করোনার পর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নখ্যাত রাজশাহী নগরীতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব অনেক বেড়ে গিয়েছিল। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। এর পর থেকেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নড়েচড়ে বসে রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক)। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেন মেয়রসহ করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। শুরু করেন সচেতনতামূলক নানা কার্যক্রম; চলে অভিযান। এভাবে বছরব্যাপী পরিকল্পিত কর্মসূচির কারণে বর্তমানে রাজশাহী মহানগরী এলাকায় ডেঙ্গু অনেকটা নিয়ন্ত্রণে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাসিকের আইসিটি শাখার তত্ত্বাবধানে করপোরেশনের ওয়েবসাইট ও স্বাস্থ্য বিভাগের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডেঙ্গু নিয়ে সতর্কতামূলক বার্তা দেওয়া হচ্ছে। ফেব্রুয়ারি থেকে নগরীর ৩০ ওয়ার্ডের স্কুল, কলেজ ও পাড়া-মহল্লায় প্রায় দুই লাখ সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ শুরু হয়েছে। এই কার্যক্রম চলবে আগামী জুন পর্যন্ত। চলতি বছরের মার্চ থেকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ওয়ার্ড কাউন্সিলর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে সিটি পর্যায়ে ওরিয়েন্টেশন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এই কর্মসূচিও চলবে জুন পর্যন্ত।
সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ সূত্র জানায়, নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে একজন স্বাস্থ্য সহকারীর নেতৃত্বে ব্লকে ব্লকে উঠান বৈঠক কর্মসূচি চলমান রয়েছে। সামনে আসছে বর্ষাকাল। এজন্য জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ৩০টি ওয়ার্ডের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে স্কুল পর্যায়ে ওরিয়েন্টেশন কার্যক্রম পরিচালিত হবে। রাসিকের জনসংযোগ শাখার উদ্যোগে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সামাজিক মাধ্যমসহ মূল ধারার গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন ও সংবাদ প্রচার কার্যক্রম চালানো হবে। এ ছাড়া জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মেডিকেল সেন্টার, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ক্লাব প্রতিনিধি, স্থানীয় সুশীল সমাজ ও স্বাস্থ্য সহকারীদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি ওয়ার্ড পর্যায়ে ওরিয়েন্টেশন কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
সূত্র আরও জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের সমন্বয়ে ওয়ার্ড পর্যায়ে গঠিত ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। রাজশাহী সিটি হাসপাতালসহ নগরীর ১৩টি পিএইচসিতে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই সারা বছর বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা রেখেছে সিটি করপোরেশন। এ ছাড়া এই ১৩ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সারা বছরই ডেঙ্গু রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্থায়ী কমিটির উদ্যোগে চলমান কাজের অংশ হিসেবে সারা বছরই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতনতার লক্ষ্যে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এডিস মশার লার্ভা যাতে কোথাও জন্মাতে না পারে, সেজন্য নগরীর প্রতিটি আনাচ-কানাচে সার্বক্ষণিক পরিচ্ছন্ন রাখতে সারা বছর সিটি করপোরেশনের একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এবং এডিস মশার বংশবিস্তার রোধে সিটি করপোরেশন এলাকায় বাসাবাড়ির বাইরে ফেলে রাখা ফুলের টব, ভাঙা হাড়ি-পাতিল, গাড়ির পরিত্যক্ত টায়ার, ড্রাম, ডাব-নারিকেলের খোসা, এয়ারকন্ডিশনার ও রেফ্রিজারেটরের তলায় পানি যাতে জমে থাকতে না পারে, সেজন্য ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এই বিশেষ টিম অভিযান পরিচালনা করে আসছে।
প্রতি মাসে সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগে গঠিত ডেঙ্গু ও মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ কমিটি সামগ্রিক কাজের অগ্রগতি ও প্রতিবেদন তৈরি করে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম মনিটরিংয়ের মাধ্যমে আপডেটও হয়ে থাকে। মসজিদে জুমার খুতবায় ডেঙ্গু বিষয়ে সচেতনতামূলক নানা বার্তা ইমামের মাধ্যমে দিয়ে আসছে সিটি করপোরেশন। এ ছাড়া ডেঙ্গুর চিকিৎসাসেবা সর্বদা সচল রাখতে সিটি করপোরেশনের ৪০ জন স্বাস্থ্য সহকারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারা সিটি এলাকার বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে রাসিকের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন বলেন, ডেঙ্গুর এখন আর কোনো সময় বা মৌসুম নেই। যে কোনো সময় মহামারি আকার ধারণ করতেই পারে। সেজন্য রাসিক সারা বছরই সচেতনতামূলক কর্মসূচি থেকে শুরু করে বিনামূল্যে ডেঙ্গু চিকিৎসাসহ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। শুধু তাই নয়, এডিস মশার লার্ভা ও ডিম ধ্বংস করার কাজ আমরা সারা বছরই করছি। আমাদের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের ছোট্ট একটি টিম প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে নিয়মিত বাসাবাড়ি ও এর আশপাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখতে অনুরোধ জানাচ্ছে।
রাসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এফ এ এম আঞ্জুমান আরা বেগম বলেন, ‘নগরীর ১৩টি পয়েন্টে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা সারা বছরই রাখা হয়েছে। ডেঙ্গুর চিকিৎসা ব্যবস্থাও ফ্রি করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরাও বিভিন্ন সচেতনতামূলক নানা কাজ করে যাচ্ছেন।’