হরেক মুখরোচক নাশতা। দামটাও হাতের নাগালে। বসার জন্য আছে একরাশ ছায়া। আড্ডার জন্য এমন জায়গাই তো চাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ দৃশ্যপট চিন্তা করলে সবার আগে একটা নাম মাথায় আসবে—শ্যাডো। লেকচার থিয়েটার ও কলা ভবনের পাশ ঘেঁষে তুমুল ব্যস্ত দোকান এটি। আকারে ছোট হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঢাবিয়ানদের অজস্র স্মৃতি। কয়েক মাস পরই প্রতিষ্ঠার তিন যুগ পার করবে এই শ্যাডো। ঘুরে এসে লিখেছেন সিফাত রাব্বানী, ছবি : রনি বাউল-
২০১৮ সালের মে মাস। আমরা কয়েকজন ঢাবির কলা ভবনে গেলাম এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। ও তখনো ক্লাসে, এদিকে তীব্র গরমে অপেক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছিল না। অবশেষে ও নিচে এসেই আমাদের নিয়ে গেল শ্যাডোতে। সবার হাতে এক গ্লাস করে ঠান্ডা লেবুর শরবত হাতে দিতে বলল ‘নে এবার গিলে ফেল।’ মুহূর্তেই শীতল গলা, শীতল পেট। দামটা শুনে সঙ্গে সঙ্গে বললাম, ‘আরেক গ্লাস প্লিজ।’
সেদিনই প্রথম শ্যাডোর লেমোনেডের সঙ্গে আমার পরিচয়। যতবারই কারণে-অকারণে ঢুঁ মেরেছি, এক গ্লাস লেমনেড মিস করিনি কখনো। আজও সন্ধ্যায় বের হয়ে সোজা চলে গেলাম ক্যাম্পাস শ্যাডোতে। পরিকল্পনা ছিল সন্ধ্যার নাস্তা সারা। কিছুক্ষণ ঘুরঘুর করার পর অগ্রিম ২০ টাকা বিল দিয়ে নিলাম ডাল আর পাঁচটি লুচি। খেতে খেতে কৌতূহল জন্মাল এর ইতিহাস জানার। একজন দেখিয়ে দিল ‘ওই যে ম্যানেজার রানা ভাই’। কথা বলার জন্য আগ বাড়ালাম। রানা জানালেন, ১৯৮৮ সালে চালু হয়েছে এই দোকান। তার মামা চালু করেছিলেন। এখনো তিনি মূল কর্তা। তবে ২০০৪ সাল থেকে দোকানে আছেন তিনিও। তিনিই এখানকার ম্যানেজার। দোকানে বেচাকেনা শুরুতে যেমন ছিল এখনো তাই।
নাম শ্যাডো হলো কেন? রানা জানালেন, গাছের ছায়ায় দোকানটা হওয়ার পর এটার নাম হয়ে যায় শ্যাডো, পুরো নাম ক্যাম্পাস শ্যাডো। তবে শ্যাডো নামেই চেনে সবাই। আবার লোকমুখে জানা যায়, শ্যাডোর পাশ ঘেঁষে দুপাশে আছে গাড়ি পার্ক করার শেড। দোকান ও শেড, দুয়ে মিলে শ্যাডো। প্রাক্তন যারা, তারাও ক্যাম্পাসে এলে এই শ্যাডোতে গল্পে বসেন, স্মৃতিচারণ করেন।
শ্যাডোর পাশেই বেশকিছু ফটোকপির দোকান। কয়েকটি দোকান তো দুই দশকও পার করে ফেলেছে। ক্যাম্পাস খোলা থাকার দিন সকালে, অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার শেষ দিনে কিংবা পরীক্ষার আগের রাতে এখানে থাকে দীর্ঘ লাইন।
যা পাবেন শ্যাডোতে
খাবার হাতে নেওয়ার সামনেই দেখবেন টানিয়ে দেওয়া হয়েছে ইংরেজিতে একখানা নোটিশ। যা অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, আগে টাকা পরিশোধ করে পরে খাবার নিন।
শ্যাডোতে এখন লেমনেড ১০ টাকা, চিকেন খিচুড়ি ৬০ টাকা, ডিম খিচুড়ি ৪০ টাকা। এ ছাড়া রয়েছে চিকেন বার্গার ও চিকেন পিৎজা ৪০ টাকায়। ভেজিটেবল রোল ১৫ টাকা। বিকেল থেকে বন্ধ করার আগ পর্যন্ত পাওয়া যাবে ৫ পিস লুচি ও ডালের প্যাকেজ ২০ টাকায়। দুধ চা ১০ টাকায় ও রং চা ৫ টাকা। খাবারের মধ্যে লেমনেড, লুচি-ডাল আর আইসক্রিমটাই বেশি প্রিয় সবার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাকিব হাসান বলেন ক্লাসের ফাঁকে অথবা বিকেল কিংবা সন্ধ্যায় শ্যাডোতে একবার যাওয়া হবেই। ক্লাসের বিরতিতে বরফ কুচি দিয়ে এক গ্লাস লেবুর শরবত না খেলে প্রশান্তি আসে না।
চতুর্থ বর্ষের তানজিদ তাহমিদ জানান, কলা ভবনে ক্লাসের ফাঁকে হালকা নাস্তা না হলে চলেই না। আর এর জন্য শ্যাডোর চেয়ে ভালো অপশন নেই। লুচি আর স্যান্ডউইচ খেতে খেতে স্যারদের বোঝানো কঠিন টপিক নিয়ে আলোচনা যেন নিয়মিত অভ্যাস হয়ে গেছে।
প্রায় দেড় দশক আগে ঢাবি ছেড়েছেন ফয়সাল। শ্যাডোতে দেখা হলো তার সঙ্গেও। শ্যাডোতে কেন এসেছেন জানতে চাইলে নস্টালজিক হয়ে বললেন, ‘আমার মতো প্রাক্তন যারা, তাদের কাছে শ্যাডো ঠিক আড্ডা বা নাশতা করার জায়গা নয়। এটা হলো একটা টাইম মেশিন। এখানে বসে চুপচাপ লুচি-ডাল আর চা খেলেই দুম করে বিশ বছর আগে ফিরে যাওয়া যায়। মনে হয় ঠিক ওইখানটায় বসেই কয়েক দিন আগে সুমন, এলিট, বাবু আর শাহেদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে গেলাম।’
মন্তব্য করুন