পৌনে দুই শতাংশ স্বামীর ভিটা, তাও অন্যের দখলে। গোলাপজান বেগম (৭৫) নামের এমন এক গৃহহীন নিঃসন্তান বিধবা অসহায় বৃদ্ধার দায়িত্ব নিয়েছেন ভাঙ্গা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান।
বৃদ্ধা গোলাপজান বেগম ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার কালামৃধা ইউনিয়নের ভরিলহাট গ্রামের মৃত্যু মুনসুর বেপারি ওরফে গেদার স্ত্রী। স্বামী অনেক আগেই মৃত্যুবরণ করায় তার ওপর নেমে আসে ঘোর অন্ধকার সন্তান-সন্তুতি কিছুই নাই তার। এক টুকরা (১.৭৫ শতাংশ) জমি থাকলেও চুন্নু খলিফা দখল করে রাখেন বলে গোলাপজান জানান। মাটির সঙ্গে নুয়ে পড়া একটি ছাপড়ায় মানবেতর জীবনযাপন করেন তিনি। সেটিও অন্যের সীমানায় পড়ে থাকায় তার ছাপড়াটি দাঁড় করাতে দিচ্ছে না প্রতিবেশী আক্তার খলিফা।
গোলাপজান মানবেতর জীবনযাপন করছেন একটি ভেঙে পড়া ছাপড়ার নিচে। বৃহস্পতিবার (১০ আগস্ট) বিকেলে ওই এলাকায় খাস জমি পরিদর্শনে গিয়ে গোলাপজান মানবেতর জীবনযাপনের বিষয়টি চোখে পড়ে ভাঙ্গা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্মকর্তা মাসুদুর রহমানের। তিনি ওই অসহায় বৃদ্ধা মহিলাকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
গোলাপজান বেগমের মানবেতর জীবনযাপনের লোমহর্ষক বর্ণনা প্রত্যক্ষভাবে শুনে দায়িত্ব নেন মাসুদুর রহমান। কথা দেন তার পৌনে দুই শতাংশ জমি দখলমুক্ত করে একটু মাথা গোজার ঠাঁই নির্মাণ করে দেওয়ার। গোলাপজানের ভরণ পোষণের জন্য দায়িত্ব দেন স্থানীয় চেয়ারম্যান রেজাউল মাতুব্বরের ওপর।
গোলাপজান তার মানবেতর জীবনযাপনের কথা জানিয়ে বলেন, আপনারা একটু এগিয়ে দেখেন, পায়খানা প্রসাবখানা নাই। কাদাপানিতে ওইভাবেই রাতভর বসে থাকি। মশারি-কয়েল কিছুই নাই।
টয়লেট আসলে কী করেন, উত্তরে বৃদ্ধা বলেন, ‘এই দেহেন দুইটা লাডি, এই লাডি দিয়া ওই জঙ্গলের পাশে যাই।’ গোলাপজান আরও বলেন, আমারে ওই ঘরের চুন্নু বলেছিল তোমার ভিটা আমাকে দলিল করে দাও, আমি তোমাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত খাওয়াব, পরাব। আমি দেখলাম আমার কেউ নাই। আমি যেন স্বামীর ভিটায় থাইহা মরতে পারি, তাই আমি রাজি হইলাম। তারা ঢাহা থাহে। আমারে ৪ মাস পর্যন্ত তিন হাজার করে টাহা দেছে, আমি পাক সাক করে খাইছি। গেছে বছর আমার ভিটায় ওরা ঘর উডাইল। ভিডাও দখল হয়ে গেল। এরপর আমারে আর খাবার দেল না, আমি ৮ দিন পর্যন্ত কান্দাকাটি কইরা না খাইয়া, না নাইয়া মাইনষের দুয়ারে দুয়ারে গেলে কেউ একমুঠ খাবার দেলো না, তারা কয়, কেন তোমারে খাবার দেব। তোমার জায়গা দিয়া দিছো খলিফার ছাওয়াল গো, তারাই তোমারে খাবার দেবে। এভাবেই আমি খাইয়া না খাইয়া দিন কাটাইতেছি। পরে কান্দাকাটি কইরা বেড়াইলে গ্রামের লোকজন টাকা পয়সা ও খাবার দিয়া বহু দেখছে। আমার শরীর ব্যথা, পা ব্যথা নড়াচড়া করা পারি না হাতে পায়ে ঘা হয়ে গেছে, বহু ওষুধ খেতে হয়।’ অন্যরা এসিল্যান্ড এসেছেন বলে তাকে জানালে তিনি আৎকে ওঠেন। এ সময় এসিল্যান্ড তাকে জড়িয়ে ধরেন সান্ত্বনা দেন।
এ ঘটনায় এসিল্যান্ড মাসুদুর রহমান বলেন, গোলাপজান বেগম নিঃসন্তান বিধবা এক অসহায় বৃদ্ধা নারী, তিনি এক মানবেতর জীবনযাপন করছেন, তার ভিটাটুকু অন্যরা দখল করে নিয়েছে। আমি মর্মাহত হয়েছি, বৃদ্ধা মহিলার জমি বের করে বুঝিয়ে দেওয়া হবে এবং তার সুন্দর করে বাঁচার জন্য ডিসি স্যারের সঙ্গে আলাপ করে একখানা ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হবে। তার তদারকির জন্য সরকারি সকল সুবিধা তাকে দেওয়া হবে।
এদিকে স্থানীয় কালামৃধা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রেজাউল মাতুব্বর বলেন, অসহায় বৃদ্ধা মহিলার জন্য আমি সকল সুবিধা দিব।
অন্যদিকে ভরিলহাট গ্রামের বাসিন্দা সাইফুল জানান, বর্তমান যুগে ওই বৃদ্ধা মহিলার মতো দুঃখী মানুষ দুনিয়ায় আর নাই। আপনারা যদি কিছু করে দিতে পারেন আল্লাহ আপনাদের প্রতি খুশি হবেন, আমার বিশ্বাস।
মন্তব্য করুন