

ব্যস্ত জীবনে সময় বাঁচাতে আমরা অনেকেই একবারে অনেকটা ভাত রান্না করে ফ্রিজে তুলে রাখি এবং পরে তা বারবার গরম করে খাই। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি আতঙ্ক ছড়িয়েছে যে, বাসি ভাত বা বারবার গরম করা ভাত খেলে নাকি লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে।
এই দাবির পেছনে কি সত্যিই কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে? নাকি এটি অতিরঞ্জিত ভীতি? আধুনিক স্বাস্থ্য গবেষণা ও চিকিৎসকদের মতামত অনুযায়ী বিষয়টি কীভাবে দেখা উচিত—সেটিই জানার চেষ্টা করা যাক।
বাসি ভাত ও ক্যানসার আতঙ্ক : আসল সত্যিটা কী?
সরাসরি বলতে গেলে, ভাত বারবার গরম করে খেলে সরাসরি লিভার ক্যানসার হয়— এমন কোনো অকাট্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এমন কোনো নির্দিষ্ট যোগসূত্র নিশ্চিত করেনি।
তবে বিষয়টি পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত— এমনটাও নয়। চিকিৎসকদের মতে, ভাত সঠিক উপায়ে সংরক্ষণ না করলে তা থেকে মারাত্মক ফুড পয়জনিং হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে লিভারসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
১. ‘ব্যাসিলাস সেরিয়াস’ ব্যাকটেরিয়ার নীরব বিপদ
চালের ভেতরে প্রাকৃতিকভাবেই Bacillus cereus নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার স্পোর থাকতে পারে। সাধারণ রান্নায় এই স্পোরগুলো পুরোপুরি ধ্বংস নাও হতে পারে।
সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন রান্না করা ভাত দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় ফেলে রাখা হয়। এই অবস্থায় ব্যাকটেরিয়াগুলো দ্রুত বংশবিস্তার করে এবং এক ধরনের বিষাক্ত টক্সিন তৈরি করে, যা খাবারের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে।
এই টক্সিন থেকেই মূলত বমি, ডায়রিয়া ও ফুড পয়জনিংয়ের মতো উপসর্গ দেখা দেয়।
২. টক্সিনের প্রভাব ও লিভারের ঝুঁকি
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভাত বারবার গরম করলেও এই টক্সিনগুলো সবসময় নষ্ট হয় না। ফলে অনিরাপদভাবে সংরক্ষিত বাসি ভাত খেলে শরীরের ওপর চাপ বাড়ে, বিশেষ করে লিভারের ওপর।
দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট বা নিম্নমানের বাসি খাবার খাওয়ার অভ্যাস থাকলে হজমজনিত জটিলতা, লিভারের প্রদাহ কিংবা সিরোসিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। যদিও এটিকে সরাসরি ক্যানসার বলা যায় না, তবে চিকিৎসকদের মতে, লিভারের কোষ বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবিষ্যতে গুরুতর রোগের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
ফ্রিজে ভাত রাখার ও গরম করার সঠিক নিয়ম
চিকিৎসাবিদরা বলছেন, কিছু নিয়ম মেনে চললে ফ্রিজে রাখা ভাত খাওয়া তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হতে পারে—
দ্রুত ঠান্ডা করা জরুরি
ভাত রান্নার এক ঘণ্টার মধ্যেই তা ঠান্ডা করে বায়ুরোধী (airtight) পাত্রে ফ্রিজে রাখতে হবে। ঘরের তাপমাত্রায় ৪-৫ ঘণ্টার বেশি ভাত ফেলে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ।
একবারের বেশি গরম নয়
ফ্রিজ থেকে বের করে ভাত একবারই গরম করে খেয়ে ফেলাই সবচেয়ে নিরাপদ। বারবার ফ্রিজে ঢোকানো ও বের করার ফলে ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তার সহজ হয়।
ভালোভাবে গরম করা
ভাত গরম করার সময় নিশ্চিত করতে হবে যেন তা পুরোপুরি ধোঁয়া ওঠা গরম হয়। হালকা গরম ভাতে ব্যাকটেরিয়া বেঁচে থাকতে পারে।
সংরক্ষণের মেয়াদ সীমিত রাখুন
ফ্রিজে রাখা ভাত সর্বোচ্চ ২ দিনের মধ্যে খেয়ে ফেলা উচিত। এর বেশি সময় রাখলে স্বাদ ও পুষ্টিগুণ দুটোই নষ্ট হতে শুরু করে।
শেষ কথা
লিভার ক্যানসারের সরাসরি কারণ হিসেবে ভাতকে দায়ী করা না গেলেও, ভুলভাবে সংরক্ষিত বাসি ভাত যে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর— তা নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাসি ভাত এড়িয়ে চলাই নিরাপদ। ব্যস্ততার মাঝেও যতটা সম্ভব টাটকা খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে দীর্ঘমেয়াদে শরীর সুস্থ রাখা সহজ হয়— এটাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ।
সূত্র : হিন্দুস্তান টাইমস
মন্তব্য করুন