পূর্বে প্রকাশিতের পর
জিয়ার আমলে ১৯টি সামরিক অভ্যুত্থান হয়। ১৯৭৭ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত দুই মাসের মধ্যে ১১৪৩ সৈনিককে ফাঁসি দেওয়া হয়। কোর্ট মার্শালের নিয়ম কী? কেন জিয়া তা পরিবর্তন করেছিলেন? ৭ নভেম্বর সিপাহি বিদ্রোহের অসামান্য সাফল্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর অফিসারদের এবং জওয়ানদের মধ্যে প্রবল উচ্চাকাঙ্ক্ষা জাগরূক করে। জওয়ানরা ভাবতে থাকে তারাই দেশের হর্তাকর্তা। জিয়াউর রহমান নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রাখার জন্য সেপাইদের আশকারা দিতে থাকেন। ’৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’ স্লোগান দিয়ে মেজর জেনারেল জিয়াকে তারা প্রধান সেনাপতি পদে পুনঃঅধিষ্ঠিত করেছে এই ভেবে যে, জিয়া তাদের সঙ্গে যে চুক্তি করেছেন, ক্ষমতায় থেকে জিয়া তা পালন করবেন। কর্নেল (অব.) আবু তাহের ও তার বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা জিয়াউর রহমানকে বন্দি থেকে মুক্ত করেন। তাদের দাবি অনুসারে জিয়াউর রহমান ১২ দফা দাবিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন।
কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলো এই যে, ৭ নভেম্বর কর্নেল (অব.) আবু তাহেরের নেতৃত্বে জিয়া মুক্ত হওয়ার পর পরবর্তী সময়ে কর্নেল (অব.) আবু তাহেরের বিচারের যে অভিযোগপত্র তৈরি করা হয়, তার মধ্যে বিশেষভাবে অভিযোগ ছিল ৭ নভেম্বর কর্নেল (অব.) আবু তাহের সৈনিকদের উসকানি দিয়েছে, তাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে এবং হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
কর্নেল (অব.) আবু তাহেরকে ফাঁসি দেওয়ার ফলে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সেপাইদের কাছ একটি কথাই পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, জিয়াউর রহমান একজন বিশ্বাসঘাতক। জিয়া কর্তৃক ১২ দফা স্বাক্ষরিত হওয়ার পর জিয়া এসব দাবির মধ্যে সামান্য বেতন বৃদ্ধি ও ব্যাটম্যানশিপ বাতিল করেন। অন্য সব দাবি জিয়া সতর্কভাবে এড়িয়ে যান।
বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্য ও বাইরে তাদের সমর্থকরা সুযোগ খুঁজতে থাকেন। কর্নেল (অব.) আবু তাহেরের অনুগত ও সমর্থকরা বিপ্লবী পরিষদ গঠন করে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন জিয়াউর রহমানকে সামনে রেখে। কিন্তু জিয়াউর রহমান স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে প্রতিষ্ঠার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাঁবেদার হয়ে পড়েন এবং নিষিদ্ধঘোষিত সাম্প্রদায়িক দলগুলোকে রাজনীতি করার সুযোগ প্রদান করেন। গণবিরোধী ডানপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল ও কায়েমি স্বার্থবাদী শক্তির সঙ্গে আঁতাত করেন। এসবই ছিল ৭ নভেম্বরে অংশগ্রহণকারী সৈনিক সংস্থার চেতনার পরিপন্থি।
জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে রক্ষীবাহিনীকে একীভূত করার পর আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে অনুরূপ এক বাহিনী গঠন করেন। স্পেশাল আর্মড ফোর্স গঠন তাহের অনুগত সৈনিকরা সুনজরে দেখেননি। তাদের সংখ্যা ১২ হাজার ৫০০-তে উন্নীত করা হয়। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র সরবরাহ, ভালো পোশাক ও নতুন গাড়ি দেওয়া হয়। বেতন-ভাতাও ছিল আকর্ষণীয়।
১৯৭৮-এর অক্টোবরে আর্মি ফিল্ড সিগন্যাল ব্যাটালিয়ন সৈন্যরা এক বিদ্রোহের আয়োজন করে। তার সঙ্গে কুর্মিটোলার এয়ার বেস থেকে কয়েকশ এয়ারম্যান এসে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। রাত পৌনে ৩টায় ৭০০ আর্মি ও ২৫ ট্রাকভর্তি বিমান সদস্য কেন্দ্রীয় অর্ডিন্যান্স ডিপো থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ হস্তগত করে। সকাল ৫টায় তারা রেডিও স্টেশন দখল করে বিপ্লবী সরকার গঠনের ঘোষণা দেয়। তারা হাজার হাজার লিফলেট বিতরণ করে, সৈন্যদের বিদ্রোহে যোগ দিতে আহ্বান জানায়। ৭ নভেম্বরে জিয়ার নামে তারা ছিল উন্মাদ; কিন্তু এবার তাকেই তারা বিশ্বাসঘাতক আখ্যায়িত করে তার শাসনের অবসান চায়। ৭ নভেম্বরের মতো তারা রাস্তায় স্লোগান দেয় ‘সিপাহি জনতা ভাই ভাই’।
কিন্তু তাদের বিদ্রোহ পূর্ণতা লাভ করার আগেই সিজিএসের দায়িত্বে নিয়োজিত মেজর জেনারেল মঞ্জুর নির্দেশে নবম ডিভিশনকে বাইপাস করে ঢাকা ব্রিগেড কমান্ডার লে. কর্নেল আমিন আহমদকে এই বিদ্রোহ দমনের ও জিয়াকে রক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। বিদ্রোহীদের সঙ্গে ঢাকা ব্রিগেডের সংঘর্ষ ঘটে। ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানরত জিয়াকে বিদ্রোহীরা খুঁজে না পাওয়ায় অল্পের জন্য তিনি বেঁচে যান। এরই মধ্যে নবম ডিভিশন এগিয়ে আসে এবং বিদ্রোহ দমন করে। বিদ্রোহীরা বিমানবাহিনীর কতিপয় অফিসারকে হত্যা করে। বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণ করার পর জিয়াউর রহমান কঠোর মনোভাব গ্রহণ করেন। সেনাবাহিনীর মধ্যে সন্দেহভাজন সদস্য ও অফিসারদের এবং বিমানবাহিনীর সদস্যদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে, ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেন। এ ব্যাপারে অ্যান্থনি মাসকারেনহাস লিখেছেন, জেনারেল জিয়া এই অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত সৈনিক আর এয়ারম্যানদের ওপর ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য প্রতিশোধ নিয়ে তার মনে প্রজ্বলিত প্রতিহিংসার আগুন নির্বাপিত করেন। সরকারি হিসাবমতে, তিনি ১৯৭৭ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র ১০ মাসের মধ্যে ১১৪৩ (এগারশ তেতাল্লিশ) জন সৈনিককে ফাঁসির দড়িতে লটকিয়ে খুন করেন। তা ছাড়া বহুশত সৈনিককে তিনি ১০ বছর থেকে যাবজ্জীবন পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে জেলে পাঠিয়ে দেন। আইনগত পদ্ধতি আর ন্যায়বিচারের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে তড়িঘড়ি করে এ শাস্তির কাজ সমাপন করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর চেয়ে বড় পৈশাচিক সাজার আর কোনো নজির নেই। তিন থেকে চারজনকে একবারে বিচারের জন্য ডেকে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দেওয়া হতো। জেনারেল জিয়া বসে বসে সেগুলো অনুমোদন করতেন এবং এর পরপরই তাদের ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হতো। উল্লিখিত পদ্ধতির সব কাজই মাত্র ৪৮ ঘণ্টা সময়ে সম্পন্ন করা হতো। তার সহযোগীদের একজন আমাকে জানিয়েছিল, জেনারেল জিয়া প্রেসিডেন্ট আর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দ্বৈত ক্ষমতা কুক্ষিগত করে তার নিজের হাতে লিখে ওইসব হতভাগা সৈনিকের দণ্ডাদেশ অনুমোদন করতেন। বেসামরিক বন্দিরা স্মৃতিচারণ করে বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে জেলখানার রাতগুলো সৈনিকদের আর্তচিৎকারে বিভীষিকাময় হয়ে উঠেছিল। তাদের ফাঁসির মঞ্চে ঠেলে নিয়ে যাওয়ার সময় সৈনিকরা নির্দোষ বলে বুকফাটা চিৎকারে ভেঙে পড়ত। এসব হত্যালীলার জন্য বিমানবাহিনী বা সেনাবাহিনীর কোনো প্রতিষ্ঠিত আইনকানুনকে মেনে চলা হয়নি। বিধি অনুযায়ী, শাস্তির সময়ে শুধু জেনারেল কোর্ট মার্শাল মৃত্যুর দণ্ডাদেশ প্রদান করতে পারেন। জেনারেল কোর্ট মার্শালে কমপক্ষে পাঁচজন মিলিটারি জজ থাকেন। তাদের মধ্যে একজনকে অন্ততপক্ষে লে. কর্নেল হতে হবে এবং বাকি চারজনের কেউই ক্যাপ্টেনের নিচে হতে পারবেন না এবং কমিশন প্রাপ্তির পর ক্যাপ্টেনদের কমপক্ষে তিন বছর চাকরি সম্পন্ন করতে হবে। অভিযুক্তদের তাদের আত্মপক্ষ অবলম্বনের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে হবে। জেনারেল জিয়া দেখলেন যে, এসব নিয়মকানুন তার উদ্দেশ্য সাধনের পথে বিরাট অন্তরায়। সেজন্য একটি মার্শাল ল অর্ডার ঘোষণা করলেন। ওই ঘোষণায় বিশেষ আদালতের নামে এমন কোর্ট তিনি সৃষ্টি করলেন, যেগুলোতে বিচারের জন্য একজন লে. কর্নেলের সঙ্গে হাবিলদার ও তার কাছাকাছি পদমর্যাদার লোকেরা বসতে পারতেন। দ্রুতগতিতে মামলার কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে এভাবেই ব্যবস্থা গৃহীত হলো। এই উপমহাদেশের কোথাও এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে নজির নেই। এক কলমের খোঁচায় জেনারেল জিয়া রাতারাতি দুই ডজনেরও বেশি এ ধরনের কোর্ট সৃষ্টি করলেন। ন্যায়বিচারের কোনো প্রশ্নই সেখানে উঠতে পারে না। বিচারকের লাইসেন্স নিয়ে সৈনিকদের খুন করা হয়েছিল মাত্র। এমন একটি কোর্টের উদাহরণ নিম্নে বর্ণিত হলো। এর নাম মার্শাল ল ট্রাইব্যুনাল নং-১৮, ঢাকা। কেস নং ১/১৯৭৭, তাং-৮ই অক্টোবর, ১৯৭৭ সাল।
সংশ্লিষ্ট জজদের নাম—
১। লে. কর্নেল কাজী সলিমুদ্দিন মো. শাহারিয়ার।
২। সুবেদার মো. আবদুল হালিম।
৩। নায়েক সুবেদার আবদুল হাকিম।
৪। হাবিলদার আনোয়ার হোসেন।
৫। হাবিলদার এম এফ আহমেদ।
১৯৭৭ সালের ১ ও ২ অক্টোবর রাতে বিদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্তরা ছিল—
১। ৬২৭৮০২৮ নায়েক এনামুল হক।
২। ৬২৮৪৫৪ সিগন্যাল কাজী সাইদ হোসেন।
৩। ৬২৮১১৮৬ নায়েক আবদুল মন্নান।
৪। ৬২৮৪৭৩৬ সিগন্যালার এস কে জাবেদ আলী।
তারা সবাই নিজেদের নির্দোষ বলে প্রমাণ করতে চায়; কিন্তু এর কোনো উপায় ছিল না। তিনজন অভিযোগকারী, সুবেদার সিরাজুল ইসলাম, নায়েক আবুল বাসার এবং ল্যান্স নায়েক আবদুল আলী দৌড়ে এসে উপস্থিত হয়ে যায়। অভিযুক্তদের পক্ষে কোনো সাক্ষী ইত্যাদি ছিল না। একজন সাক্ষী সাক্ষ্য দেয় যে, সে দোষী ব্যক্তিদের অস্ত্রাগারে ঢুকে রাইফেল নিয়ে একটি আর্মির গাড়িতে উঠে চলে যেতে দেখেছে। আর একজন অভিযুক্তদের ব্যারাকের বারান্দায় দৌড়াদৌড়ি করতে দেখেছে। তাদের কেউ ‘বিদ্রোহ’ শুরু হয়ে গেছে বলে চিৎকার করেছিল। অভিযুক্তদের একজন বলে, সে ব্যারাকের সবার শেষে ঘুম থেকে জেগে ছিল এবং সে সম্পূর্ণভাবে নিরপরাধ আর একজন অভিযুক্ত বলে যে, চিৎকার শুনতে পেয়ে অন্যদের সঙ্গে অস্ত্রাগার থেকে সেও রাইফেল হাতে নিয়েছিল; কিন্তু তারপরই সে দেখতে পায় যে, কোথাও কোনোরকম যুদ্ধ বেধে যায়, সুতরাং সে তার অধিনায়কের নির্দেশে পরে অস্ত্র জমা দিয়ে দেয়। এসব সাক্ষী-প্রমাণ আর অভিযুক্তদের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে বিশেষ সামরিক আদালত চারজনের সবাইকে দোষী বলে সর্বসম্মতিক্রমে রায় দেন এবং মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদান করেন। পরদিন ৯ অক্টোবর, স্বয়ং জেনারেল জিয়া ওইসব মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদন করে মন্তব্য দেন—‘যতক্ষণ পর্যন্ত ওরা না মরে’ ততক্ষণ পর্যন্ত ওদের গলায় ফাঁসি লাগিয়ে ঝুলিয়ে রাখো। এই চারজন হতভাগাকে ১০ অক্টোবর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। বিচারের নামে প্রহসন চলতে থাকে। বিদ্রোহীদের মরণ চিৎকারে কারাগারে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। সে সময় কারাগার থেকে বেগম সুফিয়া কামালের উদ্দেশ্যে বিদ্রোহীরা একটি চিঠি লিখে পাঠায়। চিঠিটি এখানে উল্লেখ করা হলো। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে নির্যাতিত সৈনিকদের পক্ষ থেকে—
কেন্দ্রীয় কারাগার, ঢাকা ২২-১০-৮১
মা,
আপনি আমাদের সশ্রদ্ধ সালাম গ্রহণ করুন। গতকল্য প্রকাশিত সংবাদ পত্রিকায় আপনার অতি মূল্যবান ও হৃদয়গ্রাহী বিবৃতিখানা পড়ে আমরা খুবই প্রীত হয়েছি। বাংলাদেশের সকল মা ও বধূদের পক্ষ থেকে আপনি সদাশয় সরকারের কাছে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অফিসারদের জীবন ভিক্ষা চেয়েছেন। আপনি স্নেহময়ী মায়ের যোগ্যতম কাজই করেছেন। আপনার এহেন গৌরবময় ভূমিকার জন্য আমরা সত্যই গর্বিত। জাতি আপনার ন্যায় মমতাময়ী বিদুষী মহিলা পেয়ে গর্ববোধ করবেই।
কিন্তু মা, আপনি কি জানেন ১৯৭৭ সালের ২রা অক্টোবরে ঢাকা সেনানিবাসে সংঘটিত দুঃখজনক ঘটনার প্রেক্ষিতে কতজন সৈনিককে ফাঁসির রজ্জতে প্রাণ দিতে হয়েছে? আপনি কি জানেন কত অভাগী মায়ের প্রাণপ্রিয় সন্তানকে ওরা বেয়নেট নিয়ে খুঁচিয়ে, গুলি করে, বৈদ্যুতিক শক দিয়ে, রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে? আপনি কি জানেন, কত শত সৈনিক এখনো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মাথায় নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে দিনে দিনে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? আপনি কি জানেন মৃত ও জীবিত (বন্দি) সৈনিকদের পরিবারের সদস্যরা আজ পথের ভিখারি, পেটের জ্বালায় অনেকেই আজ ইজ্জত বিক্রয় করতে বাধ্য হচ্ছে?
মাগো, আমরা এতই অসহায়—আমাদের কথা কেউ বলে না। আমাদের জীবনের মূল্য কারও কাছে নেই। ’৭৭-এর ওই ঘটনার পর অনেককে দেখেছি মিছিল করে বলতে ‘ওদের ফাঁসি দাও’, কিন্তু আমরা কী অপরাধ করেছিলাম তা জানতে কেউ চাইল না। সত্যই কি সেদিন কেউ ক্ষমতা দখলের চেষ্টা বা জিয়াকে হত্যা করতে চেয়েছিল। না হয় তর্কের তীরে ধরেই নিলাম আমরা জিয়াকে হত্যা করতে চেয়েছিলাম; কিন্তু এখন তো জিয়াকে হত্যা করাই হয়ে গেল, হত্যাকারীদের বাঁচিয়ে রাখাটা যদি মানবতা হয়, তবে যারা হত্যা করতে চেয়েছিল কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে, তাদের মধ্যে থেকে ৪২৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৩৫০ জনকে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দেওয়া কোন মানবতা? মাগো, আপনি কি ওই সৈনিকদের বিধবা পত্নী ও এতিম শিশুদের কান্না শুনতে পান না? নিশ্চয়ই পান। আমরা দৃঢ় আশা পোষণ করি, আপনি এদের কথাও বলবেন। চট্টগ্রাম বিদ্রোহের অভিযুক্তরা সকলেই অফিসার এবং তারা সকলেই বড় ঘরের সন্তান, তাদের কথা আজ সকল মহল থেকে বলা হচ্ছে। তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আমাদের সবিনয় আবেদন মাত্র এই, সেইসঙ্গে আমাদের অসহায় পরিবারবগের্র কথাও যেন বলা হয়। আজ ৪ বছর জেল খেটে আমাদের আর কিছুই নেই। মানসিক দুশ্চিন্তায় এবং বিভিন্ন সময়ের কারা-নির্যাতনের ফলে আমাদের মধ্যে এমনও আছেন, যার ৫৫ বৎসর বয়স। ৮টা ছেলেমেয়ে রেখে এসেছেন। ঘরে এক মুষ্টি চাউল রেখে আসতে পারেননি।
আমরা আপনার কাছে আবেদন করছি মা, আপনি এ সরকারকে জিজ্ঞাসা করুন, দীর্ঘ বৎসর কারা-যন্ত্রণা কি আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়? আমরা কি এতই সাংঘাতিক? যদি এতই সাংঘাতিক হয়ে থাকি তবে আমাদের একই মামলার আসামি ৩১নং বিশেষ সামরিক আদালতে প্রথমে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, পরে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি গাজী গোলাম মাওলা ও আমীর হোসেনকে ১০ বৎসর সাজা মাফ করে দিয়ে মুক্তি দেওয়া হলো কী করে? ওদের প্রতি মানবতা দেখানো হলো। আমাদের প্রতি এমন বিমাতাসুলভ আচরণ কেন? একটা মিউটিনি মামলার সর্বোচ্চ সাজাপ্রাপ্ত দুজনকে যদি ক্ষমা করা যায়, তবে আমাদের বেলায় বাধা কোথায়, তা আমরা বুঝতে পারছি না। আমরা অবশ্য ওই দুই ভদ্রলোকের ন্যায় মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করতে পারব না।
আপনি কবি, আপনি মা, আপনি আমাদের ন্যায় হতভাগ্যদের মনের যন্ত্রণা ভালো করেই বুঝবেন ও মর্মস্পর্শী ভাষায় প্রকাশ করতে পারবেন। আল্লাহ আপনাকে সেই তৌফিক দিয়েছেন। আমাদের কথা বলার জন্য, আমাদের মুক্তি দাবি করার জন্য আমরা বাংলাদেশের এমন কোনো দল, সংগঠক ও ব্যক্তিত্বকে বাকি রাখিনি বলতে পারবেন, আমরা তাদেরকে জানাইনি। কিন্তু কেউ আমাদের কথা বলেন না।
বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে আমরা বর্তমানে প্রায় দেড়শত সৈনিক আছি, যাদের ৬০% জনের সাজা হলো ২০ বৎসর, তারপর ১৫/১৪/১২/১০ বৎসর।
মাগো, আপনি যার হাতে লিখা পড়ছেন, সেই হতভাগ্যের পিতা, পুত্রশোকে কেঁদে কেঁদে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত একবুক হতাশার জ্বালা নিয়ে পরকালে পাড়ি জমিয়েছেন গত ফেব্রুয়ারিতে। এবার নিশ্চয়ই আমাদের যন্ত্রণার গভীরতা অনুধাবন করতে পেরেছেন। অতএব, আপনাকে আর বিরক্ত করাটা সমীচীন মনে করি না। (শেষ)
তথ্যসূত্র : জেনারেল জিয়ার রাজত্ব—অধ্যাপক আবু সাইয়িদ।
লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক
মন্তব্য করুন