প্রভাষ আমিন
প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৩, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৩, ১০:২৭ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

কর্মসূচিতে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ আওয়ামী লীগ

কর্মসূচিতে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ আওয়ামী লীগ

আমাদের রাজনীতিবিদরা অন্তত মুখে বলেন, তারা রাজনীতি করেন জনগণের জন্য। যদিও বাস্তবে জনগণের সঙ্গে রাজনীতিবিদদের সম্পর্ক সামান্যই। একদল ক্ষমতায় থাকতে চায়, আরেক দল ক্ষমতায় যেতে চায়। তবে জনগণকে দেখানোর জন্য, জনগণের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা প্রমাণের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো নানা কর্মসূচি পালন করে। এসব কর্মসূচিতে জনগণের কোনো লাভ হয় না, ভোগান্তি বাড়ে শুধু। তবে বাংলাদেশের সংবিধানে সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।’

এটাই গণতান্ত্রিক রীতি, সাংবিধানিক অধিকার। তবে জনসভা বা শোভাযাত্রা সবসময় শান্তিপূর্ণ থাকে না। অতীতে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের নামে অনেক সহিংসতা আমরা দেখেছি। হত্যা, দাঙ্গা, মারামারি, গাড়ি ভাঙচুর, সন্ত্রাস, পেট্রোল বোমা—এসব আমরা ভুলে যাইনি এখনো। একসময় রাজনৈতিক কর্মসূচি মানেই ছিল সহিংসতা। যত বেশি সহিংসতা, কর্মসূচি তত বেশি সফল। সেই জায়গা থেকে আমরা অনেকটাই সরে এসেছি, আসলে দেশি-বিদেশি নানা চাপে সরে আসতে বাধ্য হয়েছি। অনেক দিন তো রাজপথ থেকে রাজনীতি নির্বাসিত ছিল। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে রাজনীতি আবার রাজপথে ফিরেছে। এটা গণতন্ত্রের জন্য স্বস্তির। রাজপথের কর্মসূচিতে জনগণের ভোগান্তি হলেও সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করার অধিকার সব রাজনৈতিক দলেরই আছে। বিরোধীদলের তো আছেই, সরকারি দলেরও আছে। ইদানীং পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে রাজপথ আবার সরগরম হয়ে উঠেছে। টানা ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এবার ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মরিয়া। যে কোনো মূল্যে তারা ক্ষমতায় যেতে চায়। গত ১২ জুলাই থেকে তারা সরকার পতনের একদফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছে। এতদিন বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করলেও এখন দাবি বদলেছে। দাবি আদায়ের জন্য বিএনপি নানা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু বিএনপির এই আন্দোলনে সরকার পতন হয়ে যাবে, এমনটা কেউই মনে করেন না। আমার ধারণা বিএনপিও জানে, এই আন্দোলন দিয়ে আওয়ামী লীগকে হটানো যাবে না। অতীতে এর চেয়ে কঠোর আন্দোলন করেও আওয়ামী লীগকে টলানো যায়নি। আমরা সবাই জানি, বিএনপির এই আন্দোলন আসলে লোক দেখানো। বিএনপি অপেক্ষা করছে, বিদেশি শক্তিগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর চাপ দিয়ে তাদের দাবি আদায় করে দেবে। বিএনপির আন্দোলন সফল হবে কি না, আওয়ামী লীগ সরকার পদত্যাগ করবে কি না—সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করার সাংবিধানিক অধিকার তাদের রয়েছে। অতীতে আমরা দেখেছি বিএনপি কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করলে সরকার এবং সরকারি দল নানাভাবে তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। গত বছর বিএনপি দেশজুড়ে বিভাগীয় সমাবেশ করেছে। কিন্তু সরকার প্রতিটি জায়গায় কৌশলে পরিবহন ধর্মঘট ডাকিয়ে লোক সমাগম কম দেখানোর চেষ্টা করেছে। তাতে অবশ্য হিতে বিপরীত হয়েছে। বাধা সত্ত্বেও বিএনপির বিভিন্ন বিভাগীয় সমাবেশে বিপুল লোকসমাগম হয়েছে। বরং সরকারের কৌশলী বাধা বিএনপির নেতাকর্মীদের আরও চাঙ্গা করেছে। পরিবহন না পেয়ে হেঁটে, রিকশায় এমনকি সাঁতরেও অনেকে বিএনপির কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতির পর সরকার ও সরকারি দলের দমনপীড়ন কমে এসেছে। ইদানীং বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতাকর্মীরা বিনা বাধায় অংশ নিতে পারছেন। ফলে বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে মানুষের অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে। বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে ব্যর্থ আন্দোলন করে আসছে। অনেকেই বলেন, ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেওয়া বিএনপি রাজপথে আন্দোলনের ব্যাপারে অত কৌশলী নয়। বিপরীতে আওয়ামী লীগ হলো আন্দোলনের দল। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত দলটি নানা চড়াই-উতড়াই পেরিয়ে আজকের জায়গায় এসেছে। স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দলটি স্বাধীনতার আগে এবং পরে রাজপথে দীর্ঘ সংগ্রাম করেছে। তাই রাজপথে আন্দোলনের ব্যাপারে দলটি পটু। অতীতে বারবার আন্দোলন করে দাবি আদায় করার রেকর্ড আছে আওয়ামী লীগের। তবে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ ইদানীং রাজপথে বিএনপিকে ফলো করছে। বিএনপি কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করলেই আওয়ামী লীগ একই দিনে একটি পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করছে। অন্তত সাম্প্রতিক কর্মসূচির বিবেচনায় আওয়ামী লীগকে প্রতিক্রিয়াশীল দল বলা যায়। বিএনপি ক্রিয়া করলে আওয়ামী লীগ প্রতিক্রিয়া দেখায়। বিএনপি সমাবেশ ডাকলে আওয়ামী লীগও শান্তি সমাবেশ ডাকে। বিএনপি পদযাত্রা ডাকলে আওয়ামী লীগ শান্তি শোভাযাত্রা ডাকে। আগামী ২৭ জুলাই বিএনপির মহাসমাবেশের দিনেও শান্তি মহাসমাবেশ করবে আওয়ামী লীগ। বিএনপির যেমন সমাবেশ করার অধিকার আছে, আওয়ামী লীগেরও আছে। কিন্তু একই দিনে কর্মসূচি ডাকার মধ্যে একটা উসকানি আছে। আমাদের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তাতে একই দিনে দুই বড় রাজনৈতিক দলের রাজপথে উপস্থিতি এক ধরনের সহিংসতার শঙ্কা তৈরি করে। যেহেতু বিএনপি আগে কর্মসূচি ঘোষণা করছে, আওয়ামী লীগ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, তারপরও উসকানির দায়টা আওয়ামী লীগকেই নিতে হবে। কিছু ঘটলে তার দায় আওয়ামী লীগের ঘাড়েই বর্তাবে। কিন্তু ঘটনা ঘটছে উল্টো; আক্রান্ত হচ্ছে বিএনপি, মামলাও হচ্ছে তাদের নামেই। একই দিনে পাল্টা কর্মসূচি ডাকার যুক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, তারা বিএনপিকে রাজপথ ছেড়ে দেবেন না। বিএনপি যাতে রাজপথে গণতান্ত্রিক কর্মসূচির নামে কোনো সহিংসতা করতে না পারে, সে জন্যই তারা রাজপথ পাহারা দিচ্ছেন। এখানে পয়েন্ট হলো দুটি, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করার পূর্ণ অধিকার বিএনপির রয়েছে। তারা যদি রাজপথে সহিংসতা করে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিঘ্ন ঘটায়, তাহলে সেটা দেখার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর, আওয়ামী লীগের নয়। পুলিশ মাঠে থাকার পরও আওয়ামী লীগ রাজপথ পাহারা দেওয়ার অর্থ হলো, তারা সরকারের ওপর আস্থা পাচ্ছে না। তাহলে কি আওয়ামী লীগ মনে করছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো যথেষ্ট দক্ষতা পুলিশ বাহিনীর নেই। বিএনপির পিছু পিছু কর্মসূচি ঘোষণা ও পালন করে আওয়ামী লীগের লাভ-ক্ষতি দুটিই আছে। প্রথম কথা হলো, আওয়ামী লীগ যে মাঠের দল, সেটা প্রমাণ করা যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি থাকলে গণমাধ্যম দুই দলকেই সমান গুরুত্ব দেয়। বরং পাল্টা কর্মসূচি দিয়েও সরকারি দল হিসেবে আওয়ামী লীগ কিছুটা বাড়তি গুরুত্ব পায়। তবে এটুকু লাভ বাদ দিলে পুরোটাই ক্ষতি। বিএনপির প্রতিক্রিয়া হিসেবে কর্মসূচি ঘোষণা করাটা আওয়ামী লীগের মতো দীর্ঘ ঐতিহ্যবাহী দলের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর। আর সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বিএনপির কর্মসূচিতে লোকসমাগম আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি হচ্ছে। সমাবেশের লোকসমাগম দিয়ে কিছুই হয় না। তবু চোখের সামনে তুলনা করার সুযোগ পাচ্ছে। এটা আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যের সঙ্গে বেমানান। আর উসকানির দায় তো থাকলই। রাজপথ পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব আওয়ামী লীগের নয়।

রাজপথে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে আওয়ামী লীগও নিয়মিত কর্মসূচি পালন করতে পারে। বিএনপির কর্মসূচির প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়, আওয়ামী লীগ তার নিজস্ব রাজনীতি নিয়ে, নিজেদের কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামতে পারে, রাজপথে থাকতে পারে। বিএনপির জনসভায় যদি এক লাখ লোক হয়, আওয়ামী লীগ দুদিন পর প্রস্তুতি নিয়ে দুই লাখ লোকের সমাবেশ করতে পারে। বিএনপিকে ফলো করে কর্মসূচি দেওয়া রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগকে দুর্বল করবে শুধু। এর চেয়ে বড় কথা হলো, নির্বাচনের আর বাকি আছে পাঁচ মাস। এই সময় আওয়ামী লীগ নিজেদের উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়ে জনগণের দ্বারে দ্বারে যেতে পারে। বিএনপির পিছু পিছু কর্মসূচি দেওয়া কোনো কাজের কথা নয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগকে জ্বলে উঠতে হবে নিজেদের আলোয়, নিজেদের মতো করেই।

লেখক : হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মুন্সীগঞ্জের গ্রামে ভয়াবহ আগুন

আহত চবি ছাত্রদের খোঁজ নিতে হাসপাতালে জামায়াত নেতারা

পুলিশ দেখে নদীতে ঝাঁপ দেওয়া ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার

ম্যাজিস্ট্রেটের সামনেই কালোবাজারে ট্রেনের টিকিট বিক্রি, কারাগারে রেলকর্মী

মৌচাষ উন্নয়নে বিসিকের কার্যক্রম নিয়ে সেমিনার

নিশাঙ্কার শতকে জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করল লঙ্কানরা

সিটির হারের পর রদ্রির হতাশ স্বীকারোক্তি: ‘আমি মেসি নই’

ঝড়ো ফিফটি করেও দলকে জেতাতে পারলেন না সাকিব

টঙ্গীতে ২ থানার ওসি একযোগে বদলি

তারেক রহমানের নেতৃত্বে গণআকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব : হুমায়ূন কবির

১০

সোবোশ্লাইয়ের দুর্দান্ত ফ্রি-কিকে আর্সেনালকে হারাল লিভারপুল

১১

নেত্রকোনা জেলা বিএনপির সভাপতি আনোয়ার, সম্পাদক হিলালী

১২

তারেক রহমানকে ঘিরেই রাজনীতিতে পরিবর্তন আনতে চায় বিএনপি

১৩

চীন থেকে ফিরেই নুরকে দেখতে গেলেন নাহিদ-সারজিসরা

১৪

৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ / বিএনপির অবারিত সুযোগ, আছে চ্যালেঞ্জও

১৫

বিএনপির প্রয়োজনীয়তা

১৬

ঢাকায় আবাসিক হোটেল থেকে মার্কিন নাগরিকের মরদেহ উদ্ধার

১৭

ক্যানসার হাসপাতালকে প্রতিশ্রুতির ১ কোটি টাকা দিচ্ছে জামায়াত

১৮

ম্যানেজিং কমিটি থেকে বাদ রাজনৈতিক নেতারা, নতুন বিধান যুক্ত

১৯

হত্যার উদ্দেশ্যে নুরের ওপর হামলা : রিজভী

২০
X