দেশের খ্যাতনামা সফটওয়্যার কোম্পানি লিডস করপোরেশনে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে অস্থিরতা। মাসের পর মাস ঠিকমতো বেতন ভাতা না পেয়ে বিভিন্ন সময়ে অনেক কর্মী প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে গেছেন। তার পরও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় গত কয়েক দিনে প্রায় ২০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি ছেড়েছেন। এ নিয়ে কালবেলায় প্রতিবেদন প্রকাশের পর টনক নড়েছে মালিকপক্ষের। প্রতিষ্ঠানের সমস্যা সমাধান ও বকেয়া পাওনা পরিশোধের আশ্বাস দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে লিডসের কর্মীদের কাছে একটি ইমেইল পাঠিয়েছেন তারা। সেইসঙ্গে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মিজানুর রহমানকে অপসারণ করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন মালিকরা।
লিডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শেখ আব্দুল ওয়াহিদ সব কর্মীকে একটি মেইলের মাধ্যমে জানান, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আর থাকছেন না সিইও মিজানুর রহমান। লিডসের চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল আজিজের সঙ্গে কথা বলে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কর্মীদের কাছে পাঠানো মেইলে এমডি শেখ আব্দুল ওয়াহিদ বলেন, ‘মিজানকে বরখাস্ত করার কারণ হলো, সে সময়মতো আপনাদের (কর্মীদের) বকেয়া পরিশোধ করতে চাননি, যা আপনাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘চলতি বছরের মে মাসের বেতন এবং মিজান (সিইও) চলে যাওয়ার পর কীভাবে আইনি সমস্যাগুলো সমাধান করা হবে সে বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে আপনাদের কাছে একটি নোট পাঠাব।’
চাকরি ছেড়ে দেওয়া কর্মীদের আবার অফিসে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে মেইলে তিনি বলেন, ‘আপনারা সবাই আগামীকাল অফিসে আসুন এবং বিভাগীয় প্রধানের কথা শুনুন ও গ্রাহকদের সেবা দিন। গ্রাহকদের সেবা দেওয়া আমাদের সাফল্যের চাবিকাঠি এবং আপনাদের (কর্মীদের) বেতনও গ্রাহকদের ওপর নির্ভরশীল।’
তবে এমডির এমন বক্তব্যকে পাগলের প্রলাপ বলেছেন সিইও মিজানুর রহমান। বহিষ্কারের বিষয়ে তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘আমাকে বহিষ্কার করবে কী, আমি নিজেই তো আর অফিসে যাচ্ছি না। আমি মাত্র আড়াই মাস আগে এই পদে যোগ দিয়েছিলাম। কর্মীদের বেতন বকেয়া রয়েছে কয়েক বছর ধরে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কর্মীদের বকেয়া বেতন পরিশোধের জন্য নানাভাবে চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু কোনো উপায় পাইনি। এটা নিয়ে গতকালও (সোমবার) মালিকপক্ষের সঙ্গে আমার বিতর্ক হয়েছে। এ কারণে হয়তো তারা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি সিইও পদে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থা জানতে অডিট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, তখনই অনেকে আমার ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। যে মালিক কর্মীদের বেতন না দিয়ে নিজেরা বিদেশে বসবাস করেন, তারা কোনো সুস্থ মানুষে হতে পারেন না। মালিকদের মতোই এ প্রতিষ্ঠানটিও এখন অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এখানে আর কাজ করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির সব সম্পত্তি এখন আদালত জব্দ করে রেখেছেন। ভালো কিছু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।’
এদিকে এমডির ইমেইলে আশ্বস্ত হতে পারছেন না কর্মীরা। তারা জানান, এমন অনুরোধ মালিকপক্ষ অনেকবারই করেছে। কিন্তু কখনো কথা রাখেনি। আর কোম্পানির এখন যে অবস্থা তাতে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। এখন আমাদের লক্ষ্য বকেয়া বেতন পাওয়া। তবে কোম্পানি যেভাবে ঋণগ্রস্ত হয়েছে, তাতে পাওনা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।’
এ অবস্থায় বকেয়া আদায়ে অনেকেই আদালতের শরণাপন্ন হবেন বলে জানিয়েছেন।
এদিকে লিডস করপোরেশন বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে বলে গুঞ্জন উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা জানান, ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিক্রির কথাবার্তা চলছে।
লিডসের এমডির ইমেইলেও সমস্যা সমাধানে ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানানো হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠান বিক্রি করা হবে, নাকি অন্য কোনোভাবে সমাধান করা হবে—তা স্পষ্ট করেননি তিনি।
লিডস করপোরেশন অচলাবস্থা নিয়ে গত সোমবার কালবেলায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ‘ধ্বংসের পথে লিডস করপোরেশন : ১৩ ব্যাংকসহ ২৩ প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তি জটিলতার মুখে’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে বন্ধ হওয়ার পথে দেশের অন্যতম প্রধান সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লিডস করপোরেশন লিমিটেড। এতে কোর ব্যাংকিং প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে শঙ্কায় পড়েছে ১৩ ব্যাংক ও ১০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। শিগগির জটিলতা নিরসন কিংবা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ব্যাংকগুলোর মৌলিক লেনদেনে ব্যবহৃত সফটওয়্যারে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে ব্যাংকিং কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, লিডস করপোরেশন ৩০ বছর ধরে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ‘কোর ব্যাংকিং’-এ প্রযুক্তি সেবা দিয়ে আসছে। তবে নানা কারণে সম্প্রতি কোম্পানিটি তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে। কর্মীদের বেতন এবং অন্যান্য সুবিধা নিয়মিতভাবে না দেওয়ায় বকেয়া জমেছে ৩৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে অফিস ভবন নির্মাণ এবং ব্যবসা পরিচালনার জন্য সাউথইস্ট ব্যাংকসহ তিন ব্যাংক থেকে শতকোটি টাকা ঋণ নিয়ে পরিশোধ করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি।
লিডসের চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল আজিজ এবং তার ভাই ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শেখ আব্দুল ওয়াহিদ বাংলাদেশ এবং আমেরিকার দ্বৈত নাগরিক। পরিবার নিয়ে তারা সবাই যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন, দেশে তাদের কিছু নেই।