ড. সৈয়দ আবুল বাশার
প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২৩, ০২:২০ পিএম
আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৩, ০২:৪২ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ড. সৈয়দ আবুল বাশারের নিবন্ধ

মূল্যস্ফীতি বাড়লে সরকারের সুবিধা?

সৈয়দ আবুল বাশার। ছবি : সৌজন্য
সৈয়দ আবুল বাশার। ছবি : সৌজন্য

ধরুন বাজারে আপনার ১০ লাখ টাকা দেনা আছে। এই দেনা শোধ করার কয়েকটা পন্থা আছে। যেমন আপনি সম্পত্তি বিক্রি করতে পারেন, অথবা অন্য কারও থেকে আবার ধার করতে পারেন অথবা ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারেন। কিন্তু যখন এই সব পন্থা কাজ না করে, তখন আপনার পালানো বা শ্রীঘরে যাওয়া ছাড়া উপায় নাই। কিন্তু সরকারের জন্য ব্যাপারটা ভিন্ন। সরকার যদি জনগণের থেকে বন্ডের (সঞ্চয়পত্রের) মাধ্যমে, ব্যাংক অথবা বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নাও পায়, শেষ অবলম্বন হিসেবে সরকারের একটি অদ্বিতীয় পন্থা আছে, সেটা হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া যা টাকা ছাপার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। আপনি বলতে পারেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের কথামতো কেন টাকা ছাপাবে। অনেক দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে পরিচালনা করে, তারা সরকারের সব কথায় রাজি নাও হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের কথা ভিন্ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর একজন সাবেক সরকারি আমলা। তিনি জি-হুজুর গোছের মানুষ, তার পক্ষে সরকারের অপরিণামদর্শী নীতির বিপক্ষে চ্যালেঞ্জ করা অসম্ভব। তাই নিয়মমাফিকভাবে বলতে গেলে সরকারের জন্য নতুন ঋণ নেওয়া কোনো বড় বাধা না, টাকা ছাপালেই হলো।

নতুন ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি ঋণ শোধ করাটাও সরকারের জন্য তুলনামূলকভাবে সহজ, তার জন্য মূল্যস্ফীতি একটি বড় ভূমিকা রাখে। মূল্যস্ফীতি (ইনফ্লেশন) বাড়লে, ঋণ শোধ করার ক্ষমতাও বাড়ে। ধরুন সরকারের ঋণের পরিমাণ ১০০ টাকা, যেটা হলো নামমাত্র (নমিনাল) বকেয়া পরিমাণ। কিন্তু প্রকৃত (রিয়েল) ঋণের পরিমাণ ১০০ টাকার কম যদি মূল্যস্ফীতি বেশি থাকে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে ঋণের এই সম্পর্কটা একটি উপমা দিয়ে বর্ণনা করা যেতে পারে। ধরুন আপনি একটি ম্যারাথনে অংশগ্রহণ করছেন যার দূরত্ব হলো ১০ মাইল। এটা হলো নমিনাল দূরত্ব—যা ১০০ টাকা নমিনাল ঋণের সমতুল্য। এই ১০ মাইল দূরত্ব পাড়ি দেওয়া আপনার জন্য সহজ হবে যদি আপনার ফিটনেস ভালো থাকে এবং একটা যথাযথ দৌড়ানোর জন্য জুতা পায়ে থাকে। এখানে ফিটনেসটা হলো অনেকটা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মতো। প্রবৃদ্ধি বেশি হলে সরকারের ঋণ শোধ করার ক্ষমতাও বেড়ে যায়। আর যথাযথ দৌড়ানোর জুতা অনেকটা কম সুদহারের মতো। ঠিক যেভাবে একটি ভালো জুতা দৌড়ানোকে আরামদায়ক করে, বাজারে সুদের হার কম থাকলে ঋণ শোধ করাটা সহজ করে দেয়। এখন ধরুন ম্যারাথনের পথটা কিছুটা ঢালু। এই ঢালু পথে ১০ মাইল পাড়ি দেওয়া আরও বেশি সহজ হবে এবং প্রকৃত দূরত্ব ১০ মাইলের কম মনে হবে। এই ঢালু পথটিই হলো মূল্যস্ফীতি বা ইনফ্লেশন। ঠিক যেভাবে ঢালু পথে দৌড়ানো বেশ সহজের, ঠিক একইভাবে মূল্যস্ফীতির সময়ে সরকারের জন্য ঋণ শোধ দেওয়াও অনেকটা সহজের। এজন্যই সরকারের উৎসাহ থাকে ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর, আর এই কাজটা টাকা ছেপে সবচেয়ে দ্রুত সময়ে করা যায়।

কিন্তু পথ আবার বেশি ঢালু হলে, দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বেড়ে যায় এবং ফিট থেকে আপনি আনফিট হয়ে যাবেন। ঠিক তেমনিভাবে মূল্যস্ফীতি বেশি হলে অর্থনীতিতে অস্থিরতা বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এর ফলে ঋণ শোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সরকারের নীতি-নির্ধারকরা এই ব্যাপারটা জানে। কিন্তু একটি বিষয় জানা আর তার সফল রূপদান করা এক ব্যাপার না। উন্নত দেশগুলো যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, যুক্তরাজ্য প্রতিনিয়ত টাকা ছাপাচ্ছে। কিন্তু এই দেশগুলোর সুবিধা হলো—তারা তাদের দেশের মূল্যস্ফীতি বিশ্বের বাকি দেশগুলোতে রপ্তানি করে দিতে পারে। কারণ তাদের মুদ্রা পৃথিবীর সব দেশে লেনদেন হয়। প্রতি ১০০ মার্কিন ডলারের ৫২ ডলারই যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। তাই ডলার ছাপানোর সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায় না। কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভিন্ন। যেহেতু টাকার কোনো বৈদেশিক চাহিদা নেই, পণ্য এবং পরিষেবা সরবরাহ না বাড়িয়ে শুধু টাকা ছাপালে মূল্যস্ফীতি বাড়বেই। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মন্তব্য করেছেন—টাকা ছাপালে মূল্যস্ফীতি হবে না, এই কথাটা শুনতে অনেকটা এরকম—ধূমপান করলে ফুসফুসের ক্যান্সার হবে না। সব ধূমপানকারীরা ক্যান্সারে আক্রান্ত না হলেও, ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে ছাপানো টাকার ফলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও বেশি কারণ আমাদের শাসন কাঠামো দুর্বল। তাই টাকা ছাপানোর বিষয়টি খুব সামান্য বলে উড়িয়ে দেওয়া উচিত না।

বলার অপেক্ষা রাখে না, যেহেতু সরকারের কর আয় বেশ কম যেটা টাকা ছাপানোর ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। তাই সরকারের উচিত কীভাবে করদাতা এবং করের পরিমাণ বাড়ানো যায় সেই পন্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে একটা টার্গেট দেওয়া উচিত—আগামী দুই বছরের মধ্যে করদাতার সংখ্যা এবং কর আয়ের পরিমাণ দুইই একটি লক্ষ্যে নিয়ে আসা দরকার। আর টার্গেট না পূরণ হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই করদাতাকে হয়রানি করা যাবে না। সরকারের আয় বাড়লে টাকা ছাপানোর আবশ্যকতা থাকবে না।

ড. সৈয়দ আবুল বাশার, অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জনগণের মতামতের ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার আমিনুলের

মানুষের অধিকার ও সেবার অঙ্গীকার করে রবিনের নির্বাচনী প্রচারণার শুরু

বাকি জীবন আপনাদের সঙ্গে থাকতে চাই : মিন্টু

মৌলভীবাজারে জনসমাবেশের উদ্দেশ্য তারেক রহমান

৩৩ যাত্রী নিয়ে উল্টে গেল বাস

পাকিস্তানি গণমাধ্যমের দাবি / বাংলাদেশ না গেলে পাকিস্তানও বিশ্বকাপ বয়কট করতে পারে

জনগণের সরকার গঠনের অঙ্গীকারে গণসংযোগ শুরু ইশরাকের

তারেক রহমানকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত মৌলভীবাজার

জোট নেতাদের সঙ্গে নিয়ে ভোটের মাঠে মঞ্জু

নির্বাচনের আগেই একটি দল ঠকাচ্ছে : তারেক রহমান

১০

আমরা না থাকলে সবাই জার্মান ভাষায় কথা বলত: ট্রাম্প

১১

পুরো আসরজুড়ে ব্যর্থ মিরাজের পারফরম্যান্স নিয়ে মুখ খুললেন সিলেট কোচ

১২

অফিসে রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখুন সহজ কিছু উপায়

১৩

এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখ্য সমন্বয়কারী তারিকুল

১৪

সিলেটে বিএনপির জনসভায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ৪ নেতাকর্মী

১৫

উন্নয়নের নামে জনগণের সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার হয়েছে : তারেক রহমান

১৬

হাদির কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে এনসিপির নির্বাচনী প্রচার শুরু

১৭

বিশ্বকাপ ইস্যুতে বাংলাদেশের কড়া সমালোচনা সাবেক ভারতীয় তারকার

১৮

ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স / রোগী দেখার পাশাপাশি গণভোটের প্রচারে চিকিৎসকরা

১৯

জুলাই যোদ্ধার কবর জিয়ারতের মাধ্যমে জামায়াত প্রার্থীর প্রচারণা শুরু

২০
X