

সন্তান জন্ম দেওয়া সাধারণত আনন্দের ঘটনা হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক মায়ের জন্য এই সময়টা আনন্দের পাশাপাশি মানসিকভাবে খুব কঠিন হয়ে ওঠে। হঠাৎ শরীরের পরিবর্তন, ঘুমের অভাব, দায়িত্বের চাপ আর সামাজিক প্রত্যাশা একসঙ্গে মিলে অনেক মাকে ঠেলে দেয় গভীর অবসাদ আর উদ্বেগের দিকে। এই সমস্যার নাম পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বা প্রসবোত্তর অবসাদ।
দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা শ্রবণা গুপ্ত বলছিলেন, মেয়ের জন্মের কিছুদিন পর থেকেই তার মন ভাল থাকত না। বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করত না, অকারণে কান্না পেত, খাবারে রুচি কমে গিয়েছিল। কথায় কথায় রেগে যেতেন। কেন এমন হচ্ছে, তা তিনি নিজেও বুঝতে পারছিলেন না।
অনেকদিন এ অবস্থায় থাকার পর চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি জানতে পারেন, তিনি পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে ভুগছেন।
কলকাতার আর এক নারী, যিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি, জানিয়েছেন দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের কয়েক সপ্তাহ পর থেকেই তিনি খুব সহজে মেজাজ হারিয়ে ফেলতেন। বাচ্চা কাঁদলেই রাগ হতো। কখনো সহ্য না করতে পেরে কানে বালিশ চেপে বসে থাকতেন। পরিবারের লোকজন প্রথমে বিষয়টি বুঝতে পারেননি। তারা ভেবেছিলেন, তিনি দায়িত্ব এড়াতে চাইছেন বা মনোযোগ পেতে চাইছেন। কিন্তু তার ভেতরে কী চলছিল, তা কাউকে বোঝানো সম্ভব হয়নি।
এর আগে প্রথম সন্তানের সময়েও তার একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তবে তখন চিকিৎসকের সাহায্য নেননি। দ্বিতীয়বার সমস্যাটা বাড়তে থাকায় তিনি চিকিৎসকের কাছে যান এবং জানতে পারেন তিনি পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে আক্রান্ত।
নতুন নয়, কিন্তু এখনো অবহেলিত সমস্যা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সন্তানের জন্মের পর মায়েদের অবসাদে ভোগা নতুন কোনো বিষয় নয়। বিশ্বজুড়ে বহু নারীই এই সমস্যার মুখোমুখি হন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে গর্ভাবস্থায় প্রায় ১০ শতাংশ নারী এবং সন্তান জন্মের পর প্রায় ১৩ শতাংশ নারী অবসাদে ভোগেন। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই হার আরও বেশি।
চিকিৎসকরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, সময়মতো চিকিৎসা না হলে এই অবসাদ ভয়াবহ আকার নিতে পারে। এতে মায়ের আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ে এবং শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ভারতেও নতুন মায়েদের মধ্যে এই সমস্যা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় দেখা যায়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তা ধরা পড়ে না।
পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন কী
স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ডা. কৃষ্ণা ঘোষ জানাচ্ছেন, গর্ভাবস্থা থেকে সন্তান জন্মের পর পর্যন্ত একজন নারী শারীরিক ও মানসিকভাবে বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যান। সন্তানের জন্মের পর প্রথম ছয় সপ্তাহের মধ্যে যে অবসাদ দেখা যায়, তাকেই পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বলা হয়।
তার কথায়, ভারতের ক্ষেত্রে সমস্যার বড় দিক হল অনেক নারীই চিকিৎসকের কাছে যান না। ফলে বিষয়টি অচিহ্নিত থেকে যায় এবং ধীরে ধীরে জটিল হয়ে ওঠে।
নিউরোসাইকিয়াট্রিস্ট ডা. রাজর্ষি নিয়োগী জানিয়েছেন, পোস্টপার্টাম সমস্যাকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়।
প্রথমটি হলো পোস্টপার্টাম ব্লুজ। এতে মন খারাপ থাকা, কান্না পাওয়া, ঘুমের সমস্যা বা মেজাজ খিটখিটে হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে সামান্য কাউন্সেলিং, পরিবারের সহায়তা আর জীবনযাপনে ছোট পরিবর্তনেই এটি ঠিক হয়ে যায়।
দ্বিতীয়টি হল পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন। এতে দীর্ঘস্থায়ী মনখারাপ, আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া, নিজেকে অযোগ্য মনে হওয়া এবং সন্তানকে ঠিকভাবে মানুষ করতে পারবেন না এই ভয় কাজ করে।
তৃতীয় ও সবচেয়ে গুরুতর অবস্থা হল পোস্টপার্টাম সাইকোসিস। এটি সাধারণত সন্তানের জন্মের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই দেখা দেয়। এই অবস্থায় মা বাস্তববোধ হারাতে পারেন, বিভ্রমে ভুগতে পারেন এবং নিজের বা সন্তানের ক্ষতি করার চিন্তা আসতে পারে।
কখন লক্ষণ দেখা দেয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সময় সন্তানের জন্মের কয়েক দিনের মধ্যেই লক্ষণ শুরু হয়। আবার হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর ধীরে ধীরে সমস্যা স্পষ্ট হতে পারে। চিকিৎসা না হলে এই অবসাদ আট মাস থেকে এক বছর বা তারও বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে।
কেন হয় এই অবসাদ
এই সমস্যার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। ডা. রাজর্ষি নিয়োগী বলছেন, শরীরের হরমোনের হঠাৎ পরিবর্তন, জটিল গর্ভাবস্থা, সিজারিয়ান ডেলিভারি, আগে মানসিক অসুস্থতার ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।
সামাজিক কারণও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কন্যা সন্তানের জন্মের পর অনেক পরিবারে মায়ের প্রতি অবহেলা বা চাপ তৈরি হয়। ডা. কৃষ্ণা ঘোষ তার অভিজ্ঞতা থেকে জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে মেয়ের জন্মের খবর শুনে শ্বশুরবাড়ির লোকজন মাকে দেখতে পর্যন্ত আসেন না। এ ধরনের আচরণ মায়ের মানসিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে দেয়।
প্যারেন্টিং কনসাল্ট্যান্ট পায়েল ঘোষ বলছেন, স্বামী ও পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, একা একা সব সামলানোর চাপ, পর্যাপ্ত ঘুম ও খাবারের অভাব এসবই পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের ঝুঁকি বাড়ায়।
অনেক সময় পরিকল্পনা ছাড়া বা নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মা হওয়াও এই সমস্যার কারণ হতে পারে।
কতটা ভয়াবহ হতে পারে
চিকিৎসা না হলে পরিস্থিতি মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। দেশে বিভিন্ন সময় এমন ঘটনা সামনে এসেছে যেখানে দেখা গেছে, মা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে ভুগছিলেন এবং তার ফল ভয়ংকর হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোস্টপার্টাম সাইকোসিসের ক্ষেত্রে মায়ের মনে এমন ভাবনা আসতে পারে যে, তিনি সন্তান সামলাতে অক্ষম। সেই চিন্তা থেকেই চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এখনো বড় বাধা লজ্জা আর ভয়
যদিও বিদেশি ও ভারতীয় অনেক পরিচিত মানুষ প্রকাশ্যে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের কথা বলেছেন, তবুও সমাজে এখনো এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে অনেক মা ভয় পান।
পায়েল ঘোষের কথায়, সন্তান জন্ম দেওয়া আনন্দের বিষয় এই ধারণার জন্য অনেকেই মানতে চান না যে মা হয়েও কেউ অবসাদে ভুগতে পারেন। ফলে চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি হয়।
কীভাবে মোকাবিলা করা যায়
বিশেষজ্ঞরা একমত, সমস্যাটা চিহ্নিত করাই সবচেয়ে জরুরি। মায়েদের সময়মতো খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক সমর্থন প্রয়োজন। পরিবারের সহযোগিতা এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নেয়।
ডা. নিয়োগী বলছেন, মা যখন শিশুর যত্ন নেন তখন পাশে কেউ থাকলে চাপ অনেকটা কমে। নিয়মিত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা খুব প্রয়োজন।
বর্তমানে ভারতে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সরকারি স্তরে টেলি ম্যানাস নামের হেল্পলাইন চালু হয়েছে, যেখানে বিনামূল্যে কাউন্সেলিং পাওয়া যায়। এ ধরনের উদ্যোগ নতুন মায়েদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হতে পারে।
ডা. কৃষ্ণা ঘোষ মনে করেন, শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও এ বিষয়ে আরও সচেতনতা তৈরি করা দরকার।
তার কথায়, সন্তান যেমন যত্ন চায়, তেমনই সদ্য মা হওয়া একজন নারীরও সমান যত্ন ও বোঝাপড়া প্রয়োজন। এটা বুঝতে পারলেই অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব।
সূত্র : বিবিসি বাংলা
মন্তব্য করুন