মূলত গার্মেন্ট ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কোম্পানির একজন কর্মচারী জানান, ‘বিদেশের বিভিন্ন গার্মেন্ট পণ্য তারা রপ্তানি করেন। অন্য কোনো পণ্য আমদানির সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা নেই। কখনো সার্জিক্যাল পণ্য আমদানি করেনি। তবে তিনি দাবি করেন, ইতোপূর্বে তারা সরকারি সংস্থায় দেড় লাখ পিস কম্বল সরবরাহ করেছিলেন।’

নির্ধারিত ডিভাইসের তুলনায় কম সরবরাহ করে অর্থ হাতিয়েছে আরেক সরবরাহকারী মোহাম্মদপুরের সিম করপোরেশন। আর দুটি পরামর্শ প্রতিষ্ঠান থেকে যাচাই-বাছাই ছাড়াই মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট করা হয়েছে। সেইসঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের কেনাটাকায় সরকারকে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ করে দেওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সিম করপোরেশন ঠিকানায় যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বলেন, তিন বছর আগের একটি অভিযোগ নিয়ে আপনারা কেন আবার খোঁজ নিচ্ছেন। অভিযোগের বিষয়ে তিনি কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যান্ডেমিক প্রিপারেন্ডেসেস প্রকল্পের আওতায় এই তিন সরবরাহকারী ব্যবহার অনুপযোগী কেএন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ করায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ২৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। একই মাস্ক পরিমাণে কম সরবরাহ করায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই), কেএন-৯৫ মাস্ক এবং ইনফ্রারেড থার্মোমিটার প্রাপ্তি ও বিতরণে গরমিল হওয়ায় ক্ষতি হয়েছে ৩২ কোটি ৮৫ লাখ ১০ হাজার ৫০০ টাকা। অনভিজ্ঞ ও অযোগ্য সরবরাহকারীর সঙ্গে চুক্তি করে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই), মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস ক্রয়ে ক্ষতি হয়েছে ৫৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা। জরুরি পরিস্থিতিতে ক্রয়কৃত চিকিৎসা সহায়ক সামগ্রী প্রকল্পের উদ্দেশ্যে ব্যাহত করে অব্যবহৃত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে ৪৭ কোটি ২৬ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। একই চিকিৎসা সামগ্রী একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন দরে ক্রয়ে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে আরও ১৭ কোটি ১০ লাখ টাকা। সরবরাহকারী থেকে ভ্যাট এবং আয়কর কর্তন না করায় রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে আরও ১ কোটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার ২৫৭ টাকা। ভ্যাট ও আয়কর নির্ধারিত সময়ে সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ায় সরকারের ক্ষতি হয়েছে ৫ কোটি ৯২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত বিধান (পিপিআর-২০০৮) লঙ্ঘন করে জামানত ছাড়া পণ্য সরবরাহের চুক্তি করায় ক্ষতি হয়েছে ১০ কোটি ৮২ লাখ ৬ হাজার টাকা। সিঙ্গেল সোর্স সিলেকশন পদ্ধতিতে পরামর্শক ফার্ম থেকে মোবাইল অ্যাপ, টিভি ক্লিফ এবং সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের কাজে অনিয়মিতভাবে ব্যয় হয়েছে আরও ৬ কোটি ১৮ লাখ ৪২ হাজার ৪৮০ টাকা। নির্ধারিত সময়ে মালপত্র সরবরাহ করতে ব্যর্থ হওয়ায় চুক্তির শর্ত মোতাবেক জরিমানা ছাড়া বিল পরিশোধ করায় ক্ষতি হয়েছে আরও ৪ কোটি ১৯ লাখ ৬৯ হাজার ৯২৮ টাকা।

এ ছাড়া ডিপিপিতে উল্লিখিত দর অপেক্ষা অধিক মূল্যে চিকিৎসা সামগ্রী ক্রয় করায় সরকারের ক্ষতি হয়েছে ৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা। রিপোর্ট বলছে, ২০২০ সালে ৩১ কোটি ৯০ লাখ টাকার ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী, মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস সরবরাহের চুক্তি করে সরকার। চুক্তি অনুযায়ী দেড় লাখ পিস মাস্ক সরবরাহের কথা হয়। কেন্দ্রীয় ঔষধাগার এসব পণ্য বুঝে নেওয়ার সময় দেখা যায়, প্রায় ২৪ হাজার পিস মাস্ক ভেজা। এসব ব্যবহার অনুপযোগী পণ্যের কারণে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয় প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। সেইসঙ্গে জাদিদ অটোমোবাইলসের সরবরাহকৃত মাস্ক গুনে দেখা যায়, সেখানে ২ হাজার পিস মাস্ক কম সরবরাহ করেছে। এতে আরও ১০ লাখ ৪০ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাস্ক, পিপিই ইনফ্রাটেড থার্মোমিটার সরবরাহের জন্য গার্মেন্ট কোম্পানি এসআরএস ডিজাইন অ্যান্ড ফ্যাশনের সঙ্গে ২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং সিম করপোরেশনের সঙ্গে আরও ৯ কোটি ২০ লাখ ৬০ হাজার টাকার চুক্তি হয়। মালপত্র সরবরাহের গরমিল হিসাবে এখানে সরকারের ৩২ কোটি ৮৫ লাখ ১০ হাজার ৫০০ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব প্রতিষ্ঠানের নামে আড়ালে থেকে অন্য কেউ কাজ বাগিয়ে নিয়েছিলেন বলেই হয়তো এত ছাড় দেওয়া হয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের বর্তমান পরিচালক মো. তোফায়েল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘করোনাকালে জরুরি ভিত্তিতে বিভিন্ন চিকিৎসা ও সুরক্ষা সামগ্রী সরকারের ইআরপিপি প্রজেক্টের আওতায় কেনাকাটা করা হয়েছিল। তবে এসব পণ্য ক্রয়ে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার কোনো ভূমিকা রাখেনি। শুধু পণ্য রাখার জন্য আমাদের গুদাম ব্যবহার করা হয়েছে।’

অনিয়মের নানা অভিযোগ সম্পর্কে কথা বলতে প্রায় দুই সপ্তাহ চেষ্টা করেও ইআরপিপি প্রকল্পের পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ গোলাম নবীকে পাওয়া যায়নি। বেশ কয়েকবার তার অফিসে গিয়ে পাওয়া যায়নি। বারবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেনি। খুদেবার্তার জবাবে তিনি জানান, এখন কথা বলতে পারবেন না।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘নির্বাচন নিয়ে কেউ বিকল্প ভাবলে তা হবে বিপজ্জনক’

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর নির্বাচন নিয়ে ফখরুলের বার্তা

মেক্সিকোয় নিখোঁজ ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ, কী ঘটেছে তাদের ভাগ্যে?

হঠাৎ বিমানের দরজা খুলে দিল যাত্রী, অতঃপর...

স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের জমি দখলের অভিযোগ

সরকারকে আমরা ব্যর্থ হতে দেব না : রাশেদ খাঁন

নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি জটিল করা হচ্ছে : তারেক রহমান

রাবি শিবির সভাপতির বুকে বোতল নিক্ষেপ

দেশের জনগণ এখন নির্বাচনমুখী হয়ে গেছে : দুলু

স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিএনপির বিকল্প নেই : এমএ আজিজ

১০

প্রিমিয়ার লিগে ম্যানসিটির টানা দ্বিতীয় পরাজয়

১১

স্পেন থেকে ১০০ জাহাজের বহর যাচ্ছে গাজায়

১২

চবি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে জাবি শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন

১৩

‘আমি সেই ভাগ্যবান, যে বাবা-মায়ের কাছে থাকতে পারি’

১৪

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ

১৫

বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার অলির মেয়ের বিয়ের দায়িত্ব নিলেন তারেক রহমান

১৬

বাংলাদেশ ব্যাংকে নির্বাহী পরিচালক পদে ৪ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি

১৭

৩ মাসের জন্য এনসিপির ‘নির্বাহী কাউন্সিল’ গঠন

১৮

বৈশ্বিক তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দর ৬৮তম

১৯

জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ করার চক্রান্ত নস্যাৎ হয়ে যাবে : জাপা মহাসচিব

২০
X