

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার নামের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, শিল্পীর দীর্ঘ সাধনার সম্মান। অথচ বাস্তবতায় এ পুরস্কার মানেই প্রতি বছর বিতর্ক, প্রশ্ন আর অসন্তোষ। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। পুরস্কার ঘোষণার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সিনেমা অঙ্গনজুড়ে উঠেছে নানা অভিযোগ। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের ক্ষেত্রে প্রতিবারই সবচেয়ে বড় অভিযোগ আসে জুরিবোর্ডের গঠন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে। কোন মানদণ্ডে সিনেমা বা শিল্পী মূল্যায়িত হচ্ছেন, সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা সাধারণ তো দূরের কথা, অনেক নির্মাতা-শিল্পীর কাছেও নেই। ফলে পুরস্কার ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ জন্মায়। এবারও বাছাই প্রক্রিয়া, জুরিবোর্ডের স্বচ্ছতা, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও উপেক্ষা এরকম অনেক বিষয় নিয়েই উঠেছে প্রশ্ন। এবারও এমন কিছু সিনেমা পুরস্কৃত হয়েছে, যেগুলো মুক্তির সময় তেমন আলোচনা তৈরি করতে পারেনি, সমালোচকদের কাছেও প্রশংসা পায়নি। আবার যেসব কাজ আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রশংসিত হয়েছে বা দর্শকের মধ্যে আলোড়ন তুলেছে, সেগুলোর নাম তালিকায় নেই, যা বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে।
২০২৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা সিনেমার পুরস্কার পেয়েছে বক্তব্যধর্মী সিনেমা ‘সাঁতাও’। সেরা অভিনেতা হয়েছেন ‘সুড়ঙ্গ’ সিনেমার প্রধান শিল্পী আফরান নিশো। এখানে যাদের নাম এসেছে এটি নিয়ে খুব একটা আপত্তি না থাকলেও, প্রশ্ন উঠেছে ২০২৩ সালের দর্শকনন্দিত ও বাণিজ্যিকভাবে সফল সিনেমা ‘প্রিয়তমা’ ও এ সিনেমার মুখ্য চরিত্রের অভিনেতা শাকিব খান কেন নয়? সেরা অভিনেতা হিসেবে আফরান নিশোকে যেমন অনেকে অভিনন্দন জানিয়েছেন, তেমনি বোদ্ধামহলের মতে শাকিব খান অভিনীত তুমুল ব্যবসাসফল সিনেমা ‘প্রিয়তমা’য় জীবনের সেরা অভিনয় করেও জাতীয় পুরস্কারের জন্য বিবেচিত না হওয়া জাতীয় পুরস্কারের আলো কিছুটা হলেও ম্লান হয়েছে। নিশোর সঙ্গে শাকিবকেও বিবেচনা করা যেতে পারত, এতে বাণিজ্যিক ঘরানার লগ্নিকারকরা উৎসাহিত হতেন। এবারের পুরস্কার তালিকায় আলোচিত ও দর্শকপ্রিয় এ সিনেমা এবং শিল্পীর অনুপস্থিতি সমালোচকদের মনে আঘাত করেছে। একই সঙ্গে অনেকের অভিযোগ এবারও কিছু নির্দিষ্ট নামের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, যাদের আগের কাজ নিয়েও প্রশ্ন ছিল। এ ছাড়া শিল্পগুণ বিবেচনার বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা কিংবা লবিংয়ের প্রভাব কি পুরস্কার নির্ধারণে কাজ করেছে, এ প্রশ্নও উঠেছে।
এদিকে সেরা চিত্রনাট্যকার হিসেবে যৌথভাবে পুরস্কার পাচ্ছেন ‘রক্তজবা’ সিনেমার নিয়ামুল মুক্তা ও মুহাম্মাদ তাসনীমুল হাসান তাজ। কিন্তু কথা হচ্ছে, ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত এ সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহেই মুক্তি পায়নি। ২০২৩ সালে একটি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে এটি মুক্তি দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী কোনো সিনেমা সেন্সর পাওয়ার পর অবশ্যই প্রেক্ষাগৃহে অন্ততপক্ষে একটি শো প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। এমনটা না হলে জাতীয় পুরস্কারের জন্য বিবেচনায় আসার সুযোগ নেই। ‘রক্তজবা’ সেন্সর পাওয়ার পর কেবল ওটিটিতে মুক্তি পেয়েছে। তাই এ সিনেমাটি কোন নিয়মের ফাঁক গলিয়ে জাতীয় পুরস্কারের জন্য বিবেচনায় এলো—তা প্রশ্ন থেকেই যায়। এদিকে এ সিনেমার পরিচালক নিয়ামুল মুক্তা জানিয়েছেন তিনি এর চিত্রনাট্য লিখেননি। তাহলে তিনি কীভাবে এ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেন? এটি অন্যদের পাশাপাশি খোদ পরিচালকেরও প্রশ্ন। তবে তিনি এ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ প্রসঙ্গে নিয়ামুল মুক্তা বলেন, ‘আমার পরিচালিত সিনেমা কবে, কোথায়, কোন প্রেক্ষাগৃহে চলেছে, তা আমিই জানি না। সিনেমা হলে মুক্তি না পেলে কোনো সিনেমা জাতীয় পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হতে পারে কি না, আমার প্রশ্ন।’ তিনি আরও বলেন, ‘সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছেন মুহাম্মাদ তাসনীমুল হাসান তাজ। এখন আমি যে কাজ করিনি, তার জন্য কেনো পুরস্কার নেব? তাই আমি এ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করছি।’ অন্যদিকে ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার ‘ও প্রিয়তমা’ গানের জন্য সেরা গায়ক হিসেবে এবার মনোনীত হয়েছেন সংগীতশিল্পী বালাম। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—কেন এককভাবে বালাম মনোনীত হলেন। গানটিতে বালামের সঙ্গে কণ্ঠ দিয়েছিলেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী সোমনুর মনির কোনাল। দুজনের রসায়নেই গানটি পেয়েছিল শ্রোতাপ্রিয়তা। তাহলে কোন নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে এককভাবে বালামকে বিবেচনায় নিয়েছে জুরিবোর্ড। অন্যদিকে একই সিনেমার ‘ঈশ্বর’ গানের জন্য সেরা গীতিকার সোমেস্বর অলি ও সেরা সুরকার হয়েছেন প্রিন্স মাহমুদ। অথচ একই সিনেমার তুমুল শ্রোতাপ্রিয় ‘ঈশ্বর’ গানটির জন্য নবাগত রিয়াদ সেরা কণ্ঠ হিসেবে বিবেচিত হতে পারতেন বলে বোদ্ধামহলের মত।
এ ছাড়া প্রশ্ন উঠেছে, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার নীতিমালায় মৃত কাউকে পুরস্কারের জন্য বিবেচনার সুযোগ না থাকলেও এবার যৌথভাবে আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ এবং চিত্রগ্রাহক ও নির্মাতা আব্দুল লতিফ বাচ্চু। এ নিয়ে বোদ্ধামহলে ফিসফাঁস চলছে। যদিও প্রয়াত দুজনই ইন্ডাস্ট্রির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। পুরস্কার ঘোষণার পর একাধিক শিল্পী ও নির্মাতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। কেউ সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, কেউ আবার হতাশা প্রকাশ করেছেন। অনেকের বক্তব্য, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এখন আর শিল্পের নিরপেক্ষ মূল্যায়নের প্রতীক নয়, বরং একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এ বিতর্ক নতুন প্রজন্মের নির্মাতা ও শিল্পীদের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে। যারা নিজেদের কাজ দিয়ে পরিচিত হতে চান, তারা কি আদৌ বিশ্বাস করতে পারবেন, যোগ্যতার ভিত্তিতেই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিলবে? নাকি পুরস্কার পাওয়ার জন্য অন্য সমীকরণও জরুরি? এদিকে বরাবরের মতো এবারও বিতর্কের মুখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা আসেনি। জুরিবোর্ডের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়েও বিস্তারিত ব্যাখ্যা আসেনি এখন পর্যন্ত। এ নীরবতাই প্রশ্নকে আরও জোরালো করছে।
উল্লেখ্য, ২৯ জানুয়ারি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে (২০২৩) মনোনীতদের নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়।
মন্তব্য করুন