কালবেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৫, ০৯:১৯ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

এবার গাজা সিটিকে ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ ঘোষণা

অনাহারেও মৃত্যু বাড়ছে গাজায়
এবার গাজা সিটিকে ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ ঘোষণা

গাজায় ইসরায়েলি হামলার পাশাপাশি অনাহারেও মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে অনাহারে ও অপুষ্টিতে ভুগে আরও পাঁচজন ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে দুজনই শিশু। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছে, এ নিয়ে এখন পর্যন্ত গাজায় অনাহারে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২২ জনে, যাদের মধ্যে ১২১ জনই শিশু। এ ছাড়া গাজায় গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি হামলায় আরও অন্তত ৫৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২২৪ জন আহত হয়েছেন বলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে ২৩ জন প্রাণ হারায় ত্রাণ নিতে গিয়ে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে নতুন করে গাজা শহরকে ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ হিসেবে ঘোষণা করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে গাজায় এখন পর্যন্ত ৬৩ হাজার ২৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন অন্তত ১ লাখ ৫৯ হাজার ৪৯০ জন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, গত ২৭ মে থেকে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক জিএইচএফের মাধ্যমে নতুন ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থা চালু করার পর থেকে এ পর্যন্ত ২ হাজার ২০৩ জন ত্রাণ নিতে গিয়ে নিহত এবং ১৬ হাজার ২২৮ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

আলজাজিরা আরবিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গাজার স্থানীয় হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, শুক্রবার ভোর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৭ জন ত্রাণ নিতে গিয়ে প্রাণ হারান। এ ছাড়া ইসরায়েল মনোনীত তথাকথিত ‘মানবিক অঞ্চল’ আল-মাওয়াসি এলাকায়ও হামলায় বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন।

মানবিক সহায়তায় উন্নতি নেই: এক সপ্তাহ আগে গাজার কিছু অংশে দুর্ভিক্ষ চলছে বলে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার পরেও সেখানে মানবিক সহায়তা প্রবেশের কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি বলে জানিয়েছেন এনজিও নেটওয়ার্কের প্রধান আমজাদ শাওয়াহ। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘গাজার দুর্ভিক্ষের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি এবং এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা মাঠে কোনো বাস্তব প্রচেষ্টা দেখতে পাচ্ছি না। আমরা আশা করেছিলাম, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে অবরোধ তুলে নেওয়ার জন্য বাস্তব হস্তক্ষেপ এবং চাপ আসবে।’ তিনি জানান, দুর্ভিক্ষ ঘোষণার পর থেকে আরও বেশি মানুষ অনাহারে মারা যায় এবং অনেকে অপুষ্টিতে ভুগতে শুরু করেছে। গাজায় এখনো খুব সীমিত পরিমাণ ত্রাণ আসছে, যা এখানকার জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম।

জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফের মতে, গাজা শহরের একটি পুষ্টি কেন্দ্রে শিশুরা অপুষ্টি পরীক্ষা এবং চিকিৎসার জন্য ভিড় করছে। ইউনিসেফের মুখপাত্র টেস ইনগ্রাম আলজাজিরাকে বলেন, ‘স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, দুর্ভিক্ষ গাজা শহরকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করেছে।’ তিনি আরও জানান, শিশুদের অপুষ্টি পরীক্ষা করতে তাদের বাহুর ওপরের অংশ মাপা হচ্ছে। যারা অপুষ্টির দ্বারপ্রান্তে, তাদের প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা হিসেবে উচ্চ-শক্তির বিস্কুট দেওয়া হচ্ছে। আর অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ‘রেডি-টু-ইউজ থেরাপিউটিক ফুড’ দেওয়া হচ্ছে। এটি এক ধরনের পেস্ট জাতীয় খাবার, যা কয়েক সপ্তাহ ধরে খাওয়ানো হয়। তবে ইনগ্রামের মতে, এ থেরাপিউটিক ফুডের চাহিদা অনেক বেশি হলেও এর সরবরাহ খুবই কম।

এদিকে, জাতিসংঘ জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহে গাজা উপত্যকায় প্রায় অর্ধেক মানবিক সহায়তা কার্যক্রম ইসরায়েল বাধাগ্রস্ত করেছে বা বিলম্বিত করেছে। জাতিসংঘের মানবিক সমন্বয় দপ্তরের (ওসিএইচএ) তথ্য উদ্ধৃত করে সংস্থাটির মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বৃহস্পতিবার জানান, গাজার ভেতরে মানবিক কার্যক্রম এখনো বিলম্ব ও বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। এমনকি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ যেসব মিশনের অনুমোদন দিয়েছে, সেগুলো সম্পন্ন করতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লেগে যাচ্ছে।

ডুজারিক জানান, গত বুধবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য করা ৮৯টি প্রচেষ্টার মধ্যে মাত্র ৫৯ শতাংশ কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ শতাংশ প্রাথমিকভাবে অনুমোদন পেলেও পরে বাধাগ্রস্ত হয়েছে, ৮ শতাংশ সরাসরি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে এবং ৭ শতাংশ সংগঠকরা নিজেরাই প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছেন। বাধাগ্রস্ত ২৩টি মিশনের মধ্যে শেষ পর্যন্ত পাঁচটি সম্পন্ন হয়েছে, যার মধ্যে ছিল সীমান্ত থেকে সরবরাহ সংগ্রহ এবং রোগী সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম। তবে বাকি ১৮টি শেষ করা সম্ভব হয়নি।

গাজা শহরকে ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ ঘোষণা ইসরায়েলের: ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা গাজা শহরে তাদের আক্রমণের ‘প্রাথমিক পর্যায়’ শুরু করেছে। তারা অবরুদ্ধ এ অঞ্চলের বৃহত্তম শহুরে কেন্দ্রকে ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ ঘোষণা করেছে এবং সেখানে প্রতিদিনের লড়াইয়ে এতদিন যে বিরতি দেওয়া হতো, তা স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। এ বিরতির সময়ে দুর্ভিক্ষ-কবলিত শহরটিতে মানবিক সহায়তা প্রবেশ করতো। এখন সেই বিরতি দেওয়া না হলে কোনো ধরনের মানবিক সহায়তাই আর পৌঁছানো সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র আভিচাই আদরাই শুক্রবার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে এক পোস্টে বলেন, ‘আমরা অপেক্ষা করছি না। আমরা গাজা শহরে হামলার প্রাথমিক অভিযান এবং প্রথম পর্যায় শুরু করেছি। আমরা বর্তমানে শহরের উপকণ্ঠে ব্যাপক শক্তি নিয়ে অভিযান চালাচ্ছি।’

ইসরায়েলি বন্দির মৃতদেহ উদ্ধার: গাজায় হামাসের হাতে বন্দি থাকা ইসরায়েলি নাগরিক ইলান ওয়েইসের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গোয়েন্দা সংস্থা, বিশেষ বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী শিন বেটের যৌথ মৃতদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয় ইসরায়েল। দেশটির সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ৫৫ বছর বয়সী ওয়েইসের সঙ্গে তার স্ত্রী শিরি ও মেয়ে নোগাকে ধরে নিয়ে যায় হামাসের যোদ্ধারা। তবে পরবর্তী সময়ে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে তার স্ত্রী ও মেয়েকে মুক্তি দিয়েছিল হামাস।

মৃতদেহ উদ্ধারের পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজায় থাকা সব ইসরায়েলি বন্দিকে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা জীবিত এবং মৃত উভয়কেই বাড়িতে ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত বিশ্রাম নেব না বা চুপ থাকব না।’ ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবিলম্বে সব বন্দির মুক্তির লক্ষ্যে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে চালানো হামাসের নজিরবিহীন হামলায় ১ হাজার ১৩৯ জন নিহত হয় এবং ওইদিন ইসরায়েল থেকে ২৫১ জনকে তুলে নিয়ে যায় হামাস যোদ্ধারা। পরে বেশিরভাগ বন্দিকে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে মুক্তি দেওয়া হয়, তবে এখনো ৫০ জন বন্দি গাজায় রয়েছেন, যাদের মধ্যে ২০ জন জীবিত বলে ধারণা করা হয়। হামাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে ইসরায়েল এখনো প্রকাশ্যে কোনো সাড়া দেয়নি, তবে কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, তারা এমন একটি চুক্তিই গ্রহণ করবেন যা সব বন্দির মুক্তি এবং হামাসের আত্মসমর্পণের শর্ত পূরণ করে।

ইসরায়েলি সংশ্লিষ্টতার প্রতিবাদ করায় মাইক্রোসফটের চার কর্মী বরখাস্ত: ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের প্রযুক্তি সহায়তা দেওয়ার প্রতিবাদ করায় প্রতিষ্ঠানটির চার কর্মী চাকরিচ্যুত হয়েছেন। আলজাজিরা জানিয়েছে, বরখাস্ত হওয়া কর্মীরা মাইক্রোসফটের অফিসে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন, যাদের মধ্যে দুজন কোম্পানির প্রেসিডেন্টের অফিসের সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন।

বিক্ষোভকারীদের গ্রুপ ‘নো এ জুর ফর অ্যাপার্থেইড’ এক বিবৃতিতে বলেছে, অ্যানা হ্যাটেল এবং রিকি ফামেলি নামে দুজনকে ভয়েস মেইলের মাধ্যমে জানানো হয় তাদের বরখাস্ত করা হয়েছে। এরপর বৃহস্পতিবার নিসরিন জারাদাত এবং জুলিয়াস শান আরও দুজনকে বরখাস্ত করা হয়।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে অবরোধ

মনখালী এখন ‘কক্সবাজারের সুইজারল্যান্ড’

স্বপ্নধরার ‘প্লট ফার্মিং’ পেল ম্যাড স্টারস-এর গ্র্যান্ড প্রিক্স 

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে শেষ হলো ১০ দিনব্যাপী আলোকচিত্র প্রদর্শনী

জানা গেল লাল টি-শার্ট পরা সেই যুবকের পরিচয়

আসছে রাহাত-রুবাইয়াতের ‘তুমি আমার প্রেম পিয়াসা’

লাল টি-শার্ট পরা যুবক ডিবির কেউ নয় : ডিএমপির ডিবিপ্রধান 

জম্মু-কাশ্মীরে ১১ জনের মৃত্যু

রিউমর স্ক্যানার / নুরকে নয়, অন্য কাউকে পেটাচ্ছিলেন লাল টি-শার্ট পরা ব্যক্তি 

আইনি বিপাকে অঙ্কুশ,আদালতে হাজিরার নির্দেশ

১০

গুগলের নতুন এআই মোড ব্যবহার করবেন যেভাবে

১১

অস্ট্রেলিয়ার রাজ্য দলের কাছে ইনিংস ব্যবধানে হারল বাংলাদেশ

১২

ঘরের সামনে পড়েছিল ছাত্রলীগ নেতার রক্তাক্ত মরদেহ

১৩

নুর ইস্যুতে ভুয়া অডিও নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কঠোর বার্তা

১৪

সপ্তাহে দুদিন ছুটিসহ পপুলার ফার্মায় চাকরির সুযোগ

১৫

নুরের খোঁজ নিলেন প্রধান উপদেষ্টা

১৬

লাল টি-শার্ট পরা যুবককে নিয়ে পোস্ট রাশেদ খানের

১৭

‘স্যার, নাটক আর কত’, আসিফ নজরুলকে নীলা ইসরাফিল

১৮

ভারত সফরে যাচ্ছেন পুতিন

১৯

নুরকে দেখতে গেলেন বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল

২০
X