সারা দেশে তীব্র দাবদাহে তপ্ত রোদে মানুষজন যখন বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছেন বা ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন, তখনই একদল শ্রমিককে খালি পায়ে ইট-পাথরের চাতালে ধান শুকাতে দেখা যায়। এরা চাতাল শ্রমিক। প্রচণ্ড রোদ মাথায় নিয়ে দিনভর শ্রম দিতে হয় তাদের। ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার বিভিন্ন চাতালে গেলেই মিলে এমন দৃশ্যের।
আগে ৪ টাকা মণ ধান শুকিয়ে দিনে ৪০ থেকে ৫০ টাকা রোজগার করতাম। এখন ২০ টাকা মণ ধান শুকানোর কারণে সারা দিনে আয় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও শ্রমের মজুরি বাড়েনি। ১৩ থেকে ১৪ ঘণ্টা ঘাম ঝরানো খাটুনির পর আয় হয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। চাতালে ধান না থাকলে চলতে হয় ধার-দেনা করে। এভাবে কষ্টের কথা বলছিলেন চাতাল শ্রমিক হাসিনা আক্তার। হাসিনার মতো অনেক নারী ও পুরুষ পারিশ্রমিকে কাজ করছেন ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার বিভিন্ন চাতালে। প্রতিবছর কখন মে দিবস বা শ্রমিক দিবস পালন হয় সেটাও জানেন না তারা।
স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর পেটের ক্ষুধা নিয়ে জেলার শৈলকুপা ফুলহরি থেকে ২৫ বছর আগে হরিণাকুণ্ডুর চাতালে চলে আসেন হাসিনা। তিনি বলেন, ভাঁপ দেওয়া, সিদ্ধ ও শুকিয়ে ধান বস্তাবন্দি করলে মণ প্রতি পান ২০ টাকা। চালান ওঠে চার থেকে পাঁচ দিনে। আবহাওয়া খারাপ হলে ৮ থেকে ১০ দিনও লাগে। এতে মজুরি কমে। ধান না থাকলে ধার-দেনা নিয়ে চালাতে হয় সংসার।
শ্রমিকরা জানান, একটি চালানে গড়ে ১০০ মণ ধান থাকে। ভাঁপ দেওয়া সিদ্ধ করে শুকিয়ে বস্তায় ভরেন তারা। মণ প্রতি পান ২০ টাকা। শ্রমিকের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে জনপ্রতি দিনে পারিশ্রমিক থাকে গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। আবহাওয়া খারাপ থাকলে আরও কমে। ধান না শুকালে কিছুই মেলে না।
উপজেলার মুন্সি রাইস মিলের শ্রমিক রেবেকা খাতুন (৫০) জানান, অভাবে পড়ে জেলার কলমনখালি গ্রাম থেকে ২৫ বছর আগে হরিণাকুণ্ডুর চাতালে কাজের উদ্দেশ্যে আসেন তিন। তখন দিনমজুরি ছিল ৫০ টাকা।
রেবেকা খাতুন বলেন, ভোর থেকে ভাঁপ দেওয়া সিদ্ধ ধান রোদে শুকিয়ে বস্তায় ভরতে সময় লাগে ২ থেকে ৩ দিন। কাজ শেষ করতে প্রতিদিন বাজে রাত ১০টা। আবার ভোর রাতে উঠে ধান সিদ্ধ শুরু করতে হয়। কিন্তু আমাদের মজুরি বাড়ে না। এত পরিশ্রম করেও দিনশেষে পাই ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। অল্প পারিশ্রমিকও মহাজনরা ঠিকমতো দিতে চান না।
উপজেলার বৈঠাপাড়া গ্রামের চাতাল শ্রমিক জাহাঙ্গীর ইসলাম (৩০) জানান, পরিশ্রমে ঘাম ঝরে শরীর থেকে। ভিজে যায় জামা-লুঙ্গি। গামছা দিয়ে মুখ মুছতে হয় বারবার। শরীরের ঘাম শরীরে মিলে যায়। ক্লান্ত-শ্রান্ত তবুও ধান শুকাতে ব্যস্ত চাতাল শ্রমিকরা।
তিনি বলেন, কখনো কখনো শরীর জিরাতে চলে যাই গাছতলায়। এতো শ্রম দিয়ে দিন শেষে আসে মাত্র ২০০ টাকা।
এ বিষয়ে ধান ব্যবসায়ী ও চাতাল মালিক সাহেব আলী বলেন, ধান কিনে সব প্রক্রিয়া শেষে চাল করতে মণ প্রতি ২০০ টাকা খরচ হয়। বিক্রি করে লাভ হয় ৫০ থেকে ১০০ টাকা। এ কারণে বেশি পারিশ্রমিক দেওয়া যায় না।
উপজেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সাত্তার বলেন, আমাদের ধান থেকে চাল সংগ্রহ করতে খরচ বেশি পড়ে যায়। এতে আমরা নিজেরাও লোকসান ঝুঁকির মধ্যে থাকি। শ্রম অনুযায়ী চাতাল শ্রমিকরা পারিশ্রমিক পান না এটা সঠিক। কিন্তু, চাতাল মালিকরাও খুব ভালো ব্যবসা করতে পারছেন না। অন্যান্য চাতাল মালিকের সঙ্গে কথা বলে চেষ্টা করবো কীভাবে চাতাল শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো যায়।
মন্তব্য করুন