জামান মৃধা, ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৪, ১১:৩৪ এএম
অনলাইন সংস্করণ

বালুখেকোদের দখলে তিস্তা, ঝুঁকির মুখে গ্রাম ও সড়ক

তিস্তা নদী থেকে অবৈধভাবে বোমা মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করছেন প্রভাবশালীরা। ছবি : কালবেলা
তিস্তা নদী থেকে অবৈধভাবে বোমা মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করছেন প্রভাবশালীরা। ছবি : কালবেলা

উত্তরের জনপথ দেশের সীমান্তবর্তী জেলা নীলফামারী। এ জেলায় প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে তিস্তা নদীর ভাঙনে বিলীন হয় শত শত ঘরবাড়ি, বসতভিটা ও আবাদি জমি। নদী ভাঙনরোধে সরকারিভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও কিছু বালুখেকো তিস্তা নদী থেকে অবৈধভাবে বোমা মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করছেন। শুধু বালু উত্তোলনই নয়, নদী থেকে প্রতিদিন শত শত টলি বালু ট্রাক্টরযোগে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে লাভবান হচ্ছে বালু খেকোরা আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নদী তীরবর্তী বসবাসরত মানুষজন।

আইন লঙ্ঘন করে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের ঝাড়সিংহেশ্বর, খগাখরিবাড়ী ইউনিয়নের পাগলপাড়া বাজার সংলগ্ন এলাকা, টেপাখরিবাড়ী ইউনিয়নের তিস্তা বাজার, ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের আশ্রয়ণ কেন্দ্র ও ভেন্ডাবাড়ী ডনের সাইড সংলগ্ন ১নং স্পার বাঁধ, নাউতারা ইউনিয়নের শালহাটি বাজার ও সাতজান ডাঙ্গাপাড়া। এ ছাড়া ডিমলা সদর ইউনিয়নের নটাবাড়ী এলাকা থেকে প্রতিদিন অবৈধভাবে বালু ও মাটি ট্রাক্টরে করে বিক্রি করা হচ্ছে। প্রশাসনের যথাযথ নজরদারি না থাকায় স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তি অবাধে ওই বালু ও মাটি কেটে নিয়ে বিক্রি করছেন। এতে বিস্তীর্ণ নদীর তীরবর্তী এলাকা হুমকির মুখে পড়েছে। বিরূপ প্রভাব পড়ছে জীববৈচিত্র্য। হুমকিতে ফেলছে সামাজিক পরিবেশ। নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমি ও গ্রামীণ সড়ক। তা ছাড়া ট্রাক্টর চলাচলের ধুলাবালিতে বাড়ছে শ্বাসকষ্টজনিত রোগ।

স্থানীয় লোকজন জানান, নদীতীরবর্তী অন্যান্য স্থাপনার মতো উপজেলার পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের ঝাড়সিংহেশ্বর ও ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের আশ্রয়কেন্দ্র, প্রতি বছর বন্যায় প্রবল ভাঙনের শিকার হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় কয়েক হাজার পরিবার। এ ছাড়া ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙনকবলিত ওই এলাকায় প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে প্রায় কোটি টাকার জরুরি প্রতিরক্ষামূলক কাজ করে থাকেন। গত কয়েক মাস থেকে এলাকার কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ ওই এলাকা থেকে বালু ও মাটি কেটে নিয়ে বিক্রি করছে। প্রতিদিন বালু ও মাটি কেটে কয়েক শতাধিক (টলি) ট্রাক্টরে তুলে বিভিন্ন স্থানে বিক্রির জন্য পাঠানো হচ্ছে। প্রতি ট্রলি বিক্রি করা হচ্ছে ৮০০-১০০০ টাকায়।

অথচ সরকারি গেজেটে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ৪ নম্বর ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, বিপণনের উদ্দেশ্যে কোনো উন্মুক্ত স্থান, চা-বাগানের ছড়া বা নদীর তলদেশ হতে বালু বা মাটি উত্তোলন করা যাবে না। এ ছাড়াও সেতু, কালভার্ট, ড্যাম, ব্যারাজ, বাঁধ, সড়ক, মহাসড়ক, বন, রেললাইন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বা বেসরকারি স্থাপনা অথবা আবাসিক এলাকার এক কিলোমিটারের মধ্য থেকে বালু ও মাটি উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

গত শনিবার ও রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, নদীরতীর, স্পার, গাইড বাঁধের নিকটবর্তী জায়গা, তিস্তা নদীর তলদেশ থেকে বালু ও মাটি তোলা হচ্ছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, গত ৪/৫ মাস থেকে এই সকল জায়গার স্থান থেকে বালু ও মাটি তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার এক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থেকে এভাবে বালু ও মাটি না তোলার জন্য তাদের (বালু-মাটি ব্যবসায়ী) নিষেধ করা হয়েছিল। কিন্তু তারা শোনেননি। উল্টো আমাকে হুমকি দিয়েছিলেন। তাই নিজের মান-সম্মান বজায় রেখে চুপ করে থাকি।

স্থানীয় বালু ব্যবসায়ী খলিলুর রহমান ও জুলহাস মিয়া দাবি করেন, একসময় নদীর মধ্যে তাদের জমিজমা ছিল। নদীভাঙনে এসব জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। জমি ভেঙে গেলেও সেখানে শুষ্ক মৌসুমে চর জেগে ওঠে। তাই সেখান থেকে মাটি কেঁটে ও বালু তুলে ব্যবসা করছেন। আইনে এভাবে মাটি ও বালু তোলা যে নিষিদ্ধ, তা তারা জানেন না বলে জানান।

কথা হয় ঝাড়সিহেশ্বর এলাকার ভুক্তভোগী সাইজুদ্দি, মুজিবুর রহমান, কল্পনা আক্তার ও আশ্রয়ণ কেন্দ্রের মোমেনা খাতুন, আব্দুল জব্বার মিয়া, বিলকিস বেগমের সঙ্গে। তবে ভয়ে কেউ বালুখেকোদের নাম মুখে আনলেন না। তাদের ভাষ্য, এসবের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ ও দুর্ধর্ষ প্রকৃতির লোকজন। প্রতিবাদ করলে আর রক্ষা নেই। তবে ঘটনাস্থলে গিয়েও দেখা মেলেনি এ কাজের সঙ্গে জড়িতদের।

ঝুনাগাছ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একরামুল হক চৌধুরী বলেন, এ বিষয়টি আমি জেনেছি। কিন্তু এখানে আমার কোনো করণীয় নেই। এরপরও আমি তাদের নিষেধ করেছি। প্রয়োজনে আরও নিষেধ করব।

ডালিয়া পওর বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আসফাউদৌলা (প্রিন্স) বলেন, যারা এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের তালিকা তৈরি করে ওই সব ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফারজানা আকতার বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করতে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে জরিমানাও করা হয়েছে। তবে চরাঞ্চলের পথঘাট দুর্গম হাওয়ায় প্রশাসনের উপস্থিতি আগেই বুঝতে পেরে সটকে পড়ে উত্তোলনকারীরা।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নুর-ই-আলম সিদ্দিকী বলেন, নদী ও কৃষিজমি থেকে বালু উত্তোলন অবৈধ। বালু উত্তোলন বন্ধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাজধানীতে আজ কোথায় কী

বাংলাদেশের ম্যাচসহ টিভিতে আজকের যত খেলা

এইচআর বিভাগে নিয়োগ দিচ্ছে ম্যাটাডোর বলপেন

টানা ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়

শনিবার রাজধানীর যেসব মার্কেট বন্ধ

২৯ নভেম্বর : আজকের নামাজের সময়সূচি

বিএনপির দুই নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার

খালেদা জিয়া কেমন আছেন, সর্বশেষ তথ্য জানালেন আসিফ নজরুল

বগুড়া বার সমিতির নির্বাচনে সভাপতি ও সা.সম্পাদকসহ ১০ পদে বিজয়ী বিএনপি

নারায়ণগঞ্জে কারানির্যাতিত বিএনপি নেতাকর্মীদের সংবর্ধনা সমাবেশে মাসুদুজ্জামান

১০

আপনার সুস্থতায় সাহস পায় বাংলাদেশ : নাছির উদ্দীন নাছির

১১

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতির খবরে জামায়াত আমিরের উদ্বেগ

১২

খালেদা জিয়াকে নিয়ে হাদির আবেগঘন বার্তা

১৩

খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খবর নিতে মধ্যরাতে হাসপাতালে আসিফ নজরুল

১৪

জামায়াতের সাবেক আমিরের কবর জিয়ারত করলেন আবদুল আউয়াল মিন্টু

১৫

খালেদা জিয়ার জন্য প্রধান উপদেষ্টার দোয়া কামনা, তারেক রহমানের কৃতজ্ঞতা

১৬

নির্বাচিত হলে সব চাঁদাবাজি ও অনিয়ম দূর করব : আবদুল আউয়াল মিন্টু

১৭

আমি জনগণের শাসক নয়, সেবক হতে চাই : খন্দকার আবু আশফাক

১৮

১৯ দেশের অভিবাসীদের গ্রিন কার্ড আবার যাচাই করবে যুক্তরাষ্ট্র

১৯

মাদক চোরাচালান চক্রের মূলহোতাসহ ২ সহযোগী গ্রেপ্তার

২০
X