বাংলাদেশের বাজারে এখন স্বর্ণের ভরি এক লাখ ৮ হাজার টাকা। এটি গত নভেম্বরের সংবাদ শিরোনাম। অথচ এর পরের মাসেই জানা গেল, স্বর্ণের ভরি আসলে এক হাজার টাকা! বিস্মিত হচ্ছেন? আগামী ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য বেশ কয়েকজন প্রার্থীর হলফনামা তা-ই বলছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বলছে, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান মনোনয়নপত্রের সঙ্গে যে হলফনামা দাখিল করেছন, সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, তার ও তার স্ত্রীর কাছে স্বর্ণ রয়েছে ৪৫ ভরি। এর মধ্যে তার নিজের কাছে আছে ১৫ ভরি, যার মূল্য ৬৫ হাজার টাকা। তাতে স্বর্ণের ভরির দাম হয় ৪ হাজার টাকার কিছু বেশি।
প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা ও কিংবদন্তিতুল্য পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের স্ত্রী জয়া সেনগুপ্তাও হলফনাফায় উল্লেখ করেছেন, তার নিজের নামে ১০ ভরি স্বর্ণ রয়েছে—যার দাম ৪০ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম মাত্র ৪ হাজার টাকা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এ বিষয়ে তার বিবরণীতে নিজের নামে বিবাহকালীন সময়ের ৩০ ভরি স্বর্ণ দেখিয়েছেন। অর্জনকালীন যার মূল্য উল্লেখ করেছেন ৯০ হাজার টাকা। এই হিসেবে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম পড়েছে ৩ হাজার টাকা।
জয়া সেনগুপ্তাও দাবি করেছেন, স্বর্ণের দাম যে ৪০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে সেটি তার স্বামী বিয়ে এবং অন্যান্য সময় কিনে দিয়েছিলেন। ওই সময় স্বর্ণের দাম আজকের দামের মতো ছিল না। সেজন্য অর্জনকালীন সময়ের মূল্য দেখানো হয়েছে।
যদিও প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ৩-৪ হাজার টাকা দেখানোর বিষয়টি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা ধরনের রসিকতা হচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, অর্জনকালীন সময়ের দাম দেখানোর বিষয়টি যৌক্তিক হলেও স্বর্ণের দাম এত কম দেখানোর পেছনে আরও এক বা একাধিক কারণ থাকতে পারে। যেমন স্বর্ণের প্রকৃত দাম দেখালে সম্পদের পরিমাণ বেড়ে যাবে এবং সেই সম্পদের বিপরীতে তারা সঠিকভাবে ট্যাক্স এবং মুসলিম হলে সঠিক পরিমাণে জাকাত দিয়েছেন কি না—এই প্রশ্ন উঠতে পারে।
এবার আসা যাক প্লটের দামে। রাজধানী ঢাকায় একটি পাঁচ কাঠা প্লটের দাম কত? মানে কত কোটি টাকা? শুনলে অবাক হবেন, একজন এমপি প্রার্থী তার হলফনামায় ঢাকায় তার একটি প্লটের দাম উল্লেখ করেছেন মাত্র ৪০০ টাকা!
বরিশাল-৬ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুল হাফিজ মল্লিক নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামায় রাজধানী ঢাকায় ৪০০ টাকা মূল্যের ৫ কাঠার একটি সরকারি প্লট, ২৯ হাজার টাকা মূল্যের সাড়ে ৩ কাঠার একটি প্লট এবং একটি ৬ তলা বাড়ি থাকার কথা উল্লেখ করেছেন।
নিজের ৩০ ভরি স্বর্ণ রয়েছে বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন হাফিজ মল্লিক, যার মূল্য দেখিয়েছেন ৪০ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ১ হাজার ৩৩৩ টাকা। দেখা যাচ্ছে, আগে উল্লিখিত তিনজনের চেয়ে মল্লিকের কাছে থাকা স্বর্ণের দাম আরও কম!
ঢাকা-১০ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী চিত্রনায়ক ফেরদৌস আহমেদের সাভারের আশুলিয়ায় তার ৭ কাঠা জমি আছে বলে যে তথ্য দিয়েছেন, তার অর্জনকালীন মূল্য দেখিয়েছেন মাত্র ১ লাখ ৬১ হাজার টাকা। আশুলিয়ায় আরও ৭ কাঠা জমির দাম উল্লেখ করেছেন ১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। মিরপুরের বাউনিয়ায় ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ জমির অর্জনকালীন মূল্য ২ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা।
হলফনামায় এই ধরনের তথ্য জনমনে নানাবিধ প্রশ্নের জন্ম দেয়। জমি যে দামে কেনা হয়, রেজিস্ট্রেশনের সময় সেই দাম উল্লেখ করা হয় না সরকারি নানাবিধ ট্যাক্সের ভয়ে। ট্যাক্স রিটার্নেও সম্পদের পরিমাণ কম দেখানোর জন্য সম্পত্তির প্রকৃত ক্রয়মূল্য থেকে অনেক কম দেখানো ওপেন সিক্রেট। অর্থাৎ কাগজে-কলমে যে প্লটের দাম ১০ লাখ টাকা, প্রকৃত অর্থে তার দাম কয়েক গুণ বেশি। তার মানে এটি একটি ‘সর্বজনস্বীকৃত বৈধ গোপনীয়তা’। ফলে প্রার্থীরা মনোনয়নপত্রের সঙ্গে ৮টি কলামে যেসব তথ্য দেন, সেখানে সম্পদের বিবরণীর ঘরে তারা যা লেখেন, তার যে বিরাট অংশই মিথ্যা বা অর্ধসত্য, তা নিয়ে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই।
একটা ঘটনা উল্লেখ করা যাক। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় বিএনপির ডাকসাইটে নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (যুদ্ধাপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত) শিক্ষাগত যোগ্যতার অংশে লিখেছিলেন ‘স্বশিক্ষিত’। তখন নির্বাচন কমিশন তাকে তলব করে এবং এর ব্যাখ্যা দিতে বলেন। ওই সময় শুনানিতে তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এ টি এম শামসুল হুদা স্মিত হেসে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আমরা তো জানি আপনি একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ। বিদেশে পড়াশোনা করেছেন। বড় ডিগ্রি আছে। তারপরও কেন স্বশিক্ষিত লিখলেন।’ চৌধুরী তখন তার স্বভাবসুলভ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলেছিলেন, ‘সার্টিফিকেট পুড়ে গেছে।’ ভেতরের কথা হলো, তখন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছিল এবং তিনিও হলফনামায় স্বশিক্ষিত লিখেছিলেন। সম্ভবত সে কারণেই সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীও নিজেকে স্বশিক্ষিত উল্লেখ করেছিলেন।
তবে শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়, বরং হলফনামায় প্রার্থীরা আরও যেসব তথ্য দেন, সেখানে নিজের নাম পরিচয়ের বাইরে মূলত তার বিরুদ্ধে মামলার বিবরণ (যদি থাকে) এবং সম্পদের বিবরণ উল্লেখ করতে হয়। কিন্তু সম্পদের বিবরণীতেই যে সবচেয়ে বেশি গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়, সেটি যেমন সত্য, তেমনি এই গোপনীয়তার ভেতর থেকেও এমন অনেক সত্য বেরিয়ে আসে, যাতে বোঝাই যায়, দুয়েকজন খুব ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ এমপির কাছেই সংসদ সদস্য পদ আসলে একটি আলাদিনের চেরাগ। কেননা সংসদ সদস্য হওয়ার আগে হলফনামায় তারা যে সম্পদের বিবরণ দিয়েছেন, পরে নির্বাচনের সময় দাখিল করা হলফনামায় দেখা যায় তাদের সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে কয়েকশো গুণ।
সংসদ সদস্য হিসেবে তারা যে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পান, তাতে মাত্র পাঁচ বছরে স্বাভাবিক পথে কারও পক্ষে কোটিপতি হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু দেখা যায় শুধু কোটি নন, তাদের কেউ কেউ শত কোটি টাকারও মালিক হয়ে যাচ্ছেন। তার মানে তারা হয় সরকারের নানা প্রকল্প থেকে কোটি কোটি টাকা লুট করেছেন অথবা এমপি পদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে বৈধ-অবৈধ নানা উপায়ে বিপুল সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকজনের হলফনামা সম্পর্কিত সংবাদ শিরোনামে চোখ বুলানো যাক
১. এমপি হওয়ার আগে মাসিক আয় ছিল ৪১৭ টাকা, এখন স্ত্রীও কোটিপতি : ডেইলি স্টার বাংলা, ১২ ডিসেম্বর ২০২৩। ২. ১৫ বছরে মির্জা আজমের সম্পদ বেড়েছে ১২২ গুণ : প্রথম আলো, ১০ ডিসেম্বর ২০২৩। ৩. বই লিখে ওবায়দুল কাদেরের বছরে আয় ৪ লাখ টাকা : দৈনিক ইত্তেফাক, ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩।
প্রথম শিরোনামের ব্যক্তি বগুড়া-৭ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মো. রেজাউল করিম বাবলু। পাঁচ বছর আগেও যার মাসিক যায় ছিল ৪১৭ টাকা, বর্তমানে তার মাসিক আয় ৩ লাখ ২ হাজার ২৮ টাকা। প্রশ্ন হলো, এমপি হওয়ার আগে তার মাসিক আয় ছিল ৪১৭ টাকা, এটা কি কেউ বিশ্বাস করে? যার মাসিক আয় ৪১৭ টাকা, তার পক্ষে বাংলাদেশে এমপি হওয়া সম্ভব? কেউ তাকে ভোট দেবে? আর এখন যে তিনি লিখলেন তার মাসিক আয় ৩ লাখ টাকা, এটাও কি বিশ্বাসযোগ্য?
দুই নম্বর শিরোনামের বিষয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা, সাবেক বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমের সম্পদ। তিনি যে হলফনামা দিয়েছেন সেখানে দেখা যাচ্ছে, তিন মেয়াদে তার সম্পদ বেড়েছে ১২২ গুণ। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে তার স্ত্রী আলেয়া আজমের সম্পদও। ১৫ বছরে তার সম্পদ বেড়েছে ৭৯ গুণের বেশি। কীভাবে এত সম্পদ বাড়ল? সবই কি বৈধ পথে?
৩. তিন নম্বর শিরোনামের বিষয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। হলফনামায় তিনি উল্লেখ করেছেন, বই লিখে বছরে তিনি চার লাখ ২৫ হাজার ৩০০ টাকা আয় করেন। বই লিখে মানে বইয়ের রয়্যালটি বাবদ তিনি এই অর্থ পান। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই বিষয়টিও আলোচনায় আছে। কেননা বাংলাদেশে জনপ্রিয় লেখকদের বইয়ের বিক্রি এবং লেখকদের রয়্যালটির বাস্তবচিত্র নিয়েই যেখানে নানাবিধ প্রশ্ন আছে, সেখানে একজন রাজনৈতিক নেতা বইয়ের রয়্যালটি বাবদ বছরে চার লাখ টাকা পেলে সেটি অবশ্যই আশার সংবাদ।
হলফানামায় উল্লিখিত সম্পদের বিবরণীর বিরাট অংশই যে বিশ্বাসযোগ্য নয়, সেটি প্রার্থীরা যেমন জানেন, তেমনি নির্বাচন কমিশনও জানে। সাধারণ মানুষও জানে বলে এ নিয়ে রসিকতা করে। কিন্তু সেই রসিকতার মধ্য দিয়ে মূলত রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে মানুষের যে গড়পরতা ধারণা এবং তাদের সততা যেরকম প্রশ্নবিদ্ধ—সেগুলোই প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রশ্ন হলো, নির্বাচন কমিশন কি হলফনামায় উল্লিখিত সম্পদের এই অস্বাভাবিক মূল্য নিয়ে প্রার্থীদের কোনো প্রশ্ন করে বা এররকম অবাস্তব হিসাব দেওয়ার কারণে কি কারও প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে?
এমপি হওয়ার পরে যাদের সম্পদ বহুগুণ বেড়েছে, যারা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন, যাদের সম্পদ বৃদ্ধির চিত্র দেখে মনে হয় যে তারা আলাদিনের চেরাগ পেয়েছেন—তাদের ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশন কি অনুসন্ধান করেছে বা করবে?
বহুদিন ধরেই এটা বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা হচ্ছে রাজনীতি। যে কারণে এমপি, মেয়র, চেয়ারম্যান পদে জয়ী হওয়া তো বটেই, ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পাওয়ার জন্যই ভীষণ যুদ্ধ চলে। কোটি কোটি টাকা খরচ হয়ে যায় মনোনয়ন পেতে গিয়েই। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় একটি বিষয় খুব পরিষ্কার হয়ে গেছে, ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পাওয়া মানেই জয় নিশ্চিত। আর জয়ী হলেই সুদে-আসলে সব টাকা উঠে আসবে। ফলে তারা যদি হলফনামায় স্বর্ণের ভরি এক হাজার টাকা কিংবা রাজধানীতে এটি প্লটের দাম চারশো টাকাও দেখান—তা নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ হবে, সোশ্যাল মিডিয়ায় রসিকতা হবে বটে—আখেরে এই প্রবণতা বন্ধ হবে না। কেউ এর জন্য জবাবদিহি কিংবা বিচারের মুখোমুখিও হবেন না। কারণ টাকা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাই এখন সবকিছুর নিয়ন্ত্রক।
আমীন আল রশীদ : কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন
মন্তব্য করুন