সোমালি জলদস্যুদের হাত থেকে মুক্ত জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহ প্রায় এক মাস পর গতকাল সোমবার দুপুরে বাংলাদেশের জলসীমায় এসে পৌঁছেছে। জাহাজটি সন্ধ্যায় নোঙর করে বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়ায়। এ তথ্য জানিয়েছেন কবির গ্রুপের (কেএসআরএম) মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম।
মিজানুল ইসলাম জানান, জাহাজটি গতকাল বিকেলে কুতুবদিয়ায় ভেড়ে; কিন্তু নাবিকদের তীরে আনা হবে আজ মঙ্গলবার বিকেল ৪টায়। তাদের লাইটার জাহাজে আব্দুল্লাহ থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের সদরঘাট কেএসআরএম জেটিতে নিয়ে আসা হবে।
এমভি আব্দুল্লাহ জাহাজের মাস্টার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আবদুর রশিদ বলেন, কুতুবদিয়ায় নোঙর করার কারণ হলো, এত বড় জাহাজ বন্দর জেটিতে ভেড়ানোর সুযোগ নেই। জাহাজটিতে ৫৬ হাজার ৩৯১ টন চুনাপাথর রয়েছে। এতে জাহাজটির ড্রাফট (পানির নিচের অংশের দৈর্ঘ্য) বেড়ে হয়েছে সাড়ে ১২ মিটার, যা চারতলার সমান। ফলে বন্দর জেটিতে এটি ভেড়ানো সম্ভব হবে না।
গত ৩০ এপ্রিল ভোর ৪টার দিকে জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিনা সাকার বন্দর থেকে ৫৬ হাজার ৩৯১ টন চুনাপাথর নিয়ে দেশে রওনা দেয় বলে জানিয়েছেন কবির গ্রুপের মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম।
কেএসআরএম সূত্র জানিয়েছে, আজ নাবিকদের জেটিতে বরণ করার জন্য কেএসআরএমের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন। তারা ফুল দিয়ে বরণ করে নেবেন। নাবিকদের স্বজনদের কেউ কেউ এ সময় জেটিতে উপস্থিত থাকবেন বলেও জানা গেছে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত কালবেলার কক্সবাজারের পেকুয়া প্রতিনিধি এস এম জুবাইদ বলেন, জাহাজের ২৩ নাবিক পুরোপুরি সুস্থ আছেন। কুতুবদিয়ায় কিছু মালপত্র খালাস শেষে বুধবার এমভি আব্দুল্লাহ চট্টগ্রাম বন্দরের সদরঘাটে পৌঁছাবে বলে জানা গেছে।
পরিবারে চলছে নানা আয়োজন
দীর্ঘ অপেক্ষার পর আজ বাড়ি ফিরবেন এমভি আব্দুল্লাহ জাহাজের ২৩ নাবিক। এজন্য ২৩ নাবিকের পরিবারে চলছে নানা আয়োজন। নিজ নিজ পরিবারে নাবিকদের জন্য চলছে পছন্দের রান্নাও।
এমভি আব্দুল্লাহ জাহাজের প্রধান কর্মকর্তা মো. আতিক উল্লাহ খানের স্ত্রী ফিরোজা আজমিন মিনা। নাবিকদের আসার খবর নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এতদিন অপেক্ষায় ছিলাম কবে দিনটি আসবে। অবশেষে ঘনিয়ে এসেছে। সোমবার সকালেও তার সঙ্গে কথা হয়েছে। বলেছে, আগামীকাল (আজ) বিকেলের দিকে বাড়ি ফিরবে। আমার কী যে আনন্দ লাগছে, তা বলে বোঝাতে পারব না।’
তিনি বলেন, ‘দুই মাস ধরে তার বাড়ি ফেরার দিনটি অপেক্ষায় ছিলাম। আমাদের তিন মেয়ে ফাতিমা, উনাইজা ও খাদিজাও অনেক খুশি। আতিক আগেও জাহাজে গিয়েছিল। বেশ কয় মাস পরপর বাড়ি ফেরে। তখন এমন মনে হয়নি, স্বাভাবিক ছিল। তার এবারের ফেরাটা আমাদের মাঝে অন্যরকম এক আনন্দ নিয়ে আসছে।’
জাহাজটিতে থাকা নাবিক নুর উদ্দিনের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘এত বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে দেশে ফিরছে, কেমন লাগছে তা বলে প্রকাশ করতে পারব না। আমিও সদরঘাটে যাব, তাকে রিসিভ করতে। এরপর তাকে সঙ্গে করে বাড়ি নিয়ে আসব।’
তিনি বলেন, ‘এর আগেও সে জাহাজে কাজ শেষে দেশে ফিরেছে। আমরা কখনো বিমানবন্দর আবার কখনো চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন জেটি থেকে তাকে রিসিভ করেছি। এবারের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। তারা এক মাস দস্যুদের কবলে জিম্মি ছিল। এরপর মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরছে। নুর উদ্দিন দেশে আসছে, এজন্য তার পছন্দের সব খাবার রান্না করা হচ্ছে। সে মিষ্টি, কেক, পায়েস, গরুর মাংস খেতে পছন্দ করে। তার পছন্দের সব খাবার আমি একে একে রান্না করছি।’
জাহাজের থার্ড ইঞ্জিনিয়ার মো. রোকন উদ্দিনের বড় ভাই সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘২০১৮ সাল থেকে রোকন জাহাজে কর্মরত। এত বড় বিপদে কখনো পড়েনি। আমাদের বাড়ি নেত্রকোনা জেলায়। তিন ভাইয়ের মধ্যে সে সবার ছোট। অফিস থেকে বলেছে, আজ দেশে ফিরবে। এরপর বাড়িতে আসবে। আমার ছোট ভাই এত বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে দেশে ফিরছে, এটা আমাদের জন্য সত্যি আনন্দের।’
এমভি আব্দুল্লাহ গত ৪ মার্চ আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিকের মাপুটো বন্দর থেকে কয়লা নিয়ে যাত্রা করে। ১৯ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাতের হারমিয়া বন্দরে পৌঁছানোর কথা ছিল। এর মধ্যে ১২ মার্চ দুপুর দেড়টার দিকে ভারত মহাসাগরে সোমালিয়ান জলদস্যুদের কবলে পড়ে জাহাজটি। মুক্তিপণের বিনিময়ে এক মাস পর গত ১৩ এপ্রিল বাংলাদেশ সময় রাত ৩টায় মুক্তি পায় জাহাজসহ ২৩ নাবিক। মুক্তির পর জাহাজটি দুবাইয়ের উদ্দেশে রওনা দেয়। ২১ এপ্রিল বিকেল সাড়ে ৪টা নাগাদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের আল হারমিয়া বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছে। জাহাজটিতে থাকা ৫৫ হাজার টন কয়লা সেখানে খালাস করা হয়। পরবর্তী সময়ে আমিরাতের মিনা সাকার বন্দর থেকে ৫৬ হাজার টন চুনাপাথর লোড করা হয়। এসব পণ্য নিয়ে দেশের পথে রওনা দেয় এমভি আব্দুল্লাহ।