সুখী ও সুন্দর পরিবার গড়তে নারী-পুরুষ উভয়ের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘কোন কালে একা হয়নি ক’জয়ী পুরুষের তরবারি, প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয় লক্ষ্মী নারী।’ বর্তমানে নারীরা শুধু প্রেরণা জোগান না, লড়াইও করেন। আগে ধরে নেওয়া হতো নারীরা করবেন শুধু ঘরের কাজ। কিন্তু সে চিত্র এখন বদলেছে। গ্রাম হোক কিংবা শহর, নারীরাই এখন পরিবারের মূল চালিকাশক্তি। দুঃখের বিষয় হলো, যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে পরিবার টিকে থাকে, সমাজ এগিয়ে যায়, তারা বরাবরই পরিবার, কর্মক্ষেত্রে, সমাজ—সর্বত্রই যেন অবহেলার শিকার।
ভোরের কুয়াশা জড়িয়ে শহর যখন থাকে গভীর ঘুমে, ঠিক তখন থেকেই শুরু হয় কর্মজীবী নারীদের জীবন-সংগ্রাম। সবার জন্য খাবার তৈরি, সন্তানের যত্ন নেওয়া, নিজের কাজের জন্য তৈরি হওয়া—সবকিছু সামলে ঠিক সময়ে অফিসে পৌঁছানো। অফিসের চাপে ক্লান্ত মা, কিন্তু ঘরে ফিরেও তার শান্তি নেই। সন্তানের পড়াশোনা, সংসারের খুঁটিনাটি, সবার যত্নআত্তি—এ যেন এক চক্রাকার দায়িত্বের অমোঘ নিয়ম। ক্লান্ত হলেও মায়ের মুখে কোনো অভিযোগ নেই। সন্তান ও পরিবারে হাসিই যেন তার একমাত্র প্রাপ্তি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এখনো লিঙ্গবৈষম্য পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্র—সর্বত্রই বিরাজমান। কর্মজীবী নারীদের শারীরবৃত্তীয় চাহিদা বা অসুবিধাগুলো নিয়ে এখনো বেশিরভাগ জায়গায় কোনো মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নেই। ঋতুকালীন, মাতৃত্বকালীন বা মাতৃত্ব-পরবর্তী কোনো সময়ই তাদের জন্য আলাদা কোনো সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় না। বেতনবৈষম্যও এখনো প্রবল।
এই তো গেল শহুরে কর্মজীবী নারীদের গল্প। গ্রামীণ বা নিম্নবিত্ত পরিবারের মায়েদের সংগ্রাম আরও তীব্র। দিনমজুরের কাজ, গৃহস্থালি, সন্তান লালনপালন—সবকিছু একাই সামলে নিতে হয় তাদের। অন্যদিকে, যারা কর্মজীবী নন, তাদের জীবন-সংগ্রাম আরও বেশি জটিল। কর্মজীবী নারীদের যেমন কাজের ক্ষেত্র ধরে তাদের একটা পরিচয় থাকে, গৃহিণী নারীদের ক্ষেত্রে তেমন থাকে না এবং তাদের কাজের কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই, নেই কোনো ছুটি। কিন্তু গৃহস্থালি কাজের বিনিময়ে কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না বলে এগুলোকে মূল্যহীন বা অদৃশ্য কাজ হিসেবে গণ্য করা হয় সমাজে এবং সেইসঙ্গে নারীকেও মূল্যহীন বলে ধরে নেওয়া হয়! অথচ তাদের অমূল্য শ্রমের বিনিময়ে যুগ যুগ ধরে টিকে আছে আমাদের পরিবার বা সামাজিক কাঠামো। নারীর গৃহস্থালি কাজের আর্থিক মূল্যায়ন না হলেও কিছু গবেষণায় এটি জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে বলে প্রমাণিত হয়েছে। ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের (২০১৩) এক গবেষণায় দেখা গেছে, গৃহিণী নারী বিনামূল্যে যেসব গৃহস্থালি কাজ করেন, সেগুলোর আনুমানিক মূল্য বছরে ২২৭.৯৩ থেকে ২৫৮.৮২ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। এ অবদান জাতীয় আয়ের সঙ্গে যোগ করলে নারীর অবদান ২৫ থেকে ৪১ শতাংশে উন্নীত হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যে উঠে এসেছে, কর্মজীবী নারী ঘরের কাজসহ পুরুষের তুলনায় তিনগুণ বেশি পরিশ্রম করেন। তবে এ কাজের বেশিরভাগই থেকে যায় অদৃশ্য। এই গৃহস্থালি শ্রমের কোনো আর্থিক মূল্যায়ন নেই। নেই সামাজিক স্বীকৃতি। সামাজিক রীতিনীতি, পরিবারের শর্ত, কর্মক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জ—সবকিছুর মধ্যেই তাকে টিকে থাকতে হয়। তবু নারীরা কাজ থামান না। কারণ তাদের কাজ বন্ধ হয়ে গেলে থমকে যাবে ঘরের, এমনকি সমাজেরও চাকা। এ সময়ে এসে যেহেতু আমরা একটি সুন্দর ও বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখছি, তাই নারীর সমতা, মর্যাদা এবং অধিকার নিশ্চিত করা সময়ের অপরিহার্য দাবি। একটি সুন্দর ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্নপূরণ করতে হলে এখনই সচেতন হতে হবে। নারীর মতামতকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব দেওয়া, ঘরের কাজে সহযোগিতা করা, কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, বেতনবৈষম্য দূর করার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও চাকরিতে নারীর জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে, নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, শ্রম আইন সংস্কার করা এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী নারীর অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। নারীর প্রকৃত অংশগ্রহণ এবং ক্ষমতায়ন ত্বরান্বিত করতে হলে তাকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। সর্বোপরি ব্যক্তিগত সচেতনতা ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের মাধ্যমেই আমরা নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করে একটি সুষম ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারব।
তুহিন চাকমা, শিক্ষার্থী
কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়