কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:২০ এএম
আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:৫৩ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

পাকিস্তানের রাজনীতি থেকে শিক্ষণীয়

মেজর (অব.) ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ
পাকিস্তানের রাজনীতি থেকে শিক্ষণীয়

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রবাদ পুরুষ এবং জার্মানির প্রথম চ্যান্সেলর অটো ভন বিসমার্ক বলেছিলেন, শুধু একজন বোকাই তার নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেয়। বুদ্ধিমানরা অন্যের ভুল থেকে শিক্ষা লাভ করে। সেনাবাহিনীতে তরুণ কর্মকর্তাদের সামরিক ইতিহাস প্রশিক্ষণ পর্বের শুরুতেই বিসমার্কের এই অমর বাণীটি স্মরণ করা হয়। কারণ সামরিক ইতিহাসের যথাযথ পাঠই পারে বিভিন্ন সেনা অভিযানে পূর্বসূরিদের জয়-পরাজয়ের নেপথ্য কারণ জানা, বোঝা, অনুধাবন, মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনের তাগিদে ভবিষ্যতে প্রয়োগের উপায় দেখিয়ে দিতে। রাজনীতিও এদিক থেকে ব্যতিক্রম নয়।

পাকিস্তানের জন্ম আজ থেকে প্রায় ৭৭ বছর আগে। এই ৭৭ বছরে তাদের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন ২৩ জন, যাদের মধ্যে হাতেগোনা দু-একজন ছাড়া বাকি কেউ তাদের মেয়াদের শেষ পর্যন্ত পৌঁছার আগে হত্যাকাণ্ড বা বরখাস্তের শিকার হয়েছেন। সর্বোচ্চ সম্মানপ্রাপ্তরা মিডিয়ার সামনে স্বেচ্ছায় অবসরের কথা বললেও বাস্তবে চাপের মুখে অবসর গ্রহণে বাধ্য হন। ক্ষমতাসীন অবস্থায় বা ক্ষমতা থেকে নামার পর হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া প্রধানমন্ত্রীর তালিকায় আছেন লিয়াকত আলী খান, যিনি ঘাতকের গুলিতে নিহত হন; জুলফিকার আলী ভুট্টো, যাকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। এ ছাড়া রয়েছেন বেনজির ভুট্টো, যিনি গুলি ও বোমার আঘাতে প্রাণ হারান। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন ১৩ জন। এই ১৩ জনের মধ্যে মোহাম্মদ জিয়াউল হক বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। এই দুর্ঘটনা একটি মৃত্যুফাঁদ ছিল বলেই ধারণা করা হয়। দেশ ছেড়ে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন ইস্কান্দর মির্জা ও পারভেজ মোশাররফ আর গৃহবন্দি ছিলেন ইয়াহিয়া খান। পাঁচটি সফল ও তিনটি ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানও পাকিস্তানের রাজনীতিকে কলুষিত করেছে।

পাকিস্তানের রাজনীতিতে যত অঘটন ঘটেছে তার অধিকাংশের নেপথ্যে সাধারণভাবে সেনাবাহিনী এবং সুনির্দিষ্টভাবে সেনা গোয়েন্দাদের ভূমিকা খুঁজে পাওয়া যায়। রাজনীতিবিদদের সক্ষমতা, সততা, প্রজ্ঞা ও সদিচ্ছার অভাবকে পুঁজি করে সেনাবাহিনী পাকিস্তানের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। আবার জনতার শক্তির ওপর আস্থা না রেখে সেনাবাহিনীর কাঁধে ভর করে দেশ পরিচালনা তথা স্বীয় স্বার্থ উদ্ধারের নগ্ন দৃষ্টান্ত রয়েছে পাকিস্তানে। স্বাধীনতা লাভের পর ৭৭ বছরের মধ্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সামরিক জান্তারা দেশ চালিয়েছে ৩০ বছরের বেশি সময় (সূত্র: দ্য ডন, ৯ অক্টোবর ২০২৩)। ২০১৮ সালের পর পাকিস্তানে জেঁকে বসেছে হাইব্রিড ডেমোক্রেসি, যার ফলে নেপথ্যে থেকে সেনাবাহিনী দেশ পরিচালনার নীতিনির্ধারক হয়েছে। ফলে দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমান্বয়ে অচলায়তনে পরিণত হয়েছে। রাজনীতিকে সেনাবাহিনীর প্রভাবমুক্ত রাখার শিক্ষা পাকিস্তান থেকে নেওয়া যায়।

জন্মের পর থেকেই পাকিস্তানের ওপর আমেরিকার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বিশেষত স্নায়ুযুদ্ধকালে ভারতে রাশিয়ার প্রভাবের বিপরীতে ভারতের প্রতিবেশী পাকিস্তানকে কাছে রাখার নীতিতে আমেরিকা বরাবরই অটল ছিল। এ ছাড়া ইরানের সঙ্গে ৯০৯ কিলোমিটার সীমান্ত থাকায় মার্কিন-ইরান দ্বৈরথেও পাকিস্তানকে পাশে পেতে চায় আমেরিকা। অন্যদিকে আমেরিকার জন্য হালের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠা চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সীমান্ত রয়েছে ৫৯৬ কিলোমিটার। ফলে ভূ-রাজনৈতিকভাবে আমেরিকার কাছে গুরুত্বপূর্ণ পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা যদি নিজ দেশের স্বার্থ সঠিকভাবে আদায় করতে পারতেন, তবে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক চেহারা ভিন্ন রকম হতো। বাস্তবে পরাশক্তির কূটচাল আর ব্যক্তিস্বার্থে অন্ধ থাকায় পাকিস্তানের রাজনীতি বিকশিত হয়নি। আর সেই সুযোগে সেনাবাহিনীকে নিজেদের মতো কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে আমেরিকা। এ বিষয়ে ভারতীয় সাংবাদিক এবং দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকার সিনিয়র এডিটর আরমান ভাটনাগার ২০২২ সালের ১৭ এপ্রিল এক প্রবন্ধে লিখেছেন, পাকিস্তানের রাজনৈতিক নীতি বা বিশ্বাসের মূলে রয়েছে আল্লাহ, আর্মি এবং আমেরিকা (ট্রিপল এ)। সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে শুরু করে সিদ্ধান্তের পরিবর্তন, সবক্ষেত্রে নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায় এই তিনটির মধ্যে যে কোনো এক বা একাধিক শক্তি। এই প্রবন্ধের শিরোনাম ‘আল্লাহ আর্মি অ্যান্ড আমেরিকা: হাউ দে ডিকটেইট পাকিস্তানস পলিটিক্স’। দেশের রাজনীতিতে বিদেশি প্রভাবের ভয়াবহ পরিণতি বিষয়ে শিক্ষা লাভের উত্তম উদাহরণ আজকের পাকিস্তান।

পাকিস্তান সৃষ্টির মূলে ছিল এক ধরনের ধর্মীয় চেতনা। বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনাচার ও অর্থনৈতিক অবস্থার তারতম্যকে ভুলে শুধু ধর্মীয় চেতনার ওপর ভিত্তি করে যে একটি জনপদ বা দেশের রাজনীতি চলতে পারে না, তার প্রমাণ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও পূর্ব পাকিস্তানের স্থলে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। এ থেকেও শিক্ষা না নিয়ে পাকিস্তান তার ধর্মীয় উগ্রতাকে বিসর্জন দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আজও পাকিস্তানের মসজিদে, মাজারে কিংবা ঈদগাহে বিস্ফোরণ ঘটে, সেনানিবাসের পাশেই লাদেনদের আশ্রয় মেলে আর সীমান্তে উগ্র আফগান জঙ্গিদের শিবির গড়ে ওঠে। এমন ধর্মীয় উগ্রতা দেশের সাধারণ মানুষ যে সমর্থন করে না, তার প্রমাণ সাম্প্রতিক নির্বাচনে তিনটি মূল ধারায় বিভক্ত ফলাফল। যে কারণে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেউ সরকার গঠন করতে পারছে না বা সরকার গঠিত হলে তার মেয়াদ কত দিন হতে পারে, তা কেউ বলতে পারছে না। ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের পরিণতিও শিক্ষা দেয় পাকিস্তান।

রাজনীতি বিজ্ঞানের ছাত্র এবং গবেষকদের গবেষণার এক ও অনন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে পাকিস্তান। একাডেমিক আলোচনার স্বার্থে সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের নির্বাচন আর বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে একটু ভাবা যায়। ধরা যাক খালেদা জিয়া বা তারেক রহমান নিজেরা দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করতে পারছেন না, যেমনটা ইমরান খানও পারেননি। তার পরও ইমরান খানের মতো বিএনপি হাইকমান্ড নিজ দলের ১৫০-২০০ জন আর জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্য জোট, হেফাজতসহ সমমনা অন্যদের মধ্য থেকে ১০০-১৫০ জনকে নিয়ে মোট ৩০০ আসনে স্বতন্ত্র নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এবার আওয়ামীবিরোধী সব শক্তি এই ৩০০ জনের পেছনে সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামলেন। এরপর কি হতো? এই প্রশ্নের উত্তর লেখার শুরুতেই আছে, যা বলে গেছেন বিসমার্ক।

লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

Email: [email protected]

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

এক্সপ্রেসওয়েতে ৪ বাসের সংঘর্ষ

নিয়ম পরিবর্তন করে নির্বাচন দেন, আপত্তি থাকবে না : হাসনাত

তিন দাবিতে প্রাথমিক শিক্ষকদের মহাসমাবেশ চলছে

নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে যেমন হতে পারে বাংলাদেশের একাদশ

নাক ও চোয়ালের হাড় ভেঙে গেছে নুরের, মেডিকেল বোর্ড গঠন

মানুষ ঘুমের মধ্যে কেন হাসে, কী করণীয়

জাপার কার্যালয়ের সামনে পুলিশের সতর্ক অবস্থান

শাহ পরাণের মাজারে শিরনি বন্ধ হবে, দরবার ভাঙবে : মেঘমল্লার বসু

বাড়ি বেচে দিলেন সোনু সুদ

বাইচের নৌকা ডুবে নিহত ২

১০

মার্কিন আদালতে ট্রাম্পের বেশিরভাগ শুল্ক অবৈধ ঘোষিত

১১

বায়ুদূষণে চ্যাম্পিয়ন কামপালা, ঢাকার অবস্থান কত

১২

সব সময় ক্লান্ত লাগার ৫ সাধারণ কারণ

১৩

পরীক্ষামূলকভাবে আজ শুরু স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল

১৪

ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়েছে তুরস্ক

১৫

দেশে কত দামে স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে আজ

১৬

সারা দেশে গণঅধিকার পরিষদের বিক্ষোভ আজ

১৭

রাজনীতি ছেড়ে অভিনয়ে ফিরছেন কঙ্গনা

১৮

স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে জনগণকে সোচ্চার হতে হবে : নীরব

১৯

ওরিকে স্বামী বললেন জাহ্নবী

২০
X