দড়ি টানা নৌকা। মাঝি ধরে আছে দড়ি, আর সারিবদ্ধ হয়ে নৌকায় উঠছে ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা। তাদের চোখমুখে ভয়ের ছাপ। উদ্দেশ্য ভালোভাবে বিদ্যালয়ে যাওয়া এবং ছুটির পর ভালোভাবে বাড়ি পৌঁছায়। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, তাদের মতো শত শত লোকজন পারাপার হয়ে থাকে দড়ি টানার এই নৌকায়। প্রায় ৫৩ বছর ধরে তারা এভাবেই এপার থেকে ওপার নৌকাকে সম্ভল করেই যাতায়াত করছে। বলছি নওগাঁর সদর উপজেলার চাকলা খেয়া ঘাটের কথা।
জানা যায়, উপজেলার বক্তারপুর ও তিলকপুর ইউনিয়নকে বিভক্ত করেছে ছোট যমুনা নদী। দুই ইউনিয়নের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের একমাত্র ভরসা দড়িটানা নৌকা। প্রতিদিন অন্তত দেড় হাজার মানুষ নৌকার উপর ভর করে যাতায়াত করে থাকে। যুগের পর যুগ পার হলেও দুর্ভোগের মুক্তি মিলেনি আজ পর্যন্ত। এলাকাবাসীর দাবী এই পারঘাটিতে একটি ব্রিজ হলে যেমন ভোগান্তি কমবে, তেমনি গতি আসবে অর্থনীতিতে। বর্ষা মৌসুমে পানিতে যখন টইটুম্বর, তখন এক ভয়ংঙ্কর রুপ ধারণ করে এই নদী। আবার শুষ্ক মৌসুমে কমে যায় পানি। তারপরও দঁড়িটানা নৌকার উপর ভরসা করে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে হয় দুই পাড়ের বাসিন্দাদের। আর ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে হয় ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের। বেশ কয়েকবার নৌকা ডুবে ঘটছে দুর্ঘটনা। নৌকা থেকে পড়ে গিয়ে বই খাতা ও পোষাক ভিজে যায় শিক্ষার্থীদের।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ছোট যমুনা নদীর পশ্চিম তীরে বক্তারপুর গ্রাম। গ্রামে রয়েছে হাট-বাজার, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র, প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়। এখানে প্রতিদিন প্রায় সহস্রাধিক লোকজনের যাতায়াত। দুই পাড়ের বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীরা প্রায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছেন। কথা হয় চাকলা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী চৌতি, হাজেরাসহ অনেকের সcqgo।
তারা জানান, আমরা এই বিদ্যালয়ে প্রাইমারি থেকে পড়াশোনা করছি। সেই জন্য প্রায় ১০বছর থেকে নৌকায় যাতায়াত করছি। পড়াশোনার জন্য ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে হয়। নদীতে পানি বেশি থাকলে পার হতে বেশি ভয় লাগে। অনেক সময় বিদ্যালয়ে আসতে আমাদের দেরি হয়। এতে করে আমরা ভোগান্তির মধ্যে পড়ি। সবার দাবি চাকলা ঘাটে একটা ব্রিজ নির্মাণ করা হোক।
ইকরতাড়া গ্রামের গৃহবধূ মুক্তা বলেন, আমাদের ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে প্রাইমারি স্কুলে পড়াশোনা করে, তাই নৌকায় করে পারাপার হতে হয়। এতে করে একটা ভয় সব সময় কাজ করে। কারণ নদীতে এখন অনেক পানি। যদি নৌকা ডুবে যায়, তাহলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটবে। এজন্য সব সময় চিন্তার মধ্যে থাকতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম ও আব্দুল মালেক বলেন, এপারে চাকলা হাট আছে, সেখানে প্রতিদিন বিকেল বেলা মানুষ জন বাজার করতে আসে। এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসে শিক্ষার্থীরা। তাই শিক্ষার্থী ও দুই পাড়ের লোকজনের পারাপারের সুবিধার্থে চাকলা ঘাটে অতি শীঘ্রই একটা ব্রিজ দরকার।
নদী পার হয়ে চাকলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে আসেন সহকারী শিক্ষিকা সোহেলী পারভীন। তিনি বলেন, নৌকায় নদী পারাপার একটি সময়ের ব্যাপার। নদীতে পানি বৃদ্ধি পেলে সময়ের ব্যবধানের পাশাপাশি ঝুঁকির পরিমাণটা আরও বৃদ্ধি পায়। আর ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। অনেক ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা সাঁতার পারেনা, এদের জন্য পারাপার আরও ঝুঁকি। তাই এই ঘাটে একটি ব্রিজ খুব জরুরি।
চাকলা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হারুন-অর রশীদ বলেন, ১৯১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬০০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে, যার অধিকাংশ নদীর ওপার ইকরতাড়া গ্রাম থেকে আসে। শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নৌকা দিয়ে নদী পার হয়ে বিদ্যালয়ে আসতে হয়। বিশেষ করে নদীর পানি যখন বেড়ে গিয়ে নদীতে প্রবল স্রোত হয়, তখন ঝুঁকির মাত্রা আরও বাড়িয়ে যায়। অনেক সময় নৌকা ডুবিরও ঘটনা ঘটে। তাই আমি এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক হিসাবে শিক্ষার্থীদের পারাপারের সুবিধার্থে একটি ব্রিজ নির্মাণের দাবি জানায়। এতে করে শিক্ষার্থী এবং দুই পাড়ের মানুষের ভোগান্তি কমবে, হবে মেলবন্ধন।
এবিষয়ে নওগাঁ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ছোট যমুনা নদীর ওপর চাকলা এলাকায় স্থানীয় খেয়া ঘাটে নৌকার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পারাপার হয়। সেখানে আমাদের একটি ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। আসলে এগুলো ব্রিজ আমরা নির্মাণ করে থাকি স্থানীয় সংসদের অনুমতিক্রমে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। ইতিমধ্যে স্থানীয় সাংসদ ব্রিজ বাস্তবায়ন করার জন্য দিয়েছিলেন। এবং আমরা হেড কোয়ার্টারে প্রস্তাব প্রেরণ করেছি। কিন্তু সেটির অনুমোদন এখনো পাওয়া যায়নি, অনুমোদন পেলে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করবো।
মন্তব্য করুন