প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করা ও ঝরে পড়া ঠেকাতে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু করার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। শিশুদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের উদ্দেশ্যে কর্মসূচিটি গত বছরের অক্টোবরে চালু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বছর পেরিয়ে গেলেও তা চালু করা সম্ভব হয়নি। এমনকি চলতি বছরেও এটা চালু করা সম্ভব নয় বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কর্মসূচি নতুন করে চালু করতে একটি প্রকল্প নেয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু নানা ত্রুটিবিচ্যুতি থাকার কারণে শিশুদের জন্য জরুরি এই প্রকল্প প্রস্তাবটির অনুমোদন মিলছে না। প্রকল্প প্রস্তাব নিয়ে একের পর এক আলোচনা-পর্যালোচনা আর সংশোধন চলছে। মূলত আলোচনা, মূল্যায়ন আর সংশোধনে আটকে আছে প্রকল্পের অনুমোদন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে ‘সরকারি স্কুল ফিডিং কর্মসূচি-১’ শীর্ষক একটি প্রকল্প প্রস্তাব করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ হবে ৪ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা। যদিও প্রাথমিক প্রস্তাবে প্রকল্পের ব্যয় ৪ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা ধরা হয়েছিল; কিন্তু পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যয় ২২৮ কোটি টাকা কমানো হয়। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে তিন বছর মেয়াদে বাস্তবায়ন করবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ভর্তি এবং উপস্থিতির হার বৃদ্ধি, ঝরে পড়া ঠেকানো, শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার সরবরাহের মাধ্যমে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ, বিদ্যালয় গমনোপযোগী শিক্ষার্থীদের স্বল্পসময়ের ক্ষুধা নিবারণ এবং বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন শিক্ষা গ্রহণে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বৃদ্ধি করা।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের জুনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘প্রাইমারি স্কুল মিল’ শীর্ষক একটি প্রকল্প প্রস্তাব করে। সম্পূর্ণ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১৭ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। প্রকল্প প্রস্তাবটি একনেক সভায় উপস্থাপন করা হলেও সেটি অনুমোদন না দিয়ে এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণের পরিবর্তে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তবসম্মত ও কার্যকর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে একনেক সভার নির্দেশনা অনুযায়ী, নতুন ডিজাইনে ‘সরকারি স্কুল ফিডিং কর্মসূচি’ শীর্ষক একটি পাইলট প্রকল্প প্রস্তাব করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবর মাস থেকে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত প্রকল্প প্রস্তাবটির অনুমোদন মেলেনি।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই জরুরি। কিন্তু প্রকল্প প্রস্তাবে নানা ত্রুটিবিচ্যুতি থাকায় প্রকল্প সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠানো হয়। কিন্তু নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকল্প সংশোধন করে পুনর্গঠিত ডিপিপি পাঠালে সেখানেও বেশকিছু অসংগতি রয়ে গেছে। এ কারণে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ না করে আবারও পিইসি সভার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে আলোচ্য প্রকল্পের ওপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। পিইসি সভায় অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় প্রস্তাবসহ নানা ত্রুটিবিচ্যুতিসহ বেশকিছু অসংগতি তুলে ধরে ডিপিপি সংশোধনের সুপারিশ করা হয়। পরে ২৩ জুন আরেকটি সভা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৩ আগস্ট ও ৫ সেপ্টেম্বর পরিকল্পনা কমিশনের সঙ্গে অধিদপ্তরের প্রকল্প পর্যালোচনা সভা হয়। তার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় কমিয়ে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই মাসে শুরু হয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ নির্ধারণ করে ডিপিপি পুনর্গঠন করে পাঠায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু সংশোধিত ডিপিপিতেও বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় এবং যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুনর্গঠিত ডিপিপিতে বেশকিছু ত্রুটিবিচ্যুতি থাকায় আবারও পিইসি সভার সিদ্ধান্ত নেয় পরিকল্পনা কমিশন। সেই সভায় সংশোধিত ডিপিপির বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় প্রস্তাব ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
পিইসি সভার কার্যপত্র সূত্রে জানা গেছে, আলোচ্য প্রকল্পের অফিস ভাড়া, দায়িত্ব ভাতা এবং ইনস্পকেশন খাতসহ বেশকিছু খাতে অতিরিক্ত ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। পিইসি সভায় এসব খাতের ব্যয় প্রস্তাব এবং যৌক্তিকতা জানতে চায় পরিকল্পনা কমিশন। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় গাড়ি কেনার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা করা হবে বলে জানা গেছে।
প্রস্তাবনা অনুযায়ী, আলোচ্য প্রকল্পে ‘খাদ্যসামগ্রী’ কিনতে খরচ হবে ৪ হাজার ৬৬ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) অনুযায়ী, তিন সদস্যবিশিষ্ট বাজারদর কমিটি গঠন করে বাজারদর যাচাই করে পরিমাণ ও মূল্য নির্ধারণ প্রতিবেদন পুনর্গঠিত ডিপিপিতে সংযোজনের কথা থাকলেও সংশোধিত ডিপিপিতে যথাযথভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
খাদ্যসামগ্রী কেনার বাইরে খরচ হবে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। শুধু খাদ্যসামগ্রী বিতরণ ও ব্যবস্থাপনায় খরচ ধরা হয়েছে ৩৬৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ভেন্ডর, গোডাউন, পরিবহন, সার্ভিস চার্জ, খাদ্য বিতরণ, প্যাকেজিং ফি বাবদ খরচ ২৮২ কোটি টাকা। অ্যাপ্রোন ও হ্যান্ডকারচিফে (রুমাল) খরচ ৩০ কোটি টাকা, আউটসোর্সিংয়ে খরচ ২৫ কোটি।
প্রকল্পের আওতায় ১৫০টি অফিস ভাড়ার জন্য ১০ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। ‘ইন্সপেকশন ফি’ খাতে ২০ কোটি টাকা এবং দায়িত্ব ভাতা খাতে ১৫৯ জনের বিপরীতে ৪ কোটি 8 লাখ টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অফিস ভাড়ার প্রয়োজনীয়তা, ইন্সপেকশন ফি এবং দায়িত্বভাতার যৌক্তিকতা জানতে চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
এদিকে, অর্থবিভাগের জারিকৃত পরিপত্র অনুযায়ী উন্নয়ন বাজেটের আওতায় সব ধরনের যানবাহন ক্রয় বন্ধের নির্দেশনার পরও আলোচ্য প্রকল্পে একটি জিপ, একটি মাইক্রোবাস এবং ১৫০টি মোটরসাইকেল কেনার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। নির্দেশনার পরও যানবাহন কেনার প্রস্তাবের ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
কার্যপত্র সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার বিতরণ ব্যবস্থাপনা ব্যয় কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চায় পরিকল্পনা কমিশন। প্রস্তাবিত প্রকল্পের কিছু অঙ্গের একক ও পরিমাণ থোক হিসেবে দেখানো হয়েছে। এগুলোর অঙ্গভিত্তিক ব্যয় বিভাজন সুনির্দিষ্টভাবে ডিপিপিতে উল্লেখ করার কথা বলা হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পর্যায়ক্রমে সারা দেশের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপে ১৫০টি উপজেলার প্রায় ১৮ থেকে ১৯ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রকল্পের আওতায় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হবে। খাদ্যসামগ্রীর মধ্যে থাকবে দুধ, ডিম, রুটি এবং মৌসুমি ফল। তিনটি ধাপে পর্যায়ক্রমে শুকনা পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার বিতরণের জন্য একটি রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে।