অন্জন কুমার রায়
প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:০৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

দুর্বল ব্যাংক সবল ব্যাংকের সঙ্গে একীভূতকরণের পর কী হবে?

প্রতীকী ছবি।
প্রতীকী ছবি।

করোনা-পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যার ফলে বাংলাদেশে একসময়ের লাভজনক, দ্রুত বর্ধনশীল, গতিশীল এবং অত্যন্ত উদ্ভাবনী ব্যাংকিং খাত ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ব্যাংকিং সেক্টরে নন পারফর্মিং এসেট (NPA) বৃদ্ধি পায়, তারল্য সংকট দেখা দেয়। সেজন্য, ব্যাংকিং খাতকে সংস্কারের উদ্দেশ্যে দেশের সব দুর্বল বা খারাপ ব্যাংকগুলোকে সবল বা ভালো ব্যাংকের সাথে একীভূত (মার্জ) করার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ইতোমধ্যে মূলধনের পর্যাপ্ততা, শ্রেণিকৃত ঋণের মাত্রা, ঋণ-আমানত অনুপাত এবং প্রভিশনিং বা নিরাপত্তা সঞ্চিতির পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংককে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের ব্যাংকিং খাত সংস্কারের জন্য এমন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে থাকছে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও ভেঙে পড়া করপোরেট সুশাসন ফেরানোর তাগিদ। পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকগুলোর উন্নতি না হলে সেগুলো অন্য ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত (মার্জ) করার বার্তা রয়েছে। যার প্রথম উদ্যোগ হিসেবে এক্সিম ব্যাংক এবং পদ্মা ব্যাংক একীভূতকরণ।

গত ১৪ মার্চ ব্যাংক দুটি একীভূতকরণ করা হয়। পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, সোনালি ব্যাংক ও বিডিবিএল ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংক এবং ইউসিবি ও ন্যাশনাল ব্যাংক একীভূত করার ঘোষণা দেওয়া হয়।

বিভিন্ন কারণে ব্যাংকগুলো সংকটের সম্মুখীন হতে পারে। হতে পারে ব্যাংক রান কিংবা নন পারফর্মিং এসেট বৃদ্ধির মতো ঘটনা। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যাংক রানের মতো ঘটনা না ঘটলেও কিছু ব্যাংকে নন পারফর্মিং এসেট তীব্র আকার ধারণ করেছে। মন্দ ঋণগুলো থেকে টাকা আদায় দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। কেউ কেউ ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, আবার কেউ কেউ কৌশলগত ঋণখেলাপি হচ্ছে। স্বভাবত এ সকল নন পারফর্মিং এসেট আর্থিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

তবে, ব্যাংক একত্রীকরণ নীতিগুলো স্বতন্ত্র নীতি নয় বরং মুদ্রা ও রাজস্ব নীতির অন্যান্য দিকগুলোর সাথে একত্রে প্রণয়ন করা হয়। তাই ব্যাংক একত্রীকরণের ফলে খেলাপি ঋণের সংখ্যা হ্রাস পায় (উন্নত ঋণ স্ক্রিনিং এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা) এবং অর্থনীতির আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে। কারণ ভালো ব্যাংক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি যদি আর্থিকভাবেও ভালো হয়, তাহলে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংককে বাঁচাতে পারে। ২০২২ সালে একটি গবেষণায় একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো থেকে দুর্বল ব্যাংকের নন পারফর্মিং এসেট (NPA) নিয়ে গবেষণা করা হয়।

গবেষণায় দুর্বল একত্র হওয়া ব্যাংকগুলোর NPA পূর্বের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ হ্রাস পায়। এছাড়াও একীভূত হওয়ার ফলে বৃহত্তর ব্যাংকগুলোর ব্যর্থতার কম সম্ভাবনা থাকে এবং ঋণগ্রহীতাদের ভবিষ্যতে ঋণ প্রবাহ অব্যাহত থাকে। তাই লোন পারফরম্যান্সের উন্নতি দুর্বল একীভূত ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের দ্বারা পরিচালিত হতে পারে যেখানে কৌশলগত ডিফল্ট হওয়ার সম্ভাবনা কমে আসে।

২০০৭ সালে ফিলিপ বন্ড এবং অশোক রাইয়ের একটি গবেষণায় 'Borrower Run'- কে ব্যাংকের স্বাস্থ্যের অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ঋণগ্রহীতা যে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে, প্রাথমিকভাবে অনুমান করে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের ঋণ গ্রহণ করতে পারবে। কিন্তু যদি মনে করে শেষ পর্যন্ত ব্যাংকটি ভেঙে পড়বে, তাহলে ভবিষ্যতে ব্যাংকটি থেকে ঋণ পাওয়ার আশা কমে যাবে।

সে পরিস্থিতিতে অনেক ঋণগ্রহীতার ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা থাকলেও ঋণ পরিশোধ করতে চায় না কিংবা বিলম্বে ঋণ পরিশোধ করে যাকে 'Borrower Run' বলে। 'Borrower Run' কে কৌশলগত খেলাপিও বলা হয়। ফলে কিছু ঋণগ্রহীতার খেলাপি হওয়ার প্রত্যাশা বৃহত্তর স্কেলে খেলাপি ঋণকে আরও বাড়িয়ে তুলে। ঋণগ্রহীতার আস্থার সংকটের জন্যই এমন হয়। ১৯৯৪ সালে ম্যাক্সিকান ব্যাংকগুলোতে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছিল। তার অন্যতম কারণ ছিল কৌশলগত খেলাপি এবং ঋণগ্রহীতাদের সমন্বয় ব্যর্থতা। সেজন্য, শক্তিশালী ব্যাংকের সাথে দুর্বল ব্যাংকের একীভূতকরণের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধের শৃঙ্খল উন্নত হতে পারে এবং ঋণগ্রহীতার আস্তার সংকট কাটিয়ে উঠতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে করোনা পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে গ্রাহকের চাহিদার জন্য অর্থের প্রয়োজন পড়ে। নগদ টাকার সংকট মেটাতে গ্রাহকরা সিভি ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা আমানত ভাঙতে শুরু করে। ব্যাংকটি নগদ তহবিল জোগান দিতে সমস্যায় পড়ে। খবর ছড়িয়ে পড়ে, ব্যাংকটির যতটা অর্থ প্রয়োজন, ততটা জোগাড় করতে পারছে না। ফলে ব্যাংকে তারল্য সমস্যা সৃষ্টি হয়ে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। মূলত ব্যাংকের প্রতি আমানতকারীদের আস্তার সংকটের জন্য এমন হয়। তাই, পরবর্তীতে সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক ফার্স্ট সিটিজেন ব্যাংকের সাথে, সিগনেচার ব্যাংক ফ্ল্যাগস্টার ব্যাংকের সাথে এবং ফার্স্ট রিপাবলিক ব্যাংক চেজের সাথে একীভূত করা হয়। ব্যাংকিং সেক্টরের সামগ্রিক পতন রোধ করতে ব্যাংকগুলোকে প্রায়ই বড় এবং আরও স্থিতিশীল ব্যাঙ্কগুলোর সাথে একীভূত করা হয়। কারণ, একত্রীকরণ সত্তা দুটি পূর্বের পৃথক প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চ কর্মক্ষমতার দিকে পরিচালিত করে। এছাড়াও ব্যাংকগুলোর স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর জন্য একীভূত করা প্রয়োজন।

মূলত একীভূতকরণ ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি আর্থিক বাজারের গতিশীলতাকেও প্রভাবিত করে। সে লক্ষ্যে ভারত ও চীনের অর্থনীতিতে ব্যাংকের একত্রীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভারতে পাবলিক সেক্টর ব্যাংকগুলোকে একত্র করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পদক্ষেপগুলোর লক্ষ্য ছিল ভালো, দক্ষ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য বড় আকারের ব্যাংক তৈরি করা। জাপানে ১৯৯০ দশকের শেষের দিকে আর্থিক সংকটের পর সরকার ব্যাংক একত্রীকরণে পদক্ষেপ নেয়। স্কেল অর্থনীতির মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন এবং ভবিষ্যতে ব্যাঙ্কগুলোর স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর লক্ষ্যে এটি করা হয়েছিল। মূলত একত্রীকরণ ব্যাংকিং সেক্টরের কাঠামোকে পরিবর্তন করে যা ব্যাংকের ঋণ প্রদানের আচরণ, বাজারের প্রতিযোগিতা এবং মুদ্রানীতি ট্রান্সমিশন মেকানিজমকে প্রভাবিত করে। যদিও ব্যাংক একীভূতকরণে সাধারণ গ্রাহকদের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। তাদের রক্ষিত আমানত নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে। যে সকল গ্রাহক আর্থিক পরিষেবার ওপর নির্ভর করত তাদের অনেকেই ভাবতে পারে সেগুলো নাও থাকতে পারে। তবে সে উদ্বেগগুলো কম বাস্তবতা।

ব্যাংক একীভূতকরণ শুধু ব্যাংকিং শিল্প জগতে ব্যাংকের সংখ্যা হ্রাস করার একটি পন্থা নয় বরং অন্তর্নিহিত সমন্বয়, দক্ষতা বৃদ্ধিসহ অর্থ সরবরাহ, সুদের হার এবং মূল্যস্ফীতির মতো কারণগুলোকে প্রভাবিত করে। যার ফলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। একীভূতকরণের মূল চালিকাশক্তি ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, বর্ধিত অর্থনীতি, বাজারের অংশীদারিত্ব যা একটি ব্যাংকের সম্প্রসারণকে ত্বরান্বিত করে এবং নতুন শাখা স্থাপনের বিকল্প হতে পারে। একই শিল্পের মধ্যে যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে তা হ্রাস পাবে, প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নত হবে। সৃষ্ট নতুন ব্যাংক গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে আরও পণ্য এবং পরিষেবা অফার করতে পারে।

যদিও, মূল লক্ষ্য খারাপ ঋণের ফলে উদ্ভূত আর্থিক সংকট কমানো এবং তা থেকে বেরিয়ে আসা। একীভূতকরণের সাথে ব্যাংকিং শিল্পের পুনর্গঠন লাভজনকতার পাশাপাশি গ্রাহক পরিষেবা আরও বিস্তৃত হবে। তবে, ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের শক্তিশালী স্মার্ট ব্যাংকিং প্রতিশ্রুতি দিয়ে একীভূতকরণের চেষ্টা করে। সঠিকভাবে তা না হলে একীভূতকরণের উদ্দেশ্য ম্লান হয়ে যেতে পারে। কারণ, ব্যাংক একীভূতকরণ একটি আঁটসাঁট সময়সীমার মধ্যে গ্রাহকদের পরিবর্তন ঘটায়।

অন্জন কুমার রায়: ব্যাংক কর্মকর্তা

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঝিনাইদহে ধর্ষণ মামলায় ইউপি চেয়ারম্যানের যাবজ্জীবন

ঝড়ের মধ্যে চাঁদপুরে বিদ্যুতের ২৩ মিটার চুরি

ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শনে পটুয়াখালী যাবেন প্রধানমন্ত্রী

ঘূর্ণিঝড় রিমাল / বরগুনায় পানিবন্দি ১০ হাজার পরিবার

আরও তিন উপজেলার ভোট স্থগিত

পরীক্ষা দিতে গিয়ে নিখোঁজ, খালে মিলল মরদেহ

সরকারি চাকরিতে ৩ লাখ ৭০ হাজার পদ ফাঁকা : জনপ্রশাসনমন্ত্রী

সর্বজনীন পেনশন স্কিম বাতিলের দাবি বুটেক্স শিক্ষকদের

আম্বানির ছেলের বিয়েতে মঞ্চ মাতাবে শাকিরা, ডুয়া লিপা ও এ আর রহমান

গভীর রাতে ঘরে ঢুকে নাতি-দাদির প্রাণ নিল ডাকাতদল

১০

অভিজ্ঞতা ছাড়া ইবনে সিনায় নিয়োগ, পাবেন অনেক সুবিধা

১১

ঘুর্ণিঝড় রিমাল / গৌরনদী উপজেলা পরিষদ নির্বাচন স্থগিত

১২

গাজীপুরে কাভার্ডভ্যান চাপায় পোশাক শ্রমিক নিহত

১৩

উপকূলে এখনো থামেনি ঘূর্ণিঝড় রিমালের দাপট

১৪

দেশ বাঁচাতে হলে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে : দুদু

১৫

ভারতীয় বিশ্বকাপ স্কোয়াডের আইপিএল পারফরম্যান্স কেমন

১৬

আন্তর্জাতিক সংস্থায় চাকরি, বেতন ৬৩,৯৬৪ টাকা

১৭

অবৈধ মাটির ট্রাক চলাচলে সড়ক ও ফসলি জমি হুমকির মুখে  

১৮

আজই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে ইউরোপের ৩ দেশ

১৯

গুচ্ছে ভর্তি আবেদনের সময় বাড়ল

২০
X