

যুক্তরাষ্ট্র শনিবার ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে গেছে। এরপর দেশটিতে ক্ষমতা কার হাতে—তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মাদুরো অনুপস্থিত থাকলেও ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রক্ষমতা এখনো তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের হাতেই রয়েছে।
মাদুরো আটক হওয়ার পর ভেনেজুয়েলার আদালতের আদেশে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেস অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। বিচার বিভাগ ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমর্থন রয়েছে তার প্রতি। তিনি মাদুরোর অন্যতম আস্থাভাজন হিসেবেই পরিচিত।
শনিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে রদ্রিগেস মাদুরোর মুক্তি দাবি করেন এবং বলেন, নিকোলাস মাদুরোই ভেনেজুয়েলার ‘একমাত্র বৈধ প্রেসিডেন্ট’।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, নিরাপদ ও যথাযথভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বাস্তবে দেশটির অভ্যন্তরে এমন কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত এখনো স্পষ্ট নয়।
মাদুরো আটক হলেও সরকার, কংগ্রেস এবং নিরাপত্তা কাঠামো এখনো তার শীর্ষ মিত্রদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা কীভাবে পরিচালিত হবে, কারা এতে যুক্ত থাকবে—সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি। তিনি শুধু বলেছেন, এটি হবে একটি ‘দলগত প্রচেষ্টা’।
ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং রদ্রিগেস যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া অনুযায়ী কাজ করতে আগ্রহী।
তবে রদ্রিগেস প্রকাশ্যে মাদুরোকে সমর্থন দিচ্ছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ভেনেজুয়েলার ওপর ‘সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণ’ চাপাতে দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। এতে ট্রাম্পের দাবির সঙ্গে তার বক্তব্যের সরাসরি বিরোধ দেখা যাচ্ছে।
ক্ষমতার কেন্দ্রে কারা
ডেলসি রদ্রিগেস ও তার ভাই জর্জ রদ্রিগেস বর্তমানে ভেনেজুয়েলার কংগ্রেসের নেতৃত্বে রয়েছেন। মাদুরো ২০১৩ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তারা রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।
এ ছাড়া হুগো শাভেজের ঘনিষ্ঠ সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ডিওসডাডো কাবেল্লোও ক্ষমতাকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাদুরোকে আটক করার ঘটনায় এই তিন শীর্ষ নেতা প্রকাশ্যে একত্রিত অবস্থান নিয়েছেন।
নির্বাহী শাখার পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে রয়েছে সশস্ত্র বাহিনী। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো রদ্রিগেসের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেনাবাহিনী সক্রিয় রয়েছে। মাদুরোকে আটক করার ঘটনাকে তিনিও ‘অপহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী অবস্থান
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ভেনেজুয়েলা এখন কী করে, সেটির ওপর ভিত্তি করেই যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে। অন্তর্বর্তী সময়ে ভেনেজুয়েলার নেতারা প্রকাশ্যে কী বলছেন, তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মুখ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে ‘পরীক্ষা’ করবে। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত না নিলে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সব বিকল্প খোলা রাখবে ওয়াশিংটন।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা
ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো গ্রহণযোগ্যতা নেই বলেও মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। যদিও মাচাদো ২০২৪ সালের নির্বাচনে এডমুন্ডো গনজালেসের পক্ষে ব্যাপক সমর্থন জোগাড় করেছিলেন।
এদিকে, ভেনেজুয়েলায় অবৈধ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে কলম্বিয়ান গেরিলা সংগঠন ও ইএলএনের মতো গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করেছে এবং মাদক পাচার রুট নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে ক্ষমতার ভারসাম্য আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সামনে কী হতে পারে
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, আপাতত ভেনেজুয়েলায় নতুন কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা নেই। তবে ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আবার হামলার সম্ভাবনার কথাও উড়িয়ে দেননি।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় প্রবেশ করে অবকাঠামো উন্নয়ন ও তেল উত্তোলনে যুক্ত হতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ব্যয় করা অর্থ ফেরত নেবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি করবে।
ভেনেজুয়েলা সরকার অবশ্য এই অবস্থানকে দেশটির তেল ও খনিজ সম্পদ দখলের চেষ্টা হিসেবে দেখছে। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র জোর করে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করতে চাইছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুত ভেনেজুয়েলাতেই রয়েছে। যদিও এই তেল ভারি ও পরিশোধন জটিল, তবু ডিজেল ও আসফাল্ট উৎপাদনে এটি গুরুত্বপূর্ণ।
মন্তব্য করুন