শনিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১৫ ভাদ্র ১৪৩২
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৩, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৩, ০১:৫৬ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজার নিবন্ধ

ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক সমাবেশ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা। ছবি: সৌজন্য
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা। ছবি: সৌজন্য

ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বলে আমরা বুঝি যাদের গোষ্ঠীবদ্ধতার মূলে রয়েছে শুধুই মুনাফার সম্পর্ক এবং এই গোষ্ঠীর কাছে দেশ ও জনগণের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা নেই। আজকের বাংলাদেশে এমন সব ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে, যারা আগের সবাইকে ছাপিয়ে দ্রুত উঠে এসেছে এবং তা অভূতপূর্ব। এরকম কয়েকটি গোষ্ঠীর হাতে ভোগ্যপণ্যের বাজার এবং তাদের হাতেই জনগণের জীবনমান। তারা পণ্য আমদানি ও বিক্রয় করে এবং তারাই দাম ঠিক করে। অর্থাৎ খেলার মাঠের তারাই খেলোয়াড় এবং তারাই রেফারি। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি কিছুদিন আগে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বাজারে সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব স্বীকার করে বলেছিলেন, ‘সিন্ডিকেটের কথা বলা হয়। এটা ঠিক, বড় বড় গ্রুপ একসঙ্গে অনেক বেশি ব্যবসা করে। আমরা চেষ্টা করি। আমাদের একটা জিনিস লক্ষ রাখা দরকার, আমরা জেলে ভরলাম, জরিমানা করলাম। সেটা হয়তো করা সম্ভব। কিন্তু তাতে হঠাৎ করে ক্রাইসিসটা তৈরি হবে।’

বাংলাদেশে এখন অসহনীয় মূল্যস্ফীতি চলছে। অনেক পণ্যের দাম বিশ্ববাজারে কমলেও বাংলাদেশে কমছে না এবং সেখানে এ সিন্ডিকেটেরই কারসাজি।

এমন এক বাস্তবতায় সম্প্রতি রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে হয়ে গেল ‘স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে বেসরকারি খাতের অবদান, বর্তমান প্রেক্ষাপট ও করণীয়’ শীর্ষক ব্যবসায়ীদের এক সম্মেলন। এতে পাঁচ ঘণ্টা ধরে ব্যবসায়ীদের কথা শুনেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী ব্যবসা-বাণিজ্যসংক্রান্ত অনেক কথাই বলেছেন এবং তার সরকার ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণে কী কী সুবিধা নিশ্চিত করেছে সেগুলো বলেছেন।

ব্যবসায়ীরা অনেকে নিজ নিজ খাতের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরলেও সামগ্রিকভাবে অনেক বেশি রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাই অনেকে বলছেন, এটি ছিল আগামী নির্বাচন সামনে রেখে ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক সমাবেশ। এত সময় দিয়ে ব্যবসায়ীদের কথা শুনেছেন প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু যে আলোচনা হতে পারত সেটা কি করতে পেরেছেন ব্যবসায়ীরা? স্তাবকের মতো শুধু স্তুতিবাক্য উচ্চারণ করে গেছেন অনেকে। ব্যবসায়ীরা যেদিন এ সম্মেলন করলেন সেদিনই পত্রিকায় খবর ছিল যে, ব্যাংক খাতে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ আয়োজিত ‘বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সংকট কেন, সমাধান কীভাবে’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ কথাগুলো বলেছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মইনুল ইসলাম।

মেঘনা গ্রপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল কিছুটা উল্লেখ করলেও সামগ্রিকভাবে ব্যবসায়ীরা প্রধানমন্ত্রীকে কথা দিলেন না যে, তারা ব্যবসার নামে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসবেন।

২০১৮ সালে যে সংসদ নির্বাচন হয় তাতে বিজয়ীদের ৬১ শতাংশই ব্যবসায়ী। আর শুধু রাজনীতিই পেশা যাদের, এমন সদস্য ছিলেন মাত্র ৭ শতাংশ। প্রতিনিধিত্বের বিচারে ব্যবসায়ীদের এবারের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে আগের সব সংসদকে। ফলে ব্যবসায়ীদের সমাবেশ রাজনীতির রূপ পাবে এটাই স্বাভাবিক। মাছের খামারি ও মুরগির খামারি থেকে শুরু করে বড় শিল্পোদ্যোক্তা—সবাই এখন রাজনীতি করেন। বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেছেন, ‘দারিদ্র্য দূরীকরণ ও প্রবৃদ্ধি অর্জনে এক রোল মডেল বাংলাদেশ।’ এটা তো সরকারের সাফল্য। জসিম উদ্দিন ব্যবসায়ীদের নেতা এবং সমাজের দায়িত্বশীল একজন হিসেবে এটাও বলতে পারতেন যে, আজকের বাংলাদেশ ব্যাংক খাতে অপশাসনের মডেল, পণ্যবাজারে দুঃশাসন তৈরির মডেল এবং সেটা কতিপয় অতি সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যবসায়ীর কারসাজি।

ফেডারেশন চেম্বারসহ বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সংগঠন এবং এসবের নেতা ব্যবসা নিয়ে কথা বলেন, তবে অর্থনীতির আলোচনা করেন কম। অর্থনীতিতে এখন যে কয়টা বড় চিন্তার বিষয় রয়েছে, তার মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ অন্যতম। সাধারণত সরকারি বিনিয়োগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। তবে বাংলাদেশে হচ্ছে উল্টোটা। সরকারি বিনিয়োগ দ্রুত হারে বাড়লেও বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে বহু বছর ধরে। প্রধানমন্ত্রীকে যে তারা এতটা ব্যবসায়ীবান্ধব বললেন, তো সরকারি সুবিধা নিয়ে তারা কেন সমানতালে বিনিয়োগ করতে পারলেন না? দেশে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগের হার ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং সেটা প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এক জায়গায় আটকে আছে।

বিনিয়োগ জিডিপির ২৭-২৮ শতাংশে উন্নীত করতে হলে এবং সেটা বছর বছর ধরে রাখতে হলে ব্যবসায়ীদের বড় আকারে বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে হবে। সেটা হচ্ছে কম। নানা কারণে মানুষের একটা ধারণা হয়েছে যে, ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় আর বিদেশে পাচার করে।

বাংলাদেশে বিনিয়োগ নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে এবং একটা প্রথাই হয়ে গেছে যে, কিছু ধনী ও প্রভাবশালীদের মধ্যে সবকিছু আটকে থাকবে। এ গোষ্ঠীকে অলিগার্ক বলা যাবে কি না, এটা অর্থনীতিবিদরা বলবেন। তবে বাস্তবতা হলো, এরা রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে বড়লোক। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পরোক্ষ করের নির্ভরশীলতা অনেক বেশি। পরোক্ষ করের ওপর অধিক নির্ভরশীলতার কারণে প্রতিনিয়ত নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে।

পরোক্ষ কর সমাজের সচ্ছল অংশের তুলনায় নিম্ন আয়ের দরিদ্র মানুষের আয়ের একটি বড় অংশ কেড়ে নিচ্ছে। কারণ যে মানুষের দৈনিক আয় ১০০ টাকা, তার ওপরও পণ্য কেনায় ভ্যাটের প্রভাব ১৫ শতাংশ। আবার যার আয় লাখ টাকা, তারও ওই একই হারে ভ্যাট প্রদান করতে হয়। অর্থাৎ এ পরোক্ষ করের মধ্যে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট দরিদ্রদের প্রতি নিবর্তনমূলক; কারণ ভ্যাট সমাজের একটি সচ্ছল অংশের তুলনায় দরিদ্র মানুষের আয়ের বড় অংশ কেড়ে নেয়। এই ধনী ব্যবসায়ীরা এ সম্মেলনে এ কথাগুলো বলেননি। বলেননি কেন এত উন্নয়নের কথা বলা হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে নিচে। দেশের ব্যবসায়ীরা খুবই প্রভাবশালী। সরকার ব্যবসায়ীবান্ধব এবং সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ী নেতাদের সম্পর্ক বেশ গভীর। তবুও ব্যবসার পরিবেশ উন্নত হচ্ছে না। এত বিশাল শক্তি নিয়ে তারা রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে দরকষাকষি করতে না পারায় প্রতিবছর বিশ্বব্যাংক যে ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ রিপোর্ট প্রকাশ করে, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান শুধু আফগানিস্তানের ওপরে।

ব্যবসায় শুরু করা, ঋণপ্রাপ্তি, বিদ্যুৎপ্রাপ্তি, কর প্রদান, চুক্তির বাস্তবায়ন ইত্যাদি সূচক দিয়ে ১৯০টি দেশের ব্যবসা করার পরিস্থিতি নিয়ে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এর কোনোটিই একজন সাধারণ উদ্যোক্তার জন্য সুখকর নয়।

বড় ব্যবসায়ীরা বিষয়ভিত্তিক সুবিধা নিচ্ছেন বেশি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও নীতি পরিবর্তন না করে। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হলো, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মধ্যে এখন প্রতিযোগিতাপূর্ণ নির্বাচন নেই। তাদের নিজেদেরই জবাবদিহিতার বিষয়টি দুর্বল হয়ে গেছে। কিছু কিছু ব্যবসায়ী, বিশাল সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন। এর মধ্যে কর অবকাশ, লাইসেন্স, নতুন ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যের মাধ্যমে হয়েছে। আগামী দিনে এ রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য না থাকলে সুবিধাগুলো সুরক্ষা করা হয়তো সম্ভব হবে না। তাই তারা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে ব্যবহার করার রাজনীতি বেশি করে আসছেন। ব্যবসা ও রাজনীতির সঙ্গে এক গভীর কলুষিত সম্পর্ক গড়ে ওঠায় সাধারণ নাগরিকরা রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের পার্থক্য বুঝতে পারছেন না।

রাজনীতি এখন বড় ব্যবসা কিংবা ব্যবসাই এখন বড় রাজনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতির সঙ্গে পুঁজিপতিদের আঁতাতের বিষয়টি সারা পৃথিবীতেই কমবেশি দেখা যায়। নির্বাচনে লড়া একটি খরচসাপেক্ষ ব্যাপার, ফলে রাজনৈতিক দলগুলোকে সাদা-কালো অনুদানের ওপর নির্ভর করতেই হয়। কিন্তু বাংলাদেশে রাজনীতি আর ব্যবসা এখন একাকার এবং সেটাও ভিন্নরকম। মাত্র গুটিকয়েক গোষ্ঠী যাবতীয় সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে এবং প্রায় একচেটিয়া ক্ষমতা ভোগ করছে, যা অর্থব্যবস্থার পক্ষে তা ভালো নয়, রাজনীতির পক্ষেও নয়।

লেখক : প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, গ্লোবাল টেলিভিশন

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নুরের ওপর হামলার কড়া প্রতিবাদ ছাত্রদলের

ভারতীয় বক্সারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন হাসান শিকদার

আসিফ নজরুলকে তুলোধুনো করলেন হাসনাত আবদুল্লাহ

২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিল গণঅধিকার পরিষদ

ইংল্যান্ড সফরের জন্য বাংলাদেশ দল ঘোষণা

নিজেদের জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী নেদারল্যান্ডস কোচ

‘মার্চ টু জাতীয় পার্টি অফিস’ ঘোষণা

‘নুরের ওপর হামলা পক্ষান্তরে জুলাই অভ্যুত্থানের ওপর হামলা’

লজ্জাবতী বানরের প্রধান খাদ্য জিগার গাছের আঠা!

নুরের শারীরিক সর্বশেষ অবস্থা জানালেন রাশেদ

১০

আকাশ বহুমুখী সমবায় সমিতি ১৯তম বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত

১১

শ্রীমঙ্গলে পর্যটক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ 

১২

মৌলিক সংস্কার শেষে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে হবে : ডা. তাহের

১৩

২০ বল করার জন্য ৩৪ হাজার কিলোমিটার উড়ে যাচ্ছেন অজি স্পিনার

১৪

সড়কে নিয়ম ভাঙার মহোৎসব / যানজট নিরসনে ভুমিকা নেওয়ায় সুবিধাভোগীদের রোষানলে পুলিশ কর্মকর্তা

১৫

বালু উত্তোলনের লাইভ প্রচার করায় নির্যাতন

১৬

দেয়াল-পিলারে ফাটল, মেঝেও ধসে গেছে সৈয়দপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের

১৭

কাকরাইল রণক্ষেত্র, পুলিশি প্রটোকলে কার্যালয় ছাড়লেন জিএম কাদের

১৮

‘প্ল্যান-বি হলো জাতীয় পার্টির ওপর ভর করে লীগকে ফেরানো’

১৯

নদী ভাঙনের কবলে আশ্রয়ন প্রকল্প ও ৭১ পরিবার

২০
X