দেশের ইতিহাসে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার কবলে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলার দুর্গত অঞ্চলগুলোয় এরই মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে মানবিক বিপর্যয়। অসংখ্য মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। এখনো পানিবন্দি লাখ লাখ মানুষ। তবে মানুষের বিপর্যয়ে মানুষ যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তা এক কথায় অভাবনীয়। সারা দেশের মানুষ দুর্গতদের জন্য যে পরিমাণ ত্রাণ ও তহবিল গঠনে সহযোগিতা করছেন, সেটাও অভূতপূর্ব। তবে অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, নানাবিধ কারণে এসব সহযোগিতা বন্যার্তদের অনেকের কাছেই পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। অনেক জায়গায় পরিস্থিতি এমনই ভয়াবহ, কোথাও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন আবার কোথাও নৌযানের অভাব। আর স্বভাবতই এত বড় বিপর্যয় সামলাতে যে সমন্বয়হীনতার সৃষ্টি হয়—এ ক্ষেত্রেও কিছুটা লক্ষণীয়। সব মিলিয়ে দূরদূরান্তে খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পৌঁছানোয় বাধাগ্রস্ত হতে হচ্ছে। অনেক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে পানিবাহিত নানা রোগব্যাধি।
রোববার বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ত্রাণ না পাওয়ার খবর এসেছে। এসব প্রতিবেদন বলছে, এ পর্যন্ত ১৮ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৫১ লাখ এবং এখনো পানিবন্দি অগণিত মানুষ। কুমিল্লায় গোমতী নদীর বাঁধ ভাঙায় সড়কে আশ্রয় নেওয়া বুড়িচং উপজেলার বুড়বুড়িয়া এলাকার বাসিন্দা মতিন মিয়া গণমাধ্যমকে বলেছেন, পরিবার নিয়ে সড়কের ওপরে আছি। ঘরবাড়ি সব শেষ। অনেকে ত্রাণ নিয়ে আসেন, ত্রাণ পাচ্ছি। কিন্তু এলাকার ভেতরে আমার বোন-ভাগ্নিরা আছে। তাদের কাছে কেউই যাচ্ছেন না।’ মতিন মিয়ার মতো প্রত্যন্ত এলাকার অনেক পানিবন্দি মানুষের কাছেই কোনো সহায়তা পৌঁছায়নি; বিশেষ করে ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের প্রত্যন্ত এলাকায় ত্রাণের জন্য তৈরি হয়েছে হাহাকার। স্থানীয়রা বলছেন, নৌকার সংকটে ত্রাণ দিতে আসা লোকজন প্রত্যন্ত এলাকায় যেতে পারছেন না। সড়কের পাশে যাদের পাওয়া যাচ্ছে, তাদের মধ্যেই বারবার ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। বিপুল পরিমাণ ত্রাণ যাচ্ছে। কিন্তু সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা এবং পর্যাপ্ত নৌযানের অভাবে দূরদূরান্তে আটকে পড়া বানভাসিদের কাছে খাবার পৌঁছানো যাচ্ছে না। এ ছাড়া লাখো মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারেননি। তারা বাড়ির ছাদ বা উঁচু স্থানে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর সময় কাটাচ্ছেন। উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও ভারি বৃষ্টিতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ এ বন্যার পানি বেশকিছু জায়গায় কমতে শুরু করলেও কিছু জায়গায় গতকালও ছিল ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস। বন্যায় ভেসে যাওয়া মানুষের অসহায়ত্ব ও দীর্ঘশ্বাসে বাতাস ভারি হলেও ইতিবাচক দিক, মানুষ দাঁড়িয়েছে মানুষের পাশে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বন্যার্ত মানুষকে সহযোগিতা করতে গতকাল চতুর্থ দিনের মতো গণত্রাণ সংগ্রহ করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এত পরিমাণ সহযোগিতা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে যাচ্ছেন মানুষ, সেখানে জায়গায় সংকুলান হচ্ছে না। ফলে রোববার ত্রাণসামগ্রী জমা নেওয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্রে। তবে কেউ নগদ অর্থসহায়তা ও জরুরি ওষুধ দিতে চাইলে তা নেওয়া হচ্ছে টিএসসির ফটকে স্থাপিত বুথে। অর্থাৎ ত্রাণের সংকট হয়তো নেই। সংকট কিছু যা রয়েছে, তা পৌঁছে দেওয়ায়; যা এ মূহুর্তে সহজ কাজ নয়।
আমরা মনে করি, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি দরকার খাবার, বিশুদ্ধ পানি, শুকনা কাপড়, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র শতভাগ বন্যার্তদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আরও গুরুত্বপূর্ণ—এখনো যারা আটকে আছেন, যাদের আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া সম্ভব হয়নি, তাদের কাছে ত্রাণ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে পুরোপুরি সমন্বয় রক্ষা করা কঠিন হলেও সবার কাছে ত্রাণ পৌঁছানো নিশ্চিত করতে যথাসম্ভব সমন্বয় রক্ষা জরুরি। আর পরিস্থিতির উন্নতির দিকে গেলেই দরকার হবে পুনর্বাসনের—যার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।