প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অগ্নিসন্ত্রাসের মতো মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলা করেও আমরা দেশের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে চাই। গতকাল রোববার গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে নবনির্মিত ১৫ তলাবিশিষ্ট বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ভবন, ১৩ তলাবিশিষ্ট তথ্য কমিশন ভবন উদ্বোধন ও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) কমপ্লেক্সের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, জনগণ আমাদের বারবার নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে সেবা করার সুযোগ দিয়েছেন বলেই এই কাজগুলো আমরা করতে পেরেছি। বাংলাদেশে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতির সরকার চলছে, দেশে স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে। যদিও এর মাঝে আমাদের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ এবং অগ্নিসন্ত্রাস—এমন অনেক কিছুই মোকাবিলা করতে হয়েছে; কিন্তু তারপরও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং এই অগ্রযাত্রা যেন অব্যাহত থাকে সেটাই আমরা চাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ করেছি এবং ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। সেখানে আমাদের স্মার্ট জনগোষ্ঠী হবে, স্মার্ট ইকোনমি হবে, স্মার্ট সোসাইটি হবে, স্মার্ট গভর্নমেন্ট তথা প্রতিটি ক্ষেত্রই স্মার্ট হবে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই আমরা সব ক্ষেত্রেই আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন জনগোষ্ঠী, সমাজ এবং দেশকে গড়ে তোলার পদক্ষেপ নিয়েছি। সর্বজনীন পেনশন স্কিমের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, আগে অবসর ভাতা কেবল সরকারি কর্মকর্তারাই পেত, সেটিকে আমরা এখন সর্বজনীন করে দিয়েছি। কেননা, যখন তাদের (অবসরে যাওয়া বেসরকারি কর্মজীবী) কাজ করার সুযোগ থাকবে না, তখন তাদের জীবনটা যেন অর্থবহ থাকে এবং প্রত্যেক মানুষের জীবন যেন নিরাপদ হয়।
বিএফডিসি কমপ্লেক্সের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পাশাপাশি এক একর জমিতে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন বিটিআরসি ভবন এবং ০.৩৫ একর জমিতে তথ্য কমিশন ভবন উদ্বোধনের পর তিনি বলেন, আমরা যখনই কোনো উন্নয়নের উদ্যোগ নিই, তখনই দেখতে পাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ভিত্তি প্রদান করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া ভিত্তির ওপর নির্ভর করেই আজকের বাংলাদেশ উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিতে তার সরকারের প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, তথ্য চাওয়া এবং তথ্য পাওয়া মানুষের অধিকার। সেই অধিকার আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি এবং এখন মানুষ কোনো তথ্য চাইলে তা পেতে পারে। আওয়ামী লীগ জনগণের জন্য কাজ করে। আওয়ামী লীগের রাখঢাকের (গোপনীয়) কিছু নেই। কোনো তথ্য ফাঁস হয়ে যাবে, সেই চিন্তা আমাদের নেই। আমরা যা করব, সম্পূর্ণভাবে জনগণকে জানিয়ে তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকেই করব। জনগণের কল্যাণ করাটাই আওয়ামী লীগের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে তথ্য অধিকার আইন পাস করে এবং এর আওতায় তথ্য কমিশন গঠন করে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেয় এবং কমিশনের নিজস্ব ভবন নির্মাণের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বর্তমান সরকারের সময় টেলিযোগাযোগ খাতে উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ হয়েছে। দেশের সব টিভি চ্যানেল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে। সাবমেরিন কেবল কক্সবাজারে এবং কুয়াকাটায় সংযুক্ত করা হয়েছে এবং আরও একটি সংযোগের জন্য প্রক্রিয়াধীন। বর্তমানে বিটিআরসির ব্যান্ডউইথ চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিসিএল) পাশাপাশি আরও তিনটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সাবমেরিন কেবলে সংযুক্তির লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। সারা দেশে অপটিক্যাল ফাইবার বিস্তৃত হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার ৩৪৮ কিলোমিটার। বিএনপি আমলে ১৯৯১ ও ১৯৯৪ সালে দুই দুইবার বিনা খরচে সাবমেরিন কেবলে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। তথ্য ফাঁস হয়ে যাবে এই অজুহাতে তারা এই সুযোগ প্রত্যাখ্যান করে।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় ১৯৫৬ সালে মন্ত্রী থাকাকালে জাতির পিতার হাতেই এ দেশে চলচ্চিত্র শিল্পের গোড়াপত্তন হয়েছে উল্লেখ করে জানান, এতে তার মায়েরও ভূমিকা ছিল। সে সময় এ দেশে কলকাতাভিত্তিক বাংলা ছবির প্রদর্শনী হতো। একটি ছায়াছবি দেখে রিকশায় ফেরার পথে তার মা (বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব) বাবাকে বলেছিলেন, এখানেও কি এমন চলচ্চিত্র নির্মাণ করা যায় না? পরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদে এক বিল উত্থাপনের মাধ্যমে এফডিসি প্রতিষ্ঠা করেন। জাতির পিতা গাজীপুরে ফিল্মসিটির জন্য জায়গাও বরাদ্দ দিয়ে গিয়েছিলেন।
২০১২ সালের ৩ এপ্রিল গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চলচ্চিত্রকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অসচ্ছল শিল্পী ও কলাকুশলীদের আর্থিক সহায়তার লক্ষ্যে শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি সিনেমা হল মালিকদের দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি ব্যাংক ঋণ প্রদান করা হচ্ছে। সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য সরকারি অনুদান বৃদ্ধি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রণীত হয়েছে চলচ্চিত্র নীতিমালা।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। তথ্যমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে আমাদের দেশে যে চলচ্চিত্র শিল্পের যাত্রা শুরু, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে সেই শিল্প আজ ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং এই চলচ্চিত্র আমাদের শিল্প-সংস্কৃতিকে বিশ্ব অঙ্গনেও এগিয়ে নেবে।
অনুষ্ঠানে বিটিআরসি ভবন, তথ্য কমিশন ভবন এবং বিএফডিসি কমপ্লেক্স (তেজগাঁও) রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সরকারি কর্মকর্তা, চলচ্চিত্রের কলাকুশলী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সংযুক্ত ছিলেন। বিএফডিসি প্রান্ত থেকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব হুমায়ুন কবীর খোন্দকার, বিএফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত ইয়াসমিন উপস্থিত ছিলেন।
চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ও বিশিষ্টজনের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বাস বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও রিহ্যাবের সহসভাপতি নজরুল ইসলাম দুলাল, নায়ক ফেরদৌস আহমেদ ও রিয়াজ, নায়িকা অরুণা বিশ্বাস প্রমুখ।
মন্তব্য করুন