সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত একমাত্র স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল। পাঁচ বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একনেক সভায় হাসপাতালকে ৪ তলা থেকে ১৬ তলা এবং ১৫০ শয্যা থেকে ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণের প্রস্তাব অনুমোদন করেন। এরপর উদ্যোগ নেওয়া হয় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি কেনাকাটার। এই প্রকল্পে হাইটেক মেডিকেল যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় পদে পদে হয়েছে নজিরবিহীন অনিয়ম। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলসকে (পিপিআর) বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দরপত্র আহ্বান করেন প্রকল্প পরিচালক। এরপর কৌশলে পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একের পর এক কাজ বাগিয়ে দিয়েছেন। এ-সংক্রান্ত অনিয়ম নিয়ে এর আগেও কালবেলায় একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এখন আবার দরপত্রের শর্ত শিথিল করে পুনঃদরপত্রের মাধ্যমে আরও তিনটি প্যাকেজের কাজ পাইয়ে দিতে প্রকল্প পরিচালক উঠেপড়ে লেগেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের (এসকেএইচইউপি জিডি-১০) প্যাকেজে ভারী মেডিকেল ইকুইপমেন্ট কেনাকাটার দরপত্র আহ্বান করা হয়। যার প্রাক্কলিত মূল্য ধরা হয় আনুমানিক ৪০ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এই প্যাকেজে এমআরআই, সিটিস্ক্যান, এক্স-রে মেশিন, আলট্রাসাউন্ডসহ অন্যান্য স্পর্শকাতর যন্ত্রপাতি কেনার কথা। দরপত্রে স্পেসিফিকেশনে উন্নত প্রযুক্তি ও উচ্চ গুণগত মানসম্পন্ন যন্ত্রপাতির উল্লেখ করা হয়। কিন্তু কেনাকাটার সময় প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে স্পেসিফিকেশন যথাযথভাবে অনুসরণ হয়নি। উল্টো অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে যন্ত্রপাতি সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এখানেই শেষ নয়। এরপর একে একে এসকেএইচইউডি জিডি-১১, ১২, ১৩, ১৪ এবং ১৫ নম্বর প্যাকেজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। তার মধ্যে ১৪ ও ১৫ নম্বর প্যাকেজে সর্বোচ্চ দরদাতা মেডিকিট করপোরেশনকে নিয়ম লঙ্ঘন করে কাজ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ১১, ১২ ও ১৩ নম্বর প্যাকেজে উন্নত প্রযুক্তি ও উচ্চ গুণগত মানসম্পন্ন যন্ত্রপাতি কেনাকাটার কথা বলা হয়। সেখানে বাধে বিপত্তি। পিপিআর অনুসারে এসব দরপত্রে অংশ নিতে হলে এককভাবে অন্তত ৭০ ভাগ কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়।
হাসপাতালের কেনাকাটার ১১ নম্বর প্যাকেজে আহ্বানকৃত দরপত্রে প্রাক্কলিত মূল্য ৪৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার কাজের সরবরাহের অভিজ্ঞতা ৭০ ভাগ হিসেবে একক চুক্তিমূল্য ৩৩ কোটি টাকা চাওয়া হয়। সেই হিসেবে ১১, ১২ ও ১৩ নম্বর প্যাকেজে প্রকল্প পরিচালকের পছন্দের ঠিকাদারের অভিজ্ঞতা না থাকায় টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি। তবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ সরবরাহকারী দরপত্রে উন্নত প্রযুক্তি ও উচ্চ গুণগত মানসম্পন্ন স্পেসিফিকেশনের যন্ত্রপাতি সরবরাহের লক্ষ্যে তিনটি প্যাকেজে দরপত্র দাখিল করেন। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করে এবং পিপিআরের শর্ত ভঙ্গ করে পছন্দের ঠিকাদারকে তিনটি প্যাকেজের কাজ পাইয়ে দিতে প্রকল্প পরিচালক দরপত্রটি বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বান করেন।
ফের আহ্বানকৃত দরপত্রের ১১ নম্বর প্যাকেজে তার পছন্দের ঠিকাদারের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী অভিজ্ঞতা সনদ হিসেবে ন্যূনতম একক চুক্তিমূল্য ৩৩ কোটি টাকার পরিবর্তে দুটি চুক্তিতে ২০ কোটি টাকার সরবরাহ কাজের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালের এসকেএইচইউপি জিডি-১৪ (সিএসএসডি) এবং এসকেএইচইউডি জিডি-১৫ (ফার্নিচার) দুটি প্যাকেজের কাজও পছন্দের ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বঞ্চিত করা হয়েছে সর্বনিম্ন দরদাতাকে। ১৪ নম্বর প্যাকেজে মোট চারটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। তার মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল ক্রমানুসারে মেডিস্কয়ার লিমিটেড, এইচটিএমএস, নিউ ভিশন মেডিসিস্টেম। কিন্তু এদের বাদ দিয়ে সর্বোচ্চ দরদাতা মেডিকিট করপোরেশনকে কাজ দেওয়া হয়েছে।
একাধিক দরদাতা জানান, মেডিকিট করপোরেশন করোনার সময় কভিড টেস্টের কিট সরবরাহ করত। সেই সময় তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তারা কখনো হাইটেক যন্ত্রপাতি কোনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করেনি। এরপরও অনভিজ্ঞ এই প্রতিষ্ঠানকে একের পর এক কাজ পাইয়ে দিতে উঠেপড়ে লেগেছেন প্রকল্প পরিচালক শরীফ মো. ফরহাদ হোসেন।
অভিযোগ উঠেছে, এর আগে অনভিজ্ঞ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বেশ কয়েকটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে হাইটেক মেডিকেল যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে। তাদের সরবরাহ করা এমআরআই, সিটি স্ক্যান, ডিজিটাল এক্স-রেসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এ কারণে আশঙ্কা করা হচ্ছে, সরকারি কর্মচারী হাসপাতালেও এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের (নিমিউ অ্যান্ড টিসি) টেকনিক্যাল ম্যানেজার (ট্রেনিং) এবং সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল সম্প্রসারণ প্রকল্পের টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এম এন নাশিদ রহমান কালবেলাকে বলেন, যন্ত্রপাতি কেনাকাটার স্পেশিফিকেশন নিয়ে কোনো জটিলতা কিংবা মানের প্রশ্ন হলে বিষয়টি আমরা তদারকি করি। এর বাইরে দরপত্রের শর্ত পরিবর্তন কিংবা পরিমার্জনের এখতিয়ার আমাদের নেই। দরপত্রের সবকিছু দেখভাল করেন প্রকল্প পরিচালক।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক শরীফ মো. ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে দেখা করতে গতকাল বুধবার সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। এরপর তার ব্যক্তিগত নম্বরে ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। পরে তার ব্যক্তিগত নম্বরে খুদেবার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু তার সাড়া পাওয়া যায়নি।